ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

তিনবেলা পেট পুড়ে খেতে পারা যদি ভালো থাকা হয় তবে বিশ্বে সবচেয়ে ভালো ছিল গাদ্দাফীর অধীনে লিবিয়াবাসী । শুধু উন্নয়ণের দোহাই দিয়ে যদি ক্ষমতায় টিকে থাকা যেত তবে আজীবন ক্ষমতায় থাকত রাশিয়ার সমাজতন্ত্র । লিবিয়ার কর্ণেল মুয়াম্মার গাদ্দাফী কিংবা রাশিয়ার সমাজতন্ত্র-কোনটাই স্থায়ী হয়নি । উদারপূর্তি করে খাদ্য গ্রহন আর অর্থ-বিত্তের মালিকানা ছাড়াও মানুষের জীবনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দরকার । যে অধিকার মানুষ জন্ম সূত্রেই লাভ করে কিন্তু কখনো কখনো তা বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্থ হয় । তবে কোন বাধাতেই মানুষ সে অধিকার ত্যাগ করতে রাজি হয়না বরং যে কোন মূল্যেই তা ফিরে পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় । যদিও তা আপাত দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বিরোধী কিংবা আইন বহির্ভূত মনে হয় তবে থেমে থাকা হয়না । বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের এমন অনেকগুলো রাষ্ট্র আছে যেখানের প্রতিটি নাগরিক জন্মসূত্রেই প্রচুর অর্থ-বিত্তের অধিকারী হয় কিন্তু সেই তারাও শান্তিতে ছিল না । ‘আরব বসন্তে’ মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে মিশর, লিবিয়াবাসীর উত্থান এমনটাই জানান দিয়েছে । লিবিয়ার সিংহভাগ মানুষ মনে করে গাদ্দাফী যুগের শাসনকে লিবিয়ার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা চলে কিন্তু শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার তথা বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার কারণে তাকে কেবল সিংহাসন বিচ্যুতই হতে হয়নি বরং ভয়াবহ পরিণতির মাধ্যমে জীবন দিতে হয়েছে । বিশ্বের সাবেক পরাশক্তি রাশিয়ার সমাজতন্ত্রিক দল উন্নয়ণের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ ৭৪ বছর শাসন করেছে । এই দীর্ঘ সময়ে রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও পেয়েছিলো কিন্তু সমাজতন্ত্রের পরিণামও ভয়াবহ হয়েছে । রাশিয়ার জনগণ স্বাক্ষী হয়েছে গণতন্ত্রহীনতার দুর্বিষহ পরিস্থিতির । বাংলাদেশেও বর্তমানে তেমন পরিস্থিতি চলছে । কেবল উন্নয়ণের দোহাই দিয়ে বলা হচ্ছে, আগে উন্নয়ণ পরে গণতন্ত্র । সরকারের এ সূত্র এদেশ এবং দেশের মানুষের জন্য কতটা কল্যানকামী হবে তা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের পরিণতি থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায় । যেখানে মানুষের বাকস্বাধীনতা নাই সেখানে গণ-বিষ্ফোরণ ঘটবেই । তবে বন্দুকের নল কিংবা দমন-পীড়নের মাধ্যমে কিছুকাল হয়ত বিস্ফোরণ উম্মূখ জনসমষ্টিকে দমিয়ে রাখা যাবে তবে পিঠ দেয়ালে ঠেকলে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে যে ধাক্বা আসবে তাতে কোন ক্ষমতাই টিকে থাকতে পারেনি । রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতদ্ধন্দ্ব সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক তবে এ মতপার্থক্য পরস্পরের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত । রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হবে কিন্তু্ এর মধ্যে যদি পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী টেনে আনা হয় তবে তা স্থায়ীভাবে সংকট বৃদ্ধি করবে । সময়ের বিবর্তনে এই শান্তিশৃঙ্খলা ও সামরিকবাহীনি পূর্বে যাদের বন্ধু ছিল সেই তাদেরকেই দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করবে, অতীতে এমনটাই হয়েছে ।

 

মানুষকে শাসন করার জন্য গণতন্ত্র ছাড়া অন্য কোন উত্তম পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি । গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনমত । জনমতকে উপেক্ষা করে গণতন্ত্র এক কদমও সামনে অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতা রাখে না । তবে মাঝে মাঝে গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র কিংবা ফ্যাসিবাদের মত জগদ্দল পাথর জনগণের বুকে চেপে বসে । মহামতি দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল সম্ভবত গণতন্ত্রের এই নেতিবাচক দিকের বিচেনায় গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিকে নিকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা বলেছিলেন । তবে গণতন্ত্রের অনেক সমালোচনা থাকলেও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে এর চেয়ে উত্তম কোন শাসন পদ্ধতি বর্তমান পৃথিবীতে আছে বলে প্রতীয়মান হয়না । সুষ্ঠু গণতন্ত্র আছে কি নাই তা নির্ধারণের জন্য অনেকগুলো মাপকাঠি রয়েছে । তবে জেফারসনের মতে গ্রহনযোগ্য মাপকাঠি হল, যদি সরকার জনগণকে ভয় পায় তবে সেটা গণতন্ত্র আর যদি জনগণ সরকারকে ভয় পায় তবে সেটা গণতন্ত্রের বিপরীত কোন মতবাদ । বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কি-তা পাঠকের বিবেচনায় ছেড়ে দিলাম । স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বারবার গণতন্ত্র ধাক্কা খেয়েছে । সর্বশেষ সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের দীর্ঘ দিনের স্বৈরশাসন ছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে চরম হেলাফেলা । তবে দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে টিকতে না পেরে দীর্ঘ দশ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয় । সাবেক সেই স্বৈরশাসককে নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাশীনরা গত বছরের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতাশীন হওয়া গণতন্ত্রের জন্য খুব বেশি ইতিবাচক বার্তা বহন করে না । দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহন না করায় বিদেশীদের কাছে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তেমন গ্রহনযোগ্যতা পায়নি । ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ বার বার আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট দূর করে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজনের আহ্বানই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ দিয়েছে ।

