ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সভ্য সমাজে মানুষের সুখ-শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মানুষ তুলে দিয়েছে তার প্রতিনিধির হাতে। জনগনের এই প্রতিনিধি তথা সরকার তার দায়িত্ব পালনের স্বার্থে আইন প্রনয়ন ও প্রয়োগ করে। কখনও কখনও তা আবার জনগনের নিরাপত্তার পরিবর্তে সকল মৌলিক অধিকার খর্ব করার নিমিত্তে কাজ করে। সরকার তার বিরাধীতা মোকাবেলা করার প্রয়োজনে অনেক কালো আইনের আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ইতিমধ্যেই কালো আইন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যে আর্থো-সামাজিক কাঠামোয় এ আইন প্রণয়ন হোক না কেন -তা কখনও মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়নি। বরং সর্বদা এর বিপরীতে তা ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত কোন ব্যক্তিকে আইন লঙ্ঘন বা অপরাধ সংঘটনের পূর্বেই আটক করা হলে ঐ আটককে নিবর্তনমূলক আটক বলে।এই আইনের ধারণা আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট নিবর্তনমূলক আইন পাশ করে। জ.ঠ. ঐধষষরফধু মামলায় হাউজ অব লর্ডস এই আইনের বৈধতা বিচার করতে গিয়ে বলেছিল যে, “যুদ্ধ বা জরুরী অবস্থায় জাতীয় স্বার্থে নিবর্তনমূলক বিধান বৈধ যদিও ইহা কিছু সময়ের জন্য নাগরিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত হানে।” এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঊসবৎমবহপু চড়বিৎ (উবভবহপব) অপঃ ১৯৩৯ পাশ করে যাতে নিবর্তনমূলক আটকের বিধান ছিল এবং এন্ডারশনের মামলায় হাউজ অব লর্ডস একই অভিমত ব্যক্ত করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্টে ও জরুরী অবস্থা সেবেলা করার জন্য এ ধরনের বিধান আছে। কিন্তু এ সকল দেশে যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত শান্তির সময়ে কখনো নিবর্তন মূলক আটকের কোন বিধান থাকে না। মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পাশকৃত আইন দুটিও বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু দুভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে এ আইন চালু হয়েছে সকল যুদ্ধের অবসান হলে। তারপরও এ আইন চালু করার পিছনে তৎকালীন সমাজ বাস্ববতার যুক্তি হয়তো অনেকে দেখাবেন সে বিষয় বাদই দিচ্ছি। কিন্তু এতোগুলো বছর পরেও এ আইনের কি গ্রহনযোগ্যতা থাকতে পারে? এর কি আদৌ কোন সামাজিক প্রয়োজনীয়তা আছে? বাংলাদেশ, ভারত, পাকিসতানের মতো তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে এরূপ আইনকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ স্পৃহাকে কার্যকর করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং হয়েছে। পাকিসতানের ২৩ বছরের শাসনামলে এরূপ প্রায় একডজনের মত অপঃ ধহফ ঙৎফরহধহপব–জারি করা হয়েছিল যার মাধ্যমে হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাদের বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারা ভোগ করতে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে কোন যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণের কোন পরিস্তিথি বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ- উদ্ভব না হলেও বিরোধী দলের মুখবন্ধ করার জন্য প্রত্যেক সরকার এ আইন ব্যবহার করে আসছে এবং তা বাতিলের কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। কিন্তু কোন সরকারই তা করতে সক্ষম না হলেও এ আইন বাতিল করতে আগ্রহ দেখায়নি। এরশাদ সরকার এই আইনের যথেচ্ছা ব্যবহার করেও বিরোধী দলের মুখ বন্ধ করতে পারেনি বরং আন্দোলনের মুখে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। ১৯৯২ সালের জুলাই মাসেই এই আইনে আটক করা হয় ৪৫০০ জন ব্যক্তিকে এবং দেশব্যাপি বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকের সংখ্যা ছিল ১০,০০০।

আইনি দৃষ্টিকোন থেকে সংবিধানে এ আইন আটকের বিধান সন্নিবেশ করলেই তা যে অগনতান্ত্রিক বা ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি বহন করবে এমনটি বলা যায় না। কেননা সংবিধানে যদি ভালো আইনগত রক্ষাকবচের বিধান থাকে তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে না। যদি সংবিধানে বলে দেয় থাকে যে , শুধু যুদ্ধ বা বহিরাক্রমন ব্যতিত অন্য কোন সময়ে নিবারণমূলক আইন প্রয়োগ করা যাবে না ;একজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি আটক রাখা যাবে না; আটককারীর আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থণের সুযোগ থাকবে তাহলে তা ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি বহন করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্টে ১৯৫০ সালে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয় যা নিবর্তন মূলক আটকের বিধান সম্বলিত। কিন্তু এ আইনে উপরোক্ত শর্তসমূহ সম্পর্কে ষ্পষ্ট বিধান থাকার কারনে ক্ষমতা অপব্যবহারের কোন সুযোগ নাই। