ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

একটি দেশের ভবিষ্যত নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর । শিক্ষা জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে যত বেশি যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে তারা ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে । সেজন্যই উন্নত বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য খাতের মধ্যে তারা শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় । তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, শিক্ষায় অগ্রগতি করতে না পারলে কোন ভাবেই বর্তমান প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয় । শিক্ষার্থীদেরকে তারা রাষ্ট্রের পুঁজি বলে মনে করে । সীমাহীন ত্যাগ করে হলেও তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করে । শিক্ষার্থীদেরকে মেধা-মননে যোগ্য করে গড়ে তুলতে তারা চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখে না । সর্বোপরি, শিক্ষাকে তারা সকল স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দেয় । তাইতো উন্নত বিশ্বের কোথাও কখনো শিক্ষার্থীদেরকে তাদের স্বার্থ আদায়ের জন্য ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নামতে দেখা যায়না । এমনকি রাষ্ট্রে সরকারসহ অন্যসব কিছুর ভেতর বিশাল পরিবর্তন হয়ে গেলেও তার সামান্যতম আছড় তারা শিক্ষার্থীদেরকে অনূভব করতে দেয় না । তাদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রধান দায়িত্বই হল জ্ঞানার্জন করা । মানবজীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সময় যেন কোনভাবেই হেলায়-ফেলায় নষ্ট না হয় সেজন্য তারা সর্বদা সচেতন থাকে । পরিবার কর্তৃক সন্তানকে শিক্ষিত করার সামর্থ্য না থাকলেও সে সন্তানকে যথোপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্র সকল ব্যয়ভার বহন করে । সে সকল দেশের শিক্ষা কাঠামোকেও এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কাউকে উচ্চশিক্ষা গ্রহন শেষে বেকার বসে থাকতে না হয় । রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করার প্রশ্ন তো তাদের কাছে আসেই না । এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পর বিবাদ দেখা দিলে তারা ঐক্যবদ্ধভাবেই শিক্ষার্থীদেরকে তা থেকে দূরে রাখে । আমরা কথায় কথায় বলি, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড অথচ মেরুদন্ডকে সোজা রাখতে যেটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার তা আমাদের দেশে অনুপস্থিত থাকলেও উন্নত বিশ্বের কোন রাষ্ট্রেই তা অনুপস্থিত নয় । কাজেই সে সকল দেশের মানুষ যখন বলে, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড তখন তাদের সে কথার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় । আর আমরা যখন তাদের মত করে বলি, তখন আমাদের মূখের কথা মূখেই শোভা পায় কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না । আমরা আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও জিম্মি করে রাখি অথচ উন্নত জাতিসমূহ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অজস্র ত্যাগ স্বীকার করে তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে জ্ঞানের রাজ্য উম্মুক্ত করে দেয় । আমাদের দেশের শিক্ষকরা যখন তাদের আয় দিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে ন্যূণতম সম্মান নিয়েও সমাজে বাস করতে পারে না তখন অন্যান্য দেশের শিক্ষকরা সমাজের সবচেয়ে সম্মানীত আসনে সমাসীন হয় । সুযোগ পেলেই বাক্যবাণে আমরা আমাদের ভবিষ্যত উন্নতির স্বপ্ন ফেরি করে দেশকে হাজার বছর এগিয়ে দেই অথচ যাদেরকে পুঁজি করে স্বপ্ন দেখি সেই তাদেরকে কতটুকু নির্ভরতা দিতে পেরেছি ?

 

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কখনোই পূর্ণভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি । ব্যক্তিগত, দলীয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের নানা ধরণের ক্ষতি সাধিত হচ্ছেই । বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে ভয়াবহ ও দুর্বিষহ সময় চলছে । স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘসময় টানা অবরোধ ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতিরেকে হরতালের স্বাক্ষী অতীতে কোন প্রজন্মকেই হতে হয়নি । দিন যত বাড়ছে সমস্যাও বোধ হয় তত দীর্ঘায়িত হচ্ছে । ক্ষমতার মোহে রাজনৈতিক দলগুলো সকল স্বার্থ ত্যাগ করে শুধু নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা ভাবছে । নমনীয়তা তো দূরের কথা বরং হাতের নাগালে পেলে পরস্পর বিরোধীপক্ষকে যেন ছিড়ে খাওয়ার অবস্থা । রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে জীবনহানী ও সম্পদ ধ্বংসের মিছিল কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে । একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়ে গুটিয়ে নিচ্ছে । আশঙ্কাজনভাবেই কমে যাচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগ । এত কিছুর পরেও এ জাতির দমে যাওয়ার কথা নয় কেননা এদেশের সম্পদ-সম্বল স্বরূপ রয়েছে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী । জনসংখ্যায় বাংলাদেশের কাছাকাছি বিশ্বের এমন কোন দেশ নাই যারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে, তাদের এত অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে । যারা ভবিষ্যতে যে কোন ধরণের প্রতিকূলতার উপরে দাড়িয়েও বিপ্লব আনয়ণের ক্ষমতা রাখে । বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়শীল রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহনরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ কোটি । এমন সম্পদ থাকায় এ জাতির ভাগ্য বদলানো তো সময়ের ব্যাপার মাত্র । তবে রাষ্ট্র যে পন্থায় শিক্ষার্থীদেরকে পরিচালিত করছে তাতে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের উন্নয়ণের বাহন হবে নাকি বোঝা হবে-তার সঠিক জবাব কার কাছে আছে ? সরকার এবং বিরোধীপক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের জীবন শুধু থমকে দাঁড়ায়নি বরং তা ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করেছে । রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে সম্পদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে কিন্তু সময় চলে গেলে বুক ফাটিয়ে কাঁদলেও শিক্ষার এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না । রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে যে সম্পদ নষ্ট হয়েছে তার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে যদি ১০ বছর লাগে তবে এই সময়ে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আগামী ১০০ বছর লাগবে । না ! শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কোন দিনই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় । প্রত্যহ হরতালের মধ্যেও বাজারে মাছ, ডিম, গোস্ত, তরিতরকারী পাওয়া যাবে কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা কখনো, কোথাও পাওয়া যাবে না ।

 

বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৫২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি এবং ৮৫ দিন সরকার ছুটি থাকে । শিক্ষা বর্ষের বাকী ২২৮ দিন শিক্ষা অর্জনের সুযোগ যদি শিক্ষার্থীরা নির্ভাবনায় পেত তবে এ জাতির অগ্রগতি রোধ করার সাধ্য ছিল কার ? অগ্রগতি তো পরের কথা এখন অবনতি রোধ করাও যে কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন থেকে তত বেশি সময় চুরি হয়ে যাচ্ছে । ২০১৩ সালে রাজনৈতিক কারণে এবং সরকারী ছুটি মিলিয়ে একটি শিক্ষা বর্ষের ২০৮ দিন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়নি । বাকী যে দিনগুলো অবশিষ্ট ছিল তাতে সিলেবাসের এক-তৃতীয়াংশও শেষ করা সম্ভব ছিল না । দৈব ক্রমে হয়ত শিক্ষার্থীরা পূর্বের চেয়েও ভালো রেজাল্ট পেয়ে যায় কিন্তু শিক্ষার মানে যে কতটা অধঃপতন হয় তা কি সঠিকভাবে ভাবা হয় ? ২০১৫ সাল সম্ভবত শিক্ষার্থীদের জন্য সুনামি হয়ে অবতীর্ণ হয়েছে । বছরের প্রথম দিনটাই হরতাল দিয়ে শুরু হয়ে এখন তো লাগাতার রাজনৈতিক কর্মসূচী চলছে । অবরোধের সাথে হরতাল এবং হরতালের সাথে অবরোধ যোগ হয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন প্রায় শিঁকেয় উঠেছে । ক্ষমতাশীনরা বলছে দেশ স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং বিরোধীরা বলছে, আগে গণতান্ত্রিক অধিকার পরে পরীক্ষা-এমন অবস্থায় বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন ভেস্তে যাওয়ার অবস্থায় । দেশের সর্ব-বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি/সমমান) শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু কবে শেষ হবে তা যেমন কর্তৃপক্ষও জানেনা তেমনি শিক্ষার্থীদের তো জানার প্রশ্নই আসে না । দুর্বিষহ মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে । এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে কিন্তু তার নিশ্চয়তা কতটুকু তাও সময় বলবে । পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা থমকে দাঁড়িয়েছে । কবে শুরু হবে তারও যেমন নিশ্চয়তা নেই তেমনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতও অনিশ্চয়তায় আটকে পড়েছে । ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্তি আলিয়া মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শ্রেণীর (কামিল) পরীক্ষার পূর্ব ঘোষিত তারিখ এখন পর‌্যন্ত ৫ বার স্থগিত করা হয়েছে । এভাবে কি শিক্ষাজীবন চলে ? এসএসির ১৫ লাখ, এইচএসসির ১২ লাখ কিংবা পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালেয়ের অর্ধ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে এমন ধ্বংসাত্মক খেলার অধিকার রাষ্ট্রের নাই, থাকতে পারে না । এই মূহুর্তে যদি রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আসে তবুও শিক্ষার্থীদের পূর্ব নির্ধারিত শিক্ষা জীবনের সাথে আরও ৬-৮ মাস বেশি যোগ করতে হবে কেননা ইতোপূর্বে এই পরিমানই ক্ষতি হয়েছে । ধনী কিংবা বিত্তশালীদের কথা বাদ দিলাম কিন্তু গরীব পিতা কিভাবে তার সন্তানের জন্য কয়েক মাসের বাড়তি ব্যয় বহন করবে ? তবে রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমানে যে অবস্থান, তাতে শুধু ৬-৮ মাস নয় বরং আরো কত অধিক সময় যোগ করতে হয় তা কে জানে ? রাষ্ট্রের পূঁজিতুল্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার পরিণতি রাষ্ট্রের জন্য শুভ বার্তা বহন করবে বলে জ্ঞানীগুনীর কেউ বলে না ।

 

শুধু উচ্চশিক্ষারত ৫০ লাখ শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষাগ্রহন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন তারা ৫০ লাখ দিন পিছিয়ে পড়ছে ! হিসাবটা অবাক শোনালেও এটাই ধ্রুব সত্য । আমরা বিপুল পরিমান শিক্ষার্থীদেরকে কেন্দ্র করে এদেশেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি । আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন হতে দিন । রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে শিক্ষার্থীদেরকে জিম্মি করবেন না । শিক্ষার্থীরা মেধা-মননে বাড়তে না পারলে হয়ত আপনাদেরকে খুব বেশি খেসারত দিতে হবে না কিন্তু আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে যারা রাজনীতিতে আসবে তাদের মরন দশা হবে । যে প্রজন্ম দেশের সম্পদ হওয়ার কথা ছিল তারা যদি দেশের বোঝা হয় তবে সে বোঝার ভার বহন করার সামর্থ্য ছোট্ট বাংলাদেশের থাকবে না । তখন এ দেশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে । যদি দাবী করেন, আপনারা এ দেশের কল্যানেই রাজনীতির চর্চা করেন তবে সব ভেদাভেদ ভূলে দেশের উন্নয়ণে সামিল হউন । বছরের প্রথম দিনে যেমন শিক্ষার্থীদের হাতে কোটি কোটি নতুন বই তুলে মনে স্বপ্ন এঁকে দেন তেমনি সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটাতেও সাহায্য করুণ । তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং আপনাদের প্রতি সম্মানে বিনয়াবনত হবে । আর যদি এমন থাকেন (বর্তমানে যেভাবে চলছে) তবে প্রজন্মের ঘৃণা আপনাদের অস্তমিত করে দিবে । মিনতির সুরেই বলছি, শিক্ষার্থীদের সর্বনাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকারে নিমজ্জিত করতে দিয়েন না । জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করুণ ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

facebook.com/raju69mathbaria/