ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমাদের গ্রামটি অজপাড়া গাঁ থেকে একটু আগে। ভাঙাচোরা একটি পাকা সড়ক ওই গ্রাম থেকে মহাসড়কে গিয়ে মিলেছে। আর বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে ওই গ্রামের ঘরে ঘরে চায়না সিডি প্লেয়ারে ভারতীয় বাংলা সিনেমা চলে। কোন ঘরের পাশা দিয়ে হেটে গেলে সহজেই শোনা যায় অনেকের পরিচিত সংলাপ ‘মারব এখানে, লাশ পড়বে শশ্মানে’।

বছর দশেক আগে ওই গ্রামে যখন বর্ষা আসত তখন জারুল আর হিজল ফুলে খালটি ভরা থাকত। বর্ষার নতুন পানিতে পুঁটি মাছেরা আনন্দ করত, যে আনন্দের সঙ্গে রাজধানীতে তুচ্ছ কারনে গাড়ি ভাঙার উল্লাসের কোন মিল নেই। ওই গ্রামে এখনও বর্ষা আসে। খালটি পানিতে ভরে যায়। কিন্তু হিজল জারুল ফুলেরা থাকেনা। এসব অপ্রয়োজনীয় গাছ কেটে সেখানে রোপণ করা হয়েছে রেইন ট্রি, মেহগনি আর চাম্বুল গাছ। অল্প কয়েকবছরে এসব গাছ বড় হয়ে যায়। বিক্রি করলেই নগদ টাকা।

কিন্তু একটা সময় এত নগদ টাকার প্রয়োজন কিন্তু মানুষের ছিলনা। পুকুরে মাছ, জমিতে ধান, েেত সরিষা, বাড়ির আঙিনায় তরকারি। প্রয়োজন ছিল শুধু লবন আর কেরোসিন তেলের। আর বর্ষায় হাটের দিন একটা বড় ইলিশ। গেরস্ত পরিবারগুলোতে বিলাসিতা না থাকলেও ছিল আনন্দ। আমরা এখনও গেরস্ত। বাড়ির সব ঘরেরই কেউ না কেউ বিদেশ গেছেন। আসছে পেট্রো ডলার। সঙ্গে আসছে বিদেশী বোরকা, তাসবিহ আর নসিহত। ঘরে টিভিতে হিন্দি-বাংলা সিনেমা দেখে, মোবাইলে প্রেম করে বাইরে মেয়েরা ঠিকই বোরকা পড়ে যাচ্ছে উপার্জনকারী পুরুষের নির্দেশে, তা সে নামাজ পড়–ক আর না-ই পড়–ক।

আমার পরিবারটি গেরস্ত ও একান্নবর্তী। তবুও পেট্রোডলার আয়কারী পরিবারগুলোর সঙ্গে স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গত মাসে একটা ফ্রিজ কিনতে হল। ওয়ালটন ফ্রিজ কিনে সেখানে রাখা শুরু হল নিজেদের পুকুরের মাছ। গাছ থেকে সবজি পেড়ে আনা হল ফ্রিজ ভরার জন্য।

নছিমন আর ভারতীয় মহেন্দ্র এত জোরে দৌড়ায় যে এখন আর দুই ক্রোশ পথ যেতে দিন শেষ হয়না। কিন্তু পিচ ঢালা পথটাকে যে ভালবাসবেন সে গতি নেই। ভাল বাসতে গেলেই ভালবেসে আপনার গায়ে চড়বে নছিমন। দোষ হবে যোগাযোগমন্ত্রীর। মেটো পথেও দুই চাকার মটর বাইক ভট ভট শব্দ করে শুনতে দেবেনা পাখির ডাক। পাখিই বা কোথায়! সব পাখি মানুষের সেবায় লেগেছে চায়না এয়ারগানের গুলিতে।

যায় দিন ভাল যায়- আমার মত প্রাচীন চিন্তার মানুষগুলোর ধারণা এটাই। কিন্তু না, আসবে দিনও ভাল হবে। বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আট শতাংশ হবে, মানুষের আয় বাড়বে, ঢাকায় নাইট কাব বাড়বে, একটার বদলে দু’টো কই দিয়ে আমরা ভাত খাব। কইগুলো হবে আরও পুষ্ট। পুকুরে ইলিশ চাষ হবে। সবার ঘরে রান্না হবে সেটি।

কিন্তু আমার বসন্ত-বর্ষারা কী থাকবে? কাল বৈশাখির ঝড়ে কী আর ভেঙে পড়বে কৃষ্ণচূড়ার ডাল? চৈত্রের বিষন্ন দুপুরে বটের ছায়ায় কৃষাণী কী আর কৃষকের হাতে তুলে দেবে মাটির কলসির ঠান্ডা জল?

বসন্ত তুমি নির্বাসনে যাও, আসছে দিন কর্মব্যস্ততার। প্রতি ঘন্টায় প্রসব করবে টাকা। বর্ষা তুমি কাজে বাধা দিও না। এখন আর তোমাকে প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু শীত। এক্সিকিউটিভের চাকুরিতে, টাই পড়ার সুবিধাতে, সময়ের আগে অফিস যেতে, ঠান্ডায় বেশি কাজ করতে শীতের বিকল্প কী? ছুটিতে মন উদাস করতে নদীতীরে নয়, আমার আছে সীসা হাউজ।