ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

শীত মানেই এডভেঞ্চার , অনেক কিছু বিনামুল্যে লাভ এবং অনেকের অনেক অনেক পরিকল্পনা । শীত কে উপভোগ করতে কিছু কিছু মানুষ আদা আর গরম জল খেলে সরিষার মাঠে নেমে পড়বে এটা দেখাটা খুব স্বাভাবিক ।

প্রথমেই তাদের মাথায় আসবে ফ্যাশনেবল কাপড়ের বিষমচিন্তা । কিভাবে নিউ স্টাইল ধরা যায় ভাবতে ভাবতে একটু শরীর গরম করা শুরু হয় । সবার ভাবনা এক । যাই পড়ি না কেন ; ফ্যাশন টা সবার আগে বস !! কোন জ্যাকেটে বা সোয়েটারের কোন কালারে তাকে ‘’পাঙ্খা ‘’ লাগবে এই নিয়ে চলে বিস্তর গবেষণা । রূপচর্চা বিষয়ক টকশোর চাহিদা বেড়ে যায় ।পা ফাটা , ঠোঁট ফাটা , হাত ফাটা , বুক ফাটা আরও যা ফাটা আছে কিভাবে এই শীতে রোধ করা যায় টা দেখতে এই টকশোতে ছেলে বুড়ো সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে । তবে একটু বেশি অবাক হতে হয় যখন কথিত স্মার্ট ছেলেটা ইভ টিজিং করতে করতে পকেট থেকে ফুরুত করে মেরিল লিপজেল খানা বের করে ঠোঁটে ভাল মতো লেপটে নেয় ।

তবে শীতের বড় কয়েকটা অবদান এর মধ্যে একটা হচ্ছে – ‘’শীত ; নারী ও পুরুষের মাঝে বিভেদ কমিয়ে দেয় ।‘’ …… কারন শীতে সবাই প্রায় একি রকম চাদর , সোয়েটার , জ্যাকেট , টুপি পড়ে ।আরও একটা লাভ , ধর্মপ্রান ব্যাক্তি বর্গরা শীতে খুশি হয় । তার কারন ,অন্য সময় হাজার বলেও কিছু কিছু নারী জাতির গা ঢাকতে না পারলেও শীতে অটোমেটিক সকল নারী গা ঢেকেই চলাফেরা করে । ( কয়েক জন এরমাঝেও ব্যতিক্রম আছে ) বিপদে পরে হোক আর যাউ হোক শালীনতা রক্ষায় ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তিরা হাফ ছেড়ে বাঁচে ।

অনেকের অনেক জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছাও এই সময়ে আগুনের মত জ্বলে উঠে । আমাদের বাংলাও আবার এমন একটা দেশ, শীত মানেই পুরা অন্য রুপ , যেন রহস্য-ময়ী কিশোরী মেয়ে ! সারা দেহে সে একটা ধোঁয়া ধোঁয়া আবরণ রেখে দেয় যাকে ’’ কুয়াশা ‘’ নামে ডাকি । বাংলার আনাচে কানাচে তখন সুন্দরের মহামায়া । তাই অনেকের চিন্তা চলে , সব সুন্দর এইবার গিলে ফেলতে ই হবে ।সাথে ক্যামেরা হাতে ফ্রিতে আমাদের কিছু ফটোগ্রাফার ভাই জান রা তো আছেই । আছে তাদের বাধ্যগত মডেল সমূহ । আর কি চাই ? ক্লিক ক্লিক করে একের পর এক ছবি ।তারপর ফটো আপলোড এর পর আহ্লাদ করে করে বলা — ‘’ এই আমার সরিষার ক্ষেতে তাজা লাউ হাতের ছবিটা কেমন হয়েছে ! তুই তাড়াতাড়ি একটা কমেন্ট দিয়ে দে, ভাল কিছু লিখবি , প্লিজ !! …… শুরু হয় আঁতেল মার্কা কিছু ছবিতে শত শত কমেন্ট । বাহ বাহ । এই বহু স্বাদের বেড়ানোয় লাগে লাগুক হাজার হাজার টাকা , ভয় পাই না , খেজুরের রসের মত সব সুন্দর হাড়িতে ভরেই তবে বাড়ি ফিরব ; এই মুল মন্ত্র তারা গলায় মাফলারের মত বেঁধে নিয়ে যায় ।তখন যেন কুয়াশার বুক চিড়ে প্রকৃতি কে কাছে পেতে সবাই এক একজন যোদ্ধা ।তবে এতে দেশের পর্যটন শিল্পও বিশাল লাভবান হয়ে থাকে যা আশার কথা ।

এই সময়টায় ভোজন রসিক ছাড়াও শুকনা কটকটে মানুষটা চোখে মুখে গদগদ দৃশে ভাসে , মজাদার পাটিসাপটা , ভাপা , মুইটা পিঠা , কলা পিঠা , তেলের পিঠা নকশি পিঠা সহ আরও কত কি !! শহরের রাস্তায় সকালে আর সন্ধ্যার পর মোড়ে মোড়ে গাড়ির হর্নের মত শুনা যায় ‘’ মামা বেশি খেজুরের গুড় মাইরা স্পেসাল দুই ডা ভাপা বানাও তো , গুড় পরিমাণে বেশি ,মনে রাইখো কিন্তু ‘’ …… আমাদের এই হটাত প্রাপ্ত মামারাও ভাগিনাদের সম্ভাষণের প্রতিদানে মশারীর মত কাপড় পেঁচিয়ে ধুপধাপ চালের গুরা দিয়ে ভাপা বানিয়ে দেয় । বিনিময়ে হাতিয়ে নেয় নিম্ন পক্ষে ৫ , ১০ টাকা , অথবা ১৫ টাকা । তবে লক্ষ্যকরলে দেখা যাবে পিঠা বানানোর বাটি টায় মামারা এমন দুর্নীতি করে যে আমাদের আত্মার আত্মা মন্ত্রী মামারাও দুর্নীতির মডেল হিসেবে তাদের সালাম দিয়ে দেয় ।শুধু তাই নয় , আসল ভোজের ব্যবস্থা হয় বাড়িতে বাড়িতে । বাড়িতে খাওয়ার আগে আলাভোলা বাঙ্গালী হাতে হাত ঘষা দিয়ে ভাবে ” আজ নানী বা দাদী বাড়ি যেখান থেকেই পিঠা আসুক , খাইয়া ফাডাইয়া ফালামু ।” হাতের কাছে তাই আগে ভাগেই এমোডিস ( আমাশার জন্য কার্যকরী পথ্য ) রেখে দেয় । লাভ হিসাবে এতে দেশের ফার্মেসী সমুহের কাটতি ভাল যায় ।

অপরদিকে কবি সাহিত্যিকরা তো আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে । তাদের তো তখন মাথা অর্ধেক আউলা । এই হিমহিম কাপুনিতে দশ বারো টা কবিতা বা গল্প না পয়দা করলে তো শীত কে অপমান করা হয়ে যায় ! তাই তারা এই অপমান এর কলঙ্ক থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে চাদর মুড়ি দিয়ে কলমের রস মিশিয়ে সাহিতের রস বের করতে নেমে যায় কাগজে ।

কিছু জায়গায় পাওয়া যায় রুম হিটারের সুস্বাদু ব্যবস্থা ।না থাকলেও সমস্যা নেই ; বাসার কাচের জানালা তো সবসময় বন্ধ , শীতময় বাতাস ঢুকবে কোথা দিয়ে ! এমন শয়ে শয়ে আনন্দ ।
এইবার আসুন একটা প্রাথমিক ফলাফল বের করি , বহু আনন্দ কিন্তু করা হয়েছে, হয়েছে অনেক ফুর্তি , সাথে ভরপুর খাওয়া-দাওয়া সব হয়েছে ।মনে বড় শান্তি । এইবার গরম কফির মগে চিমুক দিয়ে ফেইসবুকে স্টাটাস আপডেট … আহ , এইবারের শীতটায় পুরা কাপাইয়া দিসি মামু , এইবার চাই আমার ‘’ওম ওম’’ টাটকা সব্জির মত ঘুম ।” স্ট্যাটাস দেয়া শেষে এসি না থাকলে হালকা ফ্যান ছেড়ে কম্বল গায়ে শান্তির ঘুম । বড় ভাল লাগা । আহহহ ……

কিন্তু একবার কি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাবেন ? কি দেখছেন ? দেখছেন হয়তো আপনার বাসার পাশের রাস্তায় কোন বাচ্চা ছেঁড়া গেঞ্জি , সাথে হয়তো একটা ছেঁড়া ছালা গায়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছে । রুম হিটার দুরের কথা , মাথায় তার ছাদটাই নেই । তবে বাচ্চাটারও খুব ইচ্ছা ঘুমানোর । রাতের ভয়াবহ শীতের জ্বালা এই ঘুমের ঘোরে সে ভুলতে প্রাণপণ সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তবে তিব্র এই শীতে এই অবস্থায় ঘুমানো কোনমতেই সম্ভব হচ্ছে না । সে জানে আর কেও তাকে গরমের ছোঁয়া দেখ আর নাই দেখ সকালে সূর্য মামা ঠিকই তাকে উত্তাপে ভাসাবে । অথচ রাত কাটতে চায় না । হাড়ে হাড়ে গিয়ে বিঁধছে শীত রূপিসুই এর ফোলা , সারা শরীর কাটা কাটা , অসহ্য যন্ত্রণা । হাঁটুটা যতটা সম্ভব আরও বুকে জড়িয়ে ধরে সে । বজ্রমুষ্টি করে শীতের সাথে পাঞ্জা । কিন্তু বোকা বাচ্চাটা বার বার হেরে যায় এডভেঞ্চারময় শীতের কাছে ।

খুব কি বেশি ক্ষতি এই শীতে বহু এডভেঞ্চার এর সাথে আরও একটা নতুন এডভেঞ্চার যোগ করতে ? আসুন না প্রত্যেকে অন্তত একজন অসহায় শীতকাতর মানুষ কে সাহায্য করি ! আপনার আত্মীয় , বন্ধু সবাই কে বলে দেখুন আপনার নতুন ইচ্ছার কথাটা । দেখবেন সবাই সাহাযের জন্য হাত বাড়িয়ে দিবেই ।ঢাকায় অবস্থানরত অনেকেই বলবে ‘’ ভাই শীত কই ?, শীত তো নাই ‘’ – কথা সত্য ঢাকায় ট্রাফিক জ্যাম যেমন বেশি শীত তেমনি কম , তবে ঢাকার গুমোট পরিবেশ থেকে একটু বাইরে বের হলেই শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপ ভাল ধরা পড়বে । তবে একটা কথা মনে রাখা ভাল , অভিনেতা বা অভিনেত্রী টাইপ অসহায় কাও কে না , বরং যার আসলেই দরকার এই মুহূর্তে আপনার সাহায্য তাকেই সাহায্য করবেন । কাজটা করে দেখুন , সত্যিকারের এডভেঞ্চার এর স্বাদ পাবেন কথা দিচ্ছি ।