ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

সময় কত দ্রুত বয়ে যায় । দশম ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করলে মনে হয়, এইতো সেদিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে চোখ ধাঁধানো উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানের কথা । অথচ পার হয়ে গেছে চার বছর । ২০১১ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারী ঢাকার মীরপুরের শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল উদ্ভোবনী অনুষ্ঠানে ঠিক দু’দিন পর এবং ২রা এপ্রিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে দশম বিশ্বকাপের ইতি ঘটেছিল । এশিয়ার চারটি পরাশক্তি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান ১০ম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের যৌথ আয়োজক ছিল ।

যদিও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পাকিস্তানে কোন ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি । ’১১ বিশ্বকাপে আইসিসির পূর্ণ ১০ সদস্য এবং সহযোগী সদস্যদের মধ্য থেকে ৪টি অর্থ্যাৎ মোট চোদ্দটি দলের ৪৯ টি ম্যাচের লড়াই শেষে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করে ভারত । মাঠে ও মাঠের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২০০ কোটি দর্শক-শ্রোতা ভারতীয় উপমহাদেশে আয়োজিত মনোমুগ্ধকর খেলা উপভোগ করে । সময় তার আপন গতিতে পাড়ি দিয়ে একাদশ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আমাদের দ্বারে উপস্থিত হয়েছে ।১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে ৬ দলের অংশগ্রহনে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট কালের বিবর্তনে ১১তম আসরে পদাপর্ণ করেছে । ’১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী আনুষ্ঠানিক ভাবে পর্দা উঠবে এবারের আসরের । অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে এ আসর আয়োজন করেছে । উল্লেখ্য যে, ১৯৯২ সালের পর দেশ দু’টি যৌথভাবে দ্বিতীয়বারের মত ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে । এবারের আসরে গ্রুপ এ-তে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডে এবং গ্রুপ বি-তে দক্ষিন আফ্রিকা, পাকিস্তান, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে নামবে । ১৪ ফেব্রুয়ারী অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দিবা-রাত্রির ম্যাচ দিয়ে মাঠের লড়াই শুরু হবে । ১৪ টি দেশের প্রায় দু’শতাধিক স্বীকৃত খেলোয়ার গোটা বিশ্বের শত শত কোটি দর্শকদেরকে আনন্দ দেওয়ার জন্য পূর্ণ প্রস্ততি নিয়েছে । এবারের আসরে অস্ট্রেলিয়ার ১৪ মাঠে ২৬টি এবং নিউজিল্যান্ডের ৭ মাঠে ২৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে । গত আসরের ন্যায় এবারের আসরেও সম-সংখ্যক দলের সম-সংখ্যক ম্যাচ শেষে ২৯ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠানে মধ্য দিয়ে এবারের আসরের পর্দা নামবে । যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্তান এবারের আসরে প্রথমবারের মত খেলার সুযোগ পাচ্ছে ।

এবারের আসরে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে মাশরাফি বিন মতুর্জার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ২৪ জানুয়ারী অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে । আইসিসির পক্ষ হতে ফেব্রুয়ারীর ৩ তারিখ থেকে সকল দলের আতিথেয়তার ব্যয়বার বহন করার সিদ্ধান্ত থাকলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে আশায় বসে থাকেনি । অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে খাপ-খাওয়ানের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ বিসিবির খরচে ১০ দিন পূর্বেই তারা অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে পুরোদস্তুর অনুশীলনে মনোনিবেশ করেছে । এতে আর্থিকভাবে বিসিবি অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হলেও নতুন পরিবেশের লড়াইয়ে অন্যান্য সফরকারী দলের তুলনায় বাংলাদেশ যে বেশি সুবিধা পাবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায় ।১৮ ফেব্রুয়ারী নবাগত আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ক্যানবেরার ম্যানুকা ওভালের ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা হবে । ওয়ানডে ক্রিকেট র্যা ঙ্কিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৯ নম্বরে হলেও আসন্ন বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে গঠিত বাংলাদেশ দল বিশ্বের যে কোন ক্রিকেট পরাশক্তিকে নাকানি-চুবানি দেয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে । তাই ক্রিকেট বিশ্বের তাবৎ শক্তিধর প্রতিটি দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মাঠে নামার পূর্বে কয়েকবার নতুনভাবে পরিক্লপনা সাজাবে এবং বাংলাদেশকে বেশ সমীহ করতে বাধ্য হবে বলেই বিশ্বাস ।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এবারের আসরসহ বাংলাদেশ সর্বমোট পাঁচবার প্রতিনিধিত্ব করার গৌরবোজ্জ্বল সম্মান অর্জন করছে । ১৯৯৯ সালের প্রথম আসরে ক্রিকেটের মহা-পরাশক্তি পাকিস্তান বধ, ২০০৭ সালে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বধ, ২০১১ এর আসরে ঘরের মাটিতে পরাশক্তি ইংল্যান্ড বধসহ কম শক্তিধর আরও কয়েকটি দলের বধের চিত্র বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটমোদী দর্শক পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করেছে এবং বাংলাদেশের শক্তি ও সাধ্য সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে হয়েছে । এবারের আসরেও বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা হাজার মাইল দূরত্বে বসে বিশ্বের ক্রিকেট পরাশক্তিগুলোকে ধবল-ধোলাই করবে আর বাংলাদেশের এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটেয়ে থাকা বাংলাদেশীরা আনন্দে আত্মহারা হবে । বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের অর্জনে মুগ্ধ হয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় বাংলাদেশের ছেলেদের এবং বাংলাদেশেকে নিয়ে কত ধরণের প্রশংসা করা হবে এবং বাংলাদেশকে নতুনভাবে বিশ্বের সম্মূখে তুলে ধরবে তা অগ্রিমভাবে ভাবতেই ভালো লাগছে এবং মনে আনন্দের সঞ্চার করছে ।

