ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ছোটবেলায় ভাষা আন্দোলনের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। তারুন্যে এসে মাঝে মাঝে ভাবতাম, বায়ান্নতে অথবা একাত্তরে আমি যদি তরুণ থাকতাম, তাহলে কি ভাষার দাবিতে, স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে নামার সাহস পেতাম? সন্দেহ হত নিজেকে নিয়ে। কিন্তু আজকের পর আর এই সন্দেহ আমাকে কখনও ধরাশায়ী করতে পারবে না। আমি আজ গিয়েছিলাম। মুখোর হয়েছিলাম দেশমাতার টানে।

কাল যখন রাজাকার কাদের মোল্লার পাঁচটা গুরুতর অপরাধ প্রমানিত হওয়া সত্ত্বেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষিত হল, রাগে-দুখে-ঘৃণায় নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের ভেতর নিজেই ফুঁসছিলাম। রাজপথে খুব নামতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু আমি একা রাজপথে নেমে কি হবে, এই ভেবে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই ইন্টারনেটের কল্যাণে জানতে পারলাম, শাহবাগ মোড়ে প্রতিবাদে মুখোর হবে ছাত্র-জনতা। কিন্তু তাদের কাতারে যেয়ে সাথে সাথে আমার যেয়ে দাঁড়ানো হল না। একারনে সারারাত বিবেক যন্ত্রনায় ছিলাম। কিন্তু থেমে থাকিনি আমি, নিরব থাকিনি আমি। ইন্টারনেটে যতটুকু পেরেছি, গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিবাদ মুখোর থেকেছি। মন ভরেনি আমার। প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষে দুপুর দুইটা নাগাদ শাহবাগ মোড়ে পৌঁছলাম আজ। মোড়ে তখন জনতার ঢল।

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে একটা গান লিখে গিয়েছিলাম। “বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা
আজ জেগেছে সেই জনতা।”
মনে মনে এই গান গাইতে গাইতে চলছিলাম পথ। শাহবাগ মোড়ের কাছে যেতেই কানে ভেসে এলো ফকির আলমগীরের গলায় “বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।” শীতকাটা দেয়ার মত শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল উত্তেজনায়। জনতার সেই মিলনমেলার যত কাছে যাচ্ছিলাম, তত মনে হচ্ছিল, আমি এক তুচ্ছ লোহাখণ্ড আর শাহবাগ মোড়টা এক বিশাল চুম্বকক্ষেত্র। প্রচণ্ড আকর্ষণ সেখানে। দ্রুত মিশে গেলাম জনতার মাঝে। ধীরে ধীরে জনতার মাঝে যেয়ে বসলাম। জনতা তখন স্লোগানে মুখোর। ‘ক তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার। ন তে নিজামী, তুই রাজাকার তুই রাজাকার। ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই।’ স্লোগানে স্লোগানে মুখোর আকাশ বাতাস। আর একটু পর পর শিল্পীর গলায় বেজে উঠছে সঙ্গামী গান। ছাত্র-শিক্ষক-চাকরিজীবী-শ্রমিক-মালিক-সাংবাদিক, সমাজের সকল স্তরের মানুষ এসে মিশে যাচ্ছে জনতার মাঝে, একাত্মতা জানিয়ে গেয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের গান, জাতিসত্তার গান।

সাড়ে তিনটার সময় আমাকে শাহবাগ চত্বর ত্যাগ করা লাগে গ্রন্থমেলায় জরুরি কাজের কারণে। কাল থেকে গ্রন্থমেলাও মুখোর রায়ের প্রতিবাদে। লেখক আড্ডায় ঘুরেফিরে একটা হতাশা, একটা ক্ষোভ ফেটে পড়ছে। আজও তেমনই ছিল।

পাঁচটা নাগাদ আবার যেয়ে মিশে গেলাম জনতার কাতারে। শিল্পীর সাথে গলা মিলিয়ে সবাই মিলে গেয়ে উঠলাম স্বাধীনতার গান। স্লোগান আর হাততালিতে মুখোর হলাম সবার সাথে তাল মিলিয়ে। এরই মাঝে আমাদের সামনে দুটো মেয়ে এসে রাস্তায় বসতে ইতস্ততবোধ করছিল। কারন তারা বসার জন্য যে স্থানটা পছন্দ করেছিল দূর থেকে, কাছে এসে দেখে সে স্থান পানি পড়ে ভিজে আছে। আচমকা আমি চেচিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম,”ম্যাডাম, কাপড় নষ্টের চিন্তা কইরেন না। পুরা বাংলাই আজ নষ্ট হয়ে গেছে। বইসা পড়েন চিন্তা না কইরা।” সাথে সাথে আশেপাশে হাততালি আর মৃদু হাসির গুঞ্জন উঠল। সেইসাথে পিঠে আলতো চাপড়ও দিল কয়েকজন সমর্থন জানাতে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি, আমার এই নগন্য কথা জনতার এত পছন্দ হবে। তাই একটু চমকে গিয়েছিলাম প্রতিক্রিয়ায়। মেয়ে দুটো আমার কথা শুনে সরে গেল সামনে থেকে। মনে মনে ভাবলাম, হয়তো ভুল কিছু বলে ফেলেছি যদিও আশেপাশের মানুষগুলো আমার কথা পছন্দ করেছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়ে দুটো আবার ফেরত আসল, ভেজা ময়লা রাজপথের সে স্থানেই তারা বসে পড়ল। বসার আগে একবার আমার চোখে চোখ রাখল দুজনই। যে চোখ জ্বলছিল তখন। হয়তো আমাকে বোঝাতে চাইছিল, বাংলা পবিত্র না হলে আমাদের আজ নষ্ট হয়ে যাওয়া কাপড়ও পরিস্কার হবে না। প্রয়োজনে আরও কাপড় নষ্ট করব, রাজপথে বসে প্রতিবাদমুখোর হয়ে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানাব, তবু বাংলার সম্মান বাঁচাব।

মুক্তিযুদ্ধের চৌদ্দ বছর পর আমার জন্ম। ভাষা আন্দোলন তো আমার কাছে রূপকথা। কিন্তু আজকের পর আমিও গর্ব করে বলতে পারব, সাহস নিয়ে বলতে পারব, দেশমাতার জন্য আমিও যেকোনো সময় রাজপথে নামতে জানি, আমিও রাখি দেশের জন্য শহীদ হওয়ার সাহস। কিছু আগে ফিরে এসেছি বাসায়। তবে এখানেই আমি থেমে রইব না। হাজার জনতা রাজপথে, আমি আপন ঘরে কি করে শান্তিতে থাকি। সারারাত গণসংযোগ চালাব। আহবান করব সবাইকে, আগামীকাল সকালে আবার যাব আমরা শাহবাগে। অন্যায় বিচার মানি না, মানব না। রাজাকারের ফাঁসি যতদিন না হবে, ততদিন এই জনতার মাঝে আমিও এক জনতা হয়ে উন্মাদ রইব দেশমাতার সম্মান রক্ষায়। আজ গিয়েছিলাম, কাল সকালে আবার যাব। সারাদিন মুখোর থাকব অন্যায় বিচারের প্রতিবাদে।