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে নিবর্তন মূলক আটকের যে শর্ত আছে তা সম্পূর্ণরুপে এ ঝুঁকি বহন করে। সংবিধানের ৩৩ নং অনুচ্ছেদে সাধারণ আইনে আটক ব্যক্তির জন্য ৪টি রক্ষাকবচ থাকলেও নিবর্তনমূলক আইনে আটক ব্যক্তির জন্য তিনটি রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে।এ গুলো ১. উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, ২. যথাসম্ভব শীঘ্র আটকের কারণ জানানো, ৩. আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার। তবে আটককৃত কোন ব্যক্তি এ অধিকারগুলো ভোগ করতে পারে না। কেননা সংবিধানের ৩৩(৫)উপ-অনুচ্ছেদে একটি শর্ত জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে : “তবে শর্ত থাকে যে, আদেশদানকারী কতৃপক্ষের বিবেচনায় তথ্যাদি প্রকাশ জনস্বাথের্র বিরোধী বলে মনে হলে কর্তৃপক্ষ তা প্রকাশে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারবেন।” এশর্তটির কারণে ২ এবং ৩ নং অধিকার অর্থহীন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ কর্তৃপক্ষ তথ্যাদি প্রকাশ না করে শুধুমাত্র আটকের কারণ জানালে আটককৃত ব্যক্তির পক্ষে আদালতে বক্তব্য পেশের সুযোগ থাকে না। এছাড়া এ আইনের ৮(২) উপ-ধারা অনুসারে আটক ব্যক্তিকে আটকের কারণ জানাতে হবে ১৫দিনের মধ্যে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে , এ আইনে আটক ব্যক্তির তিনটি সাংবিধানিক রক্ষাকবচের ২টি অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং ১টি অধিকার ভোগ করতে পারে-তা হোল উপদেষ্টা পরিষদ সংক্রান্ত এবং সে অধিকারের প্রশ্ন আসে আটকের ৬ মাস পরে; তার আগে নয়। উপদেষ্টা পরিষদ একটা আধা বিচার বিভাগিয় কর্তৃপক্ষ হিসাবে কাজ করে; উপদেষ্টা পরিষদের সামনে আটককৃত ব্যক্তি কোন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না; এটা কোন আদালত হিসাবেও কাজ করে না; বন্দীর বিচারও করে না; পরিষদের সামনে আটকাদেশদানকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উপস্থাপিত আটকাদেশের বিষয়টি বিবেচনা করাই এ পরিষদের কাজ। ফলে ইহা সরকারের নিবর্তনমূলক আটকের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। এছাড়া প্রত্যেক দেশে নিবর্তন মূলক আটকের একটি সর্বোচ্চ মেয়াদ থাকে; ভারতে যার মেয়াদ ২বছর। কিন্তু আমাদেশের দেশে তা নাই। ভারতে এ আইনের অধীনে একজনকে ৩মাস আর আমাদের দেশে ৬ মাস কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখা যায়। অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশের মতো সুনির্দিষ্ট করে বলে দেয়া নাই যে কখন এ আইন বলে কাউকে আটক করা যাবে-যা এ আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এড়ঢ়ধষধহ বনাম ঝঃধঃব ড়ভ গধফৎধং মামলায় ই.ক. গঁশযধৎলবব অভিমত দেন যে, “এ দেশের মতো বিশ্বের কোন দেশেই নিবর্তনমূলক আইনকে সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা যায় না এবং ইহা জনগনের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর জোড়পূর্বক হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।” ৪৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে এ আইন কে অনেকটা গণতান্ত্রিক করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৪টি সংশোধনী পাশ হলেও নিবর্তনমূলক আইনের সাংবিধানিক কালো বিধানকে দূর করা হয়নি। যদিও আমাদের দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ এবং বি.এন.পি-উভয় দলেরই দলীয় ইস্তেহারে ছিল যে, তারা ক্ষমতায় গেলে বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল করবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এদের কেউ কথা রাখেননি। বরং প্রত্যেকে বিরোধী দলকে দমন করার মাধ্যম হিসেবে এ আইনকে বেছে নিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১লা জুলাই থেকে ১৯৯৭ সালের ৩০ এপ্রিল – এই দশ মাসে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক করা হয়েছে ৩৩২৪জন ব্যক্তিকে। সুতারাং একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে আমাদের দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলন দমন করা ছাড়া এ আইনের আর তেমন কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। দেশের গনতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার প্রয়োজনে এ দমনমূলক আইন এখনই বাতিল ঘোষণা করা উচিত। এ আইন প্রয়োগের ফলে সরকার যে পরিমান(!) লাভবান হয় এটি বাতিল করলে তার চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হবে।

***
লেখক:আইনজীবী,ঢাকা জজ কোর্ট।