যে দেশের হয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের মত তারকা মাঠে নামবে তাদের আর ভয় কি ? তবুও ক্রিকেট যেহেতু একজনের খেলা নয় সুতরাং বাংলাদেশের তরুণ তুর্কীরা তাদের দলগত অর্জনের মাধ্যমেই বিজয় ছিনিয়ে আনবে এবং বাংলাদেশীসহ বিশ্বের সকল ভক্ত-সমর্থকদের মানসিক তৃপ্তিতে ভরিয়ে দিবে । ব্যাট হাতে বাংলাদেশের তামিম, মুশফিক কিংবা মুমিনুলরা বল হাতে মাশরাফি, তাজুল কিংবা রুবেলরা এবং ক্যাচ লোফা কিংবা প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের জোড়ালো শর্ট রুখে দেয়ার জন্য সাকিব, নাসির কিংবা মাহমুদরা যখন সাফল্য দেখাবে তখন মাঠে উপস্থিত হাজারো সমর্থকদের করতালি পাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, ভাষ্যকারদের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের নাম এবং হাজার মাইল দূরে ইন্টারনেট, টিভি কিংবা রেডিওর সামনে বসে বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ সকল বয়সের, সকল পেশার নারী-পুরুষ বাংলাদেশের জয়ের জন্য প্রার্থণায় মগ্ন থাকবে । বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকরা যতবেশি দেশের ক্রিকেটকে ভালোবাসে, অর্জনে সুখি হয় এবং ব্যর্থতায় কষ্ট পায় এত মারাত্মকভাবে বিশ্বের কোন দেশের সমর্থকরাই তাদের দেশের ক্রিকেট নিয়ে ভাবেনা ।

ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশীদের আবেগ খুব বেশি ঠুনকো হওয়ায় তারা দেশের প্রতিটি জয়ে যেমন আনন্দে আত্মহারা হয় তেমনি পরাজয়ের খবরে বুকফাটা কষ্ট অনুভব করে । যে দেশের, যে দলের এমন স্বার্থত্যাগী অনুরক্ত-ভক্ত আছে তাদের সাফল্য আসবে, আসতেই হবে । সত্যি কথা বলতে কি, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশীদেরকে সম্মানের সাথে পরিচিত করেছে ক্রিকেট । বাংলাদেশের মানুষ যতগুলো শুভ সংবাদ শ্রবন করেছে তার সিংহভাগ ক্রিকেটের হাত ধরে । বিশ্বের এমন কোন ক্রিকেট খেলুড়ো দল নাই যাদেরকে বাংলাদেশের উদ্যমী তরুণরা বাইশ গজের সীমানায় পরাজয়ের শৃঙ্খলে না জড়িয়েছে ।অতীতের পরিসংখ্যান দিয়ে ক্রিকেটের ভবিষ্যত বলা মুশকিল । বাংলাদেশের বেলায় সে সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ । সুতরাং ১৮ ফেব্রুয়ারী থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেটদল তা আবারও প্রমান করার জন্য মরিয়া হয়ে রয়েছে । আমরাও বাংলাদেশের বিজয়ে আনন্দ মিছিল দেয়ার জন্য, মিষ্টি মূখ করার জন্য সদা প্রস্তুত । শত কোটি মানুষের প্রার্থনা এবং মাঠে ১১ তুর্কীর উদ্যমতায় আমাদেরকে স্বর্গের সূখ দেবেই । বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য হাজার, লাখ কিংবা কোটি নয় বরং অগণন শুভ কামনা ।

দেশে সূখ না থাকলে মনে সূখ থাকার প্রশ্নই ওঠে না । বাংলাদেশে যেভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা চলছে তাতে ক্রিকেটের সূখ কতটুকু উপভোগ করা যাবে তা স্রষ্টাই ভালো জানেন । পেট্রোল বোমার আঘাতে যখন অর্ধশতাধিক মানুষ দ্বগ্ধ হয়ে মারা গেল, শত শত মানুষ শরীরের অধিকাংশ জায়গায় পোড়ার ক্ষত নিয়ে ডুকড়ে ডুকড়ে কাঁদছে, হাজার হাজার স্বজন তখন তাদের প্রিয় মানুষের জীবন নিয়ে শঙ্কিত, শিক্ষার্থীরা যখন স্কুলে যেতে পারছে না, পরীক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে ছুটছে, মজুরদের আয়ের পথ যখন বন্ধ, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে যখন ব্যবসা গুটানো চিন্তা করছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যখন দুরত্ব সৃষ্টি হয়েই চলছে তখন ক্রিকেট ম্যাচ উপভোগ এবং এটা কতটুকু প্রশান্তি দিতে পারবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল ।

গোটা দেশটাই যখন অশান্তি আর অনিশ্চয়তার রোষানলে তখন বিনোদন আর কতটুকু উপভোগ্য থাকে ? মানুষ যখন কর্ম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় কিংবা মনে বিস্বাদ আসে তখন বিনোদনের প্রয়োজন পড়ে এবং এর মাধ্যমে মানুষ আবার সতেজ হয়, নতুনভাবে উদ্যমতা পায় । কিন্তু আমরা তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছি ভিন্নভাবে । দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার ক্লান্ত । এ ক্লান্তি দূর করার ক্ষমতা কি ক্রিকেটের মত বিনোদনের আছে ? মনে সূখ না থাকলে দীর্ঘ সাত ঘন্টা টিভির সামনে বসে দেশের খেলা উপভোগ করার ধৈরর্য্য বোধহয় খুব কম মানুষের আছে ।

দেশে যেভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে তাতে বাংলোদেশের জয়ে মুখের কোনে একটু হাসি এবং পরাজয়ে সামান্য দীর্ঘশ্বাস বহি আর কিছু প্রকাশ করার ক্ষমতা দেশবাসীর থাকবে বলে বিশ্বাস নয় । তবুও আমরা ক্রিকেটের মহারণের স্বাদ উপভোগ করতে চাই । রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণের মাধ্যমেই কেবল এটা সম্ভব এবং রাজণৈতিক কর্তাব্যক্তিরা এটার সমাধান করতে পারেন । আশা নয় বিশ্বাস, বাংলাদেশের তরুণরা ক্রিকেট মাঠে নামার পূর্বেই সকল সমস্যার সমাধান হবে এবং দেশবাসী মনের আনন্দে ক্রিকেট খেলা উপভোগ করার অবকাশ পাবে।

মনে অনেক কষ্ট থাকলেও তা বুকের মধ্যের চাপা দিয়ে উচ্চঃকন্ঠে বলছি, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের প্রতি শুভ কামনা । আমরা কোন অবস্থাতেই দেশের চাপ তোমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চাইনা । মাঠে তোমাদের অনবদ্য অর্জনের মাধ্যমেই দেশকে আবারও তুলে ধর বিশ্বের দরবারে । দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদেরকে আবারও সম্মানিত ও গর্বিত কর । সাধ্যটুকু মাঠে উজাড় করে দাও । নিশ্চয়ই তোমাদের সফলতা সন্নিকটে । দেশের মানুষ যখন দেশের আভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক দুঃসংবাদ শুনতে শুনতে ক্লান্ত তখন তোমরাই পার দেশের মানুষকে আবারও শান্তি দিতে । দেশবাসীর জন্য নিশ্চয়ই এটুকু করবে।