ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

প্রায় সাত মাসের ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে গতকাল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত শেয়ার বাজারে দেড় বছর ধরে চলে আসা মহা পতনে ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি লাঘবের জন্য প্রনোদনা প্যাকেজের আওতায় নতুন একটি স্কিম ঘোষনা করেছেন। যা নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে দেয়া হল

শেয়ারবাজার ধসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা স্কিম ঘোষণা করেছে সরকার। ঘোষিত প্রণোদনার আওতায় এক বছরের সুদের ৫০ শতাংশ মওকুফ এবং শেয়ারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে ২০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করে এর বিপরীতে যাঁরা ঋণসুবিধা নিয়েছেন, কেবল তাঁরাই সুদ মওকুফের সুবিধা পাবেন। আর ঋণগ্রস্ত বা ঋণ ছাড়া—উভয় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী আইপিও কোটা-সুবিধা পাবেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালে ইস্যু হওয়া সব আইপিওতে ২০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হবে।
(সূত্র )

শেয়ার বাজার নিয়ে আমি নিয়মিতই লিখি ফলে অনেক আগে থেকেই এই বিশেষ স্কিম নিয়ে বেশ উৎসাহের সাথে সংশ্লিষ্ট খবরগুলো অনুসরন করে আসছি। দিন শেষে আমার এখন মনে হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার চাইতে ঘোষিত স্কিম অতিশয় নগন্য এবং এই স্কিম ঘোষনার মাধ্যমে সরকার আবারও ‘তেলে মাথায় তেল ঢালার’ নীতি অনুসরন করেছে।

৩২ লাখ বিও হিসাবের বিপরীতে ২৫ লাখ বিও হিসাব রয়েছে যাতে নিয়মিত লেন দেন হয়েছে ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত। এই ২৫ লাখ বিও হিসাবের মধ্যে ১৭ লাখ বিও হিসাবধারীর বিনিয়োগের পরিমান ১০ লাখ টাকার কম এবং সরকার এদেরকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে চিন্হিত করেছেন। গত ১৫ মাসে ৩ দফা পতনে বাজার প্রায় ৬০% মূল্য হারিয়েছে অর্থাৎ অতি ভাগ্যবান বিনিয়োগকারীও ৬০% ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এই ১৭ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর মধ্যে মাত্র ৭ লাখ (প্রায়) বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যংকগুলে থেকে মার্জিন লোন নিয়েছে আর বাকি প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারী সম্পুর্ন নিজের পুজি ( হয় নিজের সন্চয় অথবা ব্যাক্তিগত পর্যায়ে ধার-দেয়া করে ) শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছেন। অর্থাৎ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বৃহত অংশ স্কিমে ঘোষিত ৫০% সুদ মৌকুফের কোন সুবিধা পাবে না।

আবার ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যংকগুল ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সংখক ঋণ গ্রহীতার ঋণ সমন্নয়ের জন্য ফোর্সসেল করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে ( হয় সব শেয়ার বেচে দিয়েছে অথবা বৃহত একটি অংশ বিক্রি করে দিয়েছে)। ফলে ঋণ ব্যবসায়ীরা তাদের লস যতটা সম্ভব কমিয়ে এনেছে, যদিও ঋণ গ্রহীতারা হয়েছে নিস্ব। এবার তারা স্কিমের আওয়া ৫০% সুদ মাফের বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে টেক্স রেয়াত পাবেন ( উল্লেখ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ৪৫% হারে টেক্স দিতে হয়)। ফলে সরকার শুধু ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যংকগুলোর আসল টাকাকেই (মূল ঋণ) সুরক্ষিত করেনি বরং লাভের ৫০% (সুদ থেকে আয়) ও নিশ্চিত করেছে; তেলে মাথায় তেলে ঢালার প্রকৃষ্ঠ উদাহরন এর চাইতে বেশি আর কী হতে পারে?

স্কিমের ২য় অংশে এই ১৭ লাখ ক্ষতিগ্রাস্থ বিনিয়োগকারীর জন্য আগামী ২ বছর ২০% হারে নতুন আইপিওর কোটা রাখা হয়েছে। ২৫ লাখ বিনিয়োগকারির মধ্যে ১৭ লাখের জন্য নাম মাত্র ২০% কোটা শুধু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলই নয়, এটি হাস্যকর তামাশাও বটে।

হ্যা, একদম কিছু না পাওয়ার চাইতে এই স্কিম অন্তর্ত কিছু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর জন্য অল্প-বিস্তর লোকশান কাটানোর পথ হতে পারে। কিন্তু সরকার চাইলেই আরো বেশি কিছু করার সুযোগ ছিল যেমন –

১। যারা মার্জিন লোন নেননি তাদের জন্য ২৫% ও লোন গ্রহীতাদের জন্য ১৫% আইপিও কোটা বরাদ্ধ করতে পারতেন।

২। যার ফোর্সড সেলের শিকার হয়েছে তাদেরকে ১/২ বছর মেয়াদী সুদহীন লোন অথবা ৫০%-৫০% প্রফিট শেয়ারিং শর্তে ঋণ দানে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলকে বাদ্ধ করা।

৩। ভবিষ্যতে মার্জিন লোনের লাভ-ক্ষতি ৫০%-৫০% অথবা ৬০%-৪০% অনুপাতে ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে বন্টনের নিয়ম করা। যাতে ব্যাংকগুল গ্রাহকের লাভ-ক্ষতির অংশিদার হয়।

অসহায় ও দূর্বল সর্বদাই নিগৃহিত হয় আর যারা তুলনামূলক শক্তিশালী তারা কোন না কোন ভাবে বেচে যায়। ১:২ অনুপাতে ঋণ বেচা ব্যাংকগুল আসল সহ লাভের ৫০% বাচাতে পারলেও ক্ষুদ্র ও দূর্বলের প্রায় কিছুই বাচেনি।