ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ভাষা আন্দোলন হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ প্রচলিত হলেও এটা মোটেও এককভাবে ভাষা আন্দোলন ছিল না। ১৯৫২ সালে এটা ছিল সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কারণ সংবিধানে সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা কি হবে এ নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। উর্দু ভাষাভাষী ক্ষমতাসীনরা সংখায় ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, কিন্তু এই অংশটি জোর করে সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা শুধুমাত্র উর্দু হবে বলে খসড়া সংবিধান তৈরী করে।

অন্যদিকে তৎকালীন সময়ে বাঙালিরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬.৪০%)। তাই বাঙালিরা সংবিধানে নিজেদের অবস্থান আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামে। পরে বাঙালি শহীদদের প্রাণের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পাকিস্তানের সংবিধান সম্পর্কিত বিল পাশ হয়, যেখানে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে উর্দু ও বাংলা উভয়কে রাখা হয়।

বর্তমানে গণমাধ্যমে অধিকাংশ লেখকরা সংবিধান সম্পর্কিত অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে শুধুমাত্র ভাষা অান্দোলন বলে বিষয়টাকে হালকা করছে, নতুন প্রজন্মের কাছে ভুল ব্যাখ্যা করছে। সেই সময় শুধু ভাষার জন্য বাঙালিরা আন্দোলন করেনি। একটা রাষ্ট্রের অধিকাংশ আয় (প্রায় ৬০%) যে ভাষার জনগণ করে তাদের অবস্থান পোক্ত করার জন্য আন্দোলন করা হয়েছিল। আন্দোলন করা হয়েছিল রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণ বাঙালিদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য। একটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপকে ব্যাহত করার জন্য আন্দোলন করা হয়েছিল। তৎকালীন পোস্টারগুলো দেখলে দেখা যাবে সেখানে স্লোগান ছিল- “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “সংবিধানে উর্দু ভাষা চাই না”।

ঐ সময় (১৯৫৬ সালে) আরেকটা ভুল করে। ভুলটা হলো তৎকালীন সময়ে ২৮.৫৫% ছিল পাঞ্জাবী ভাষাভাষী জনগণ, আর সিন্ধি ভাষার জনগণ ছিল ৫.৪৭%, যাদের অবস্থান সংবিধানে অগণতান্ত্রিকভাবে বাদ দেয়া হয়। লোকসংখ্যার বিবেচনায় সংবিধানের ভাষার অনুচ্ছেদের পাঞ্জাবী ও সিন্ধি ভাষাও আসা উচিৎ ছিল। শুধুমাত্র ক্ষমতার কারণে সবচেয়ে কম জনগণের ভাষা উর্দুর নাম সংবিধানে স্থান পায়। জিন্নাহ কতবড় বেইমানি করেছে তার প্রমাণ এখন ধীরে ধীরে জানা যাচ্ছে। পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান এখনও অগণতান্ত্রিক। ১৯৭১ এর পর বাংলা ভাষা শব্দটি বাদ দেয়া হয়। থেকে যায় শুধুমাত্র উর্দু! যে দেশের সংবিধান জনগণের প্রতিচ্ছবি নয়, তা তো অগণতান্ত্রিক হবেই।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের সংবিধানও সেই অর্থে অগণতান্ত্রিক। এতো শহীদের রক্তের বিনিময়েও সঠিক হলো না বাংলাদেশের সংবিধান। অনুচ্ছেদ-৩ এ বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা”। যে ভুল পাকিস্তান আমলের উর্দু শাসকরা করার চেষ্টা করেছিল, সেই ভুল বাঙালি শাসকরাও করছে। বাংলাদেশে অনেক জনগণ আছে যাদের ভাষা বাংলা নয়। তাদের অবস্থানটা কোথায় যাবে তাহলে? তারা কি সংবিধানে অবস্থান নেবে না? মানুষ হিসেবে, দেশের নাগরিক তাদের কি কোন অধিকার নেই?

আরেকটি বিষয় আমাকে খুব ভাবায়। আমরা কত অবুঝ! রাষ্ট্রের কি কখনও ভাষা হয়? রাষ্ট্রের কি কখনও ধর্ম হয়? হায় সংবিধান প্রনেতাগণ! এগুলো এক প্রকার ভদ্রবেশী ভণ্ডামি। অনুচ্ছেদ-৩ একটু ঘুড়িয়ে লিখতে পারতো, যেমন- রাষ্ট্রের দাপতরিক ভাষা বাংলা। তাহলেও অনেকটা সঠিক হতো। তবে বাস্তব বিষয় হলো, যতই বাংলা বাংলা বলে চিৎকার করি না কেন, আর্ন্তজাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ব্যবহার করতে হবেই। এই কারণে ইংরেজি ভাষার বিষয়টাও উক্ত অনুচ্ছেদে পরিস্কার করা যেতে পারতো। রাষ্ট্রের ভাষা নেই এটা যেমন সত্য, তেমনি জনগণের ভাষা কখন কি হবে তাও জানা নেই। কারণ খুশিতে গুনগুন করলে এখন অনেকে হিন্দি ভাষার কোন গানের কলি, কিংবা রাগলে ইংরেজিতে বকা হিসেবে কয়েকটা শব্দ আসবেই। তেমনি এক সময় প্রেমের গান গাইতে গিয়ে কোন হিন্দি ভাষাভাষীর লোকও রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে উঠতো।

ভাষা বেধে রাখার বিষয় নয়। এটা প্রয়োজন ও চর্চার সাংস্কৃতিক মিশ্রন। ভাষা হবে অবাধ। সকলের কাছে অনুরোধ, ইতিহাসের সাংবিধানিক আন্দোলনকে ভাষা আন্দোলন বলে গুলিয়ে না ফেলাই ভালো। সালাম-বরকত কখনও ভাষা রক্ষার জন্য রক্ত দেয়নি, দিয়েছে একটি বৃহৎ জাতিকে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে।

লেখক-  কাজী মাহমুদুর রহমান
বনশ্রী, ঢাকা।