 

২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ক্রিকেট খেলার জন্মদাতা ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে । এ জয়ে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মত ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজনের কোয়াটার ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে । হাজার মাইল দূরত্বের অস্ট্রেলিয়ার এ্যাডিলেডে বাংলাদেশে দামাল ছেলেরা বৃটিশদেরকে হারানোর পরেই আনন্দের ঢেউ উঠেছে গোটা বাংলাদেশে । শুধু আমুদে ক্রিকেট ভক্তই নয় বরং আনন্দচ্ছটা লেগেছে রাজনৈতিক দলগুলোতেও । ক্ষমতাশীনরা যেমন বিজয় মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে তেমনি আন্দোলনরত বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দল তাদের পূর্ব ঘোষিত হরতাল শিথিল করে ১০ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশে বিজয় মিছিলের ডাক দিয়েছে । প্রথমে মনে হয়েছিল, এ মিছিলে দেশের সমগ্র জনসাধারণ অংশগ্রহন করবে কিন্তু রাজধানীসহ সবগুলো বড় শহরের অবস্থা দেখে প্রকৃতপক্ষেই হতাশ হতে হয়েছে । শুধু রাজনৈতিক দলের কিছু কর্মী ছাড়া এ বিজয় মিছিলে কাউকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহন করতে দেখা যায়নি । ২০ দলের পক্ষ থেকে বিজয় মিছিলের অবস্থা ছিল আরও করুণ । সাধারণ মানুষের ভাষ্যানুযায়ী, অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় তারা বিজয় মিছিলে অংশগ্রহন করেনি । মূলত দেশে এমন ভয়াবহভাবে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি চলছে যাতে সাধারণ মানুষ রাস্তায় বের হতেও ভয় পায় । কেউ গণতান্ত্রিক অধিকার আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের নামে অবরোধ ও হরতাল আহ্বান করে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করার উপলক্ষ্য তৈরি করেছে আবার কেউ গণতান্ত্রিক অধিকার ব্যাখ্যা করে বিনা বিচারে মানুষকে গুলি করে হত্যা এবং বিরোধীমত দমনে তৎপর রয়েছে । মূলত কোনটা যে গণতন্ত্র আর কোনটা গণতান্ত্রিক অধিকার তার হিসাব মিলাতেই সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে ।

 

গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে প্রধানত বাক-স্বাধীনতার মাধ্যমে মত প্রকাশ ও ভোটাধিকারের মাধ্যমে পছন্দনীয় প্রার্থী বাছাইয়ের স্বাধীনতা থাকা বুঝায় । এ দু’টো অধিকারই প্রায় মানুষ হারিয়ে ফেলেছে । বিচার বিভাগের রায়ের মাধ্যমে কৌশলে রাষ্ট্র বাক-স্বাধীনতা হরণ করেছে । অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের কারণে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গত সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে । বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সুতরাং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রাষ্ট্র হরণ করেছে বলতে বাধা থাকার কথা নয় । বাক-স্বাধীনতা যদি রুদ্ধ হয় তবে দেশের ক্ষমতাশীন গোষ্ঠী সামান্য উপকৃত হয় ঠিক কিন্তু দেশের সর্বনাশের ঘন্টা ধ্বণিত হতে শুরু করে । ক্ষমতাশীনরা যখন ভূল পথে হাটে তখন তাদেরকে সঠিক পথে দেখিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা যদি কারো না থাকে তবে সেটা রাষ্ট্রের জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলের জন্যও অমঙ্গলের । দেশের কোন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলেরেই এক বা একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার বাসনা থাকে না বরং এ বাসনা দীর্ঘ মেয়াদি । কাজেই সে বাসনাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য জনগণকে কাছে টানতে হবে । জনগণকে কাছে টানার একমাত্র পন্থা হল জনমতকে প্রধান্য দেয়া এবং জনগণের ভাষা বুঝতে পারা । ভোটাধিকার মানুষের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার । দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় পর‌্যায়ে এ অধিকার প্রয়োগের সময় উপস্থিত হয় । কিন্তু তখন যদি মানুষ তাদের এ অধিকারটুকু প্রয়োগ করার সুযোগ না পায় তবে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয় । গত জাতীয় নির্বাচনে ১৫৪টি আসনের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে । বঞ্চিতদের মধ্যে দু’দলের সমর্থকই ছিল । কিন্তু যারা ভোট দিতে পারে নি তারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের কাছে অপাঙক্তেয় মনে করে হতাশায় ডুবেছে । ক্ষমতাশীনদের বিপক্ষের নাগরিকরা যেমন সুযোগ পেলেই সরকার পতনের আন্দোলনে জড়িত হচ্ছে তেমনি ক্ষমতাশীনদের সমর্থকরাও তাদের নেতা-নেত্রীদের প্রতি ক্ষোভে ফুঁসছে এবং নতুন সমীকরণে সাজাচ্ছে । কেননা সাধারণ নাগরিকদের তো বিশাল ক্ষমতা নাই শুধু ভোট প্রয়োগের অধিকার ছাড়া । সেটুকু কেড়ে নিলে আর অবশিষ্ট থাকে কি? সুতরাং সার্বিক দিক বিবেচনা করে সবার মঙ্গলের জন্যই রাষ্ট্রের কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার আবারও সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে । দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা বিরাজ করছে তা দূর করতে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া ভিন্ন কোন পথ আছে বলে আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69mathbaria@gmail.com