ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রতিদিন-নির্দিষ্ট করে বললে প্রতি মুহুর্তে আমরা এবং আমাদের সমাজ এক একটা ভয়ংকর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে নির্যাতিত হচ্ছি-আমি এবং আমরা। পত্রিকার পাতায় ঠাঁই হচ্ছে কারো কারো। কেউ গুমরে কাঁদছে চার দেয়ালের মাঝে। তবুও থামছে না নতুন কান্নার শব্দ এবং ক্রমাগত তা বেড়েই চলেছে। নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখালেও এর থেকে মুক্তি মেলে না। ঢাকা থেকে ৩০০ কি.মি.র অধিক দূরত্বে গাইবান্ধার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের স্বর্ণা নির্যাতনের ঘটনাও ছুঁয়ে যায় আমাদের। নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও -স্বর্ণা তাড়ায় আমাদের। একের পর এক নির্যাতন; অসহ্য। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা ধরিয়ে দিয়েছে নয় বছরের ছোট্ট স্বর্ণাকে। ২০১০ সালের ২ আগস্ট। পৃথিবীর সর্বোত্তম নিষ্পাপ শিশুদের একজন স্বর্ণার শরীরে মিতু নামের এক পাষণ্ড এঁকে দিয়েছে হায়েনার নখের আঁচড়। স্বর্ণার রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে বিষ। সে বিষের যন্ত্রণায় ছোট্ট স্বর্ণা আজ বিবর্ণ এক পুতুল। এই এতটুকু বয়সেই সে ঘৃণা করতে শুরু করেছে তার শরীরটাকে। অথচ একটা মানুষের জীবনে তার শরীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কি আছে?
স্বর্ণা বিচার চেয়েছিল। ছোট্ট স্বর্ণার জানা নেই-এখানে বিচার এতো সহজে মেলে না। বিচার চাইতে গেলে নেমে আসে আরও নতুন নতুন নির্যাতন। থানা-পুলিশ-ডাক্তার-কোর্ট-উকিল শব্দগুলো এখনও স্বর্ণা ঠিকমতো বোঝে না। বোঝে না কেন সে বিচার পায় না।

থানায় মামলা হলে যে পুলিশ তদন্ত করে তাও তার ঠিকমতো জানা নাই। গাইবান্ধা সদর থানার পুলিশ ১৪/১০/১০ তারিখে মামলার একমাত্র আসামী মিতুকে নির্দোষ দাবী করে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়। পুলিশ তার রিপোর্টে বলেছে-“ স্বর্ণা দীর্ঘদিন হইতে মৃগী রোগে ভুগিতেছিল। ঘটনার তারিখ ইংরেজি ২/৮/১০ তারিখ দুপুরে আনুমানিক ১২.০০ ঘটিকার সময় ভিকটিম উম্মে সালমা স্বর্ণা বালুয়া হাসপাতাল কোয়ার্টারের মাঠে খেলাধূলারত অবস্থায় হঠাৎ মৃগী রোগের কারণে অসুস্থ হইয়া মাটিতে পড়িয়া যায়। এ সময় উক্ত কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে মিতু যাওয়ার সময় ঘটনা দেখিয়া ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য আশে পাশের লোকজনের সহিত ঘটনাস্থলে আগাইয়া যায়। ভিকটিমকে লোকজন উদ্ধার করিয়া বাদিনীর বাড়িতে লইয়া যায়। ভিকটিম ধর্ষিত হয় নাই। ”

পুলিশ তার এই রিপোর্টে আরও বলেন-“ মামলাটি তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষী-জবানে জানা যায় যে অত্র মামলার অভিযুক্ত মিতু(২০) একজন মেধাবী ছাত্র। মিতুর চাচার সহিত বাদিনী পক্ষের লোকজনের পারিবারিক ও সামাজিক বিষয় লইয়া দীর্ঘদিন যাবৎ মনোমালিন্য চলিয়া আসিতেছে। আসামী মিতুর চাচাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে বাদিনী পক্ষের লোকজন দীর্ঘদিন হইতে সুযোগ খুঁজিতে ছিল।”

পুলিশের এই রিপোর্ট কি এবং তাতে কি বলা হয়েছে- তা স্বর্ণা জানে না। সে এর গুরুত্বও বোঝে না। অবুঝ স্বর্ণার মতো আমরাও কি এই রিপোর্ট বুঝি না? আমরা কি জানি না এর গুরুত্ব? এমন হাজার হাজার রিপোর্ট প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে। এই রিপোর্ট তারই এক ধারাবাহিকতা মাত্র। রিপোর্টে স্বর্ণাকে মৃগী রোগী বলা হয়েছে। কিন্তু তা কিসের ভিত্তিতে? এই দাবীর পিছনে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে কি এমন কোন দালিলিক প্রমাণ আছে? মিতুর চাচার সাথে স্বর্ণার মামলার বাদিনীর পারিবারিক বিরোধ রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ আছে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে এই কথাটির ভিত্তি কি? লোকমুখে শুনে কি এমন একটি ঘটনার রিপোর্টে এমন সকল বিষয়ের উল্লেখ করে আসামীকে নির্দোষ দাবী করা যায়? এবং তা কতোটা আইনসঙ্গত?

এবারে আসা যাক মিতুর চাচার ঘটনায়। পুলিশ চাচার নাম দেননি। সুতরাং নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না কোন চাচার কথা হয়েছে। আমরা আমাদের অনুসন্ধানে মিতুর এক চাচার কথা জানতে পারি। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। এলাকায় এই চাচার রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব। অভিযোগ আছে তিনি তার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। ৩/৮/১০ তারিখে আসামীর গ্রেপ্তার ও ঘটনার বিচার দাবীতে যে মানব বন্ধন হয় তার আয়োজকদের অনেককে তিনি ভয়ভীতি দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে। স্থানীয় এক সাংবাদিককে হুমকি দিলে প্রেসক্লাবের মধ্যস্থতায় তার মীমাংসা হয়। এই চাচার নাম সালাম। স্থানীয় রাজনীতিবিদ সহ অন্য অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়-গাইবান্ধার রাজনীতিতে ধূমকেতুর মতো সালামের উত্থান। এই সালামের কারণে দলে অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতা কোণঠাসা হয়ে আছেন বলে অনেক নেতা জানান।

পুলিশ ১৬১ ধারার জবানবন্দি, ডাক্তারী রিপোর্ট সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে পেশ না করেই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করেছে। পুলিশ আজও খুঁজে বের করতে পারেনি অভিযুক্ত মিতুকে।
বর্তমানে পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজির শুনানী চলছে। শুনানী শেষে আদালত মামলাটি আমলে নিবেন নাকি আসামীকে মামলা হতে অব্যাহতি দিবেন তা আমাদের কারও জানা নাই। অপেক্ষা করা ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারবো না। আমরা অপেক্ষা করব এমন ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য। আমরা অপেক্ষা করব সত্য ঘটনা উদঘাটনের জন্য। আমরা অপেক্ষা করবো দোষী ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তির জন্য।
আমাদের এই অপেক্ষা চলতে থাকবে অনন্তকাল! কিন্তু এ অপেক্ষা আর কতদিন? আর কতগুলো ঘটনা ঘটলে আমাদের এই অপেক্ষা শেষ হবে! কতগুলো নিষ্পাপ মুখ শ্বাপদের বিষে নীল হলে আমাদের অপেক্ষা শেষ হবে! একটা স্বচ্ছ তদন্ত আর ন্যায়বিচার- মানুষের এই ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য পরবর্তী আর কতগুলো স্বর্ণাকে জীবনের শুরুতেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট-ঘৃণ্যতম আচরণের শিকার হতে হবে?

***
[লেখকঃ মানবাধিকার কর্মি। বসধরষ:ধফা.ৎধলরন@ুধযড়ড়.পড়স]