ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

(০৮-০৪-২০১৫ ইং তারিখে দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক ইনকিলাবে আমার এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে । পত্রিকার লিংক লেখার শেষাংশে দেয়া হল)

‘যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে, কেঁদেছিলে তুমি একা, হেসে ছিল সবে….এমন জীবন তুমি করিও গঠন, মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন’-কবির এ উক্তি যাদের জীবনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, তেমনি একজন মহীরুহ ছিলেন এদেশের সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ কিংবদন্তীতুল্য এবিএম মূসা । বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অঙ্গনে যিনি নতুন ধারা সৃষ্টির জন্য আমরণ সংগ্রাম চালিয়েছেন সেই স্পষ্টভাষী, সজ্জন এবিএম মূসা আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন দীর্ঘ এক বছর হতে চলল। সাংবাদিক ও সংবাপত্রের দুর্দিনে পরম শ্রদ্ধাভাজন মূসার শুণ্যস্থান আজও পূরণ হয়নি বরং ক্ষতের শূণ্যতা বেড়েই চলছে । সংবাদপত্রের পাঠক সমাজের একাংশ এবিএম মূসার কলাম পড়ার আশায় আজও বসে থাকে কিংবা টিভিতে তার স্পষ্ট ভাষণ শোনার জন্য আগ্রহের কমতি হয়নি কারো মধ্যে কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম । মূসার লেখা কিংবা কথার ফুলঝুড়ি আর কোনদিন শুনতে পাবেনা এ ধরণীর মানুষ। ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল বুধবার সোয়া একটায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে আপদমস্তক গুনী মানুষটি বিশ্বব্যাপী তার ভক্তকূল এমনকি সমালোচকদেরকেও চোখের জলে ভাসিয়ে চির বিদায় নেন । সাঙ্গ হয় দীর্ঘ ৮৪ বছরের একটি বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প ।

 

যার সমগ্র জীবনজুড়ে ছিল ভোগের চেয়ে ত্যাগের ইতিহাস বেশি । গণমাধ্যমকে নিয়ে আমরণ স্বপ্ন আঁকা মানুষটির অনেক স্বপ্নই হয়ত বাস্তবতায় রূপ পায়নি তবে তার সরব উপস্থিতি এবং অবদানের কথা এদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া কোনদিন ভুলতে পারবে না এমননি শোধ দেয়া যাবে তার ঋণ । আপদমস্তক গুণী এবিএম মূসার সারা জীবন ছিল নানা বৈচিত্র্যে ভরপূর । ১৯৩১ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী ফেনীর জেলার ফুলগাজী থানার ধর্মপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সাংবাদিক এবিএম মূসা জন্মগ্রহন করেন । তার শিক্ষাজীবন কেটেছে চট্টগ্রামের সরকারি মোসলেম হাইস্কুল, নোয়াখালী জিলা স্কুল, ফেনী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ-এ । বিএ প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়েছেন চৌমুহনী কলেজ থেকে । ছাত্রজীবনেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় চৌমুহনী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘কৈফিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে । এ সময়েই তিনি বাম-রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । ছাত্রজীবনে নিয়মিত লিখতেন সাপ্তাহিক সংগ্রাম ও পাকিস্তান অবজারভারে ।

 

এবিএম মূসার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকিতে স্মরণ পড়ে তার বর্ণিল পেশা জীবনের কথা । একজন বস্তুবাদী সাংবাদকর্মী হিসেবে এবিএম মূসার পেশা জীবন ছিল অনেক দীর্ঘ এবং সফলতায় ভরপূর । ১৯৫০ সালে তার পেশা জীবনের সূচনা হয় যা মৃত্যুর আগে অসূস্থ হওয়া পর্যন্ত চলমান ছিল । দীর্ঘ ছয় দশক তথা ৬৩ বছরের পেশা জীবনে তিনি তার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন নামজাদা প্রতিষ্ঠানে । যেখানেই যে কাজ করেছেন সে কাজের সাথে হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়েছিলেন। পেশাজীবনে তার এ অকৃত্রিমতাই তাকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার রেখে যাওয়া অবদানের কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে অনন্তকাল হৃদয়ে গেঁথে রাখবে। ১৯৫০ সালে ‘দৈনিক ইনসাফ’- পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে তার প্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবনের সূচনা হয়েছিল । একই বছরে তিনি ইংরেজী দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভারে’ যোগ দেন । ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান অবজারভারে রিপোর্টার, স্পোর্টস রির্পোটার, বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান অবজারভার বন্ধ করে দিলে তিনি ‘দৈনিক সংবাদে’ যোগ দেন । ১৯৫৪ সালে পূনরায় পাকিস্তান অবজারভার চালু হলে তিনি তার পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে যান । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি, সানডে টাইমস প্রভৃতি পত্রিকায় সংবাদদাতা হিসেবে এবিএম মূসা রণাঙ্গন থেকে সংবাদ প্রেরণ করতেন । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বিটিভির মহাব্যবস্থাপক, মর্নিং নিউজের সম্পাদক হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেন । তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । শুধু বাংলাদেশের গন্ডীর মধ্যেই এ অকুতোভয়ী সাংবাদিকের পেশা জীবন সংকীর্ণ ছিলনা । ১৯৭৮ সালে এ মহান সাংবাদিক থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অবস্থিত জাতিসংঘের পরিবেশ কার্যক্রমের (এসকাপ) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে যোগ দেন । তিন বছর সেখানে সফলতার স্বাক্ষর রেখে ১