ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

আমাদের দেশে ব্যবসায়িদের রাজনীতিতে পদার্পণ নতুন কিছু না। এই নব্য রাজনৈতিক ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার শাখা প্রশাখা এত সল্প সময়ে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, তাদের প্রচলিত ব্যবসা ছেড়ে তাঁরা এখন অন্য দিকে হাত বাড়িয়েছেন। ওনাদের ঝোঁক এখন অন্য দিকে যাত্রা করেছে। অনেক সফল ব্যবসায়ী এখন যে ব্যবসার দিকে হাত বাড়িয়েছেন তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সংবাদ ফেরি করা। বিগত ১০ বৎসর যাবত আমাদের দেশে সস্তা ফেরিওয়ালা এত বেশি বেড়ে গেছে যে, জনগন সত্য- মিথ্যার প্রভেদ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। তার মানে এই নয় যে, আমাদের দেশে সত্য কথা বলা সাংবাদিক বা মিডিয়া নেই। তারাও আছেন কিন্তু প্রভাবশালীদের সাথে পারলে তো! তাঁরা তো আর যা তা বলতে পারেন না যে প্রভাবশালীদের সাথে পারবেন। খুঁটির জোর বলে তো একটা কথা আছে।

আমরা এখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংবাদ মিডিয়া দেখতে দেখতে ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছি । প্রতিটি সরকার ক্ষমতা পেতে না পেতেই গজিয়ে ওঠা কিছু নব্য রাজনীতিবিদদের হাত ধরে আত্নপ্রকাশ করছে নতুন নতুন মিডিয়া। এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই থাকে নিজ নিজ দল কে খুশি রাখা। বিগত (২০০১-২০০৬) সময়কালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি.) ও তার শরিক দলগুলো বেশ কিছু সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল এর আবির্ভাব ঘটায়। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি সংবাদপত্র হল- দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক যায় যায় দিন। এবং TV Channel এর মধ্যে এন টি ভি, বাংলাভিশন, দিগন্ত টেলিভিশন , আর টিভি, বৈশাখী টেলিভিশন অন্যতম। এছাড়া তাঁদের অন্যতম সফল(!) একটি কাজ ছিল ঐ সময়ের জনপ্রিয় চ্যানেল একুশে টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া।

আবার আওয়ামী লীগ সরকার তার আগের আমলে তেমন কিছু না করলেও পরবর্তী আমলে (২০০৯- বর্তমান) যেন বি.এন.পি. কে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। তাঁরা এরই মধ্যে দেশ টিভি, গাজী টিভি, বিজয় টিভি, চ্যানেল ৭১, চ্যানেল ৯, Independent টিভি, মাছরাঙা টেলিভিশন সহ বেশ কিছু টিভি চ্যানেল এর অনুমোদন দিয়েছেন। এবং বেশ কিছু দৈনিক পত্রিকাও এই সময় মাঠে নামে। এর মধ্যে অধিকাংশ চ্যানেল ও পত্রিকার মালিকানাই সরকারদলীয় বিভিন্ন ব্যাক্তির।

এ সকল মিডিয়া মাঠে নামায় সব মিলিয়ে যে ভাল ফলাফল আমরা আশা করতে পারতাম তা হল, সংবাদ পরিবেশনে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্য সংবাদ প্রাপ্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এই যে, কিছু মিডিয়া তাঁদের উপর বর্তানো নিরপেক্ষতার দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করলেও অনেক মিডিয়াই এই দায়িত্ব পালনে উদাসীন। অনেক মিডিয়াই তাঁদের উপর বর্তানো নিরপেক্ষতার দায়িত্ব ত্যাগ করে স্ব স্ব দলের প্রচার চালানোতে ব্যাস্ত। এছাড়া এক পত্রিকার সাথে অন্য পত্রিকার রেষারেষি তো আছেই। সব মিলিয়ে বেশ একটা ভজঘট অবস্থা। একটা উদাহরন দিলেই আশা করি বুঝতে পারবেন।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে হত্যা করা হয়েছে বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল। হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিভিন্ন মিডিয়াতে যে বিভিন্ন সংবাদ প্রচারিত হয়েছে তাতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। এর মধ্যেই এক মহামানব(!) তো তার সহজাত প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আমরা পাঠকরা বুঝলাম যে, জল আসলেই অনেক ঘোলা করা যায়। একই পেশার মানুষ হয়েও সাংবাদিক ভাইয়েরা একমত হতে পারলেন না।

এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁদের নিজ নিজ মতামত জনগণকে শুধু বিভ্রান্তই করেছে। কোন ব্যাক্তি যদি একটি দিনের বেশ কয়েকটি পত্রিকা নিয়ে সংবাদ মিলাতে বসেন তবে তার মাথা খারাপ হবেই এতে কোন সন্দেহ নেই। কোনটা ছেড়ে তিনি কোনটা বিশ্বাস করবেন? এর সমাধানের জন্য তার লটারি করে কোন একটি পত্রিকার সংবাদ বিশ্বাস করা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোন বাসায় কোন পত্রিকা রাখা হয় তা দিয়ে ঐ বাসার রাজনৈতিক সমর্থন বিচার করা হয়। এটা এমন যে, এক পত্রিকা রাখে বলে কেউ সরকার পক্ষ আবার আরেক পত্রিকা রাখায় আরেকজন বিরোধী দল।

এই বিভ্রান্তির পেছনে একটা বড় ভুমিকা পালন করে পত্রিকার মালিক , প্রকাশক ও সম্পাদকের ব্যাক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস। যেহেতু অধিকাংশ মিডিয়ার মূল মালিক ও পৃষ্ঠপোষক কোন না কোন দলের সাথে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী । সে ক্ষেত্রে নিজের দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য হলেও তাঁদের চাপে পত্রিকাগুলোকে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন করতেই হয়।

এত কিছুর পরও কিছু সত্যান্বেষী মিডিয়ার কাজ ও পরিবেশিত সংবাদ আমাদের প্রেরণা যোগায় ও সঠিক চিত্র দেখায়। এদের কাছে আমরা সবসময়ই কৃতজ্ঞ থাকবো আমাদের কাছে সঠিক সংবাদটি পৌঁছে দেয়ার জন্য। আমরা অবশ্যই মনে প্রানে চাইব যে তাঁরা তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যেন সততার সাথে পালন করেন। আর অন্যদের কাছেও আমাদের আবেদন থাকবে, আপনারা আর যাই করুন অনুগ্রহ করে জনগন তথা নিরীহ পাঠকদের বিভ্রান্ত করবেন না । আমরা পাঠকরা আপনাদের সবসময়ই বিশ্বাস করতে চাই। সেই বিশ্বাস ভেঙ্গে দেবেন না। কারন, আপনারাই জাতির বিবেক ও সমাজের দর্পণ। আর ভাঙ্গা দর্পণে যে বারবার বিকৃত চেহারাই ভেসে উঠবে তাতে আর সন্দেহ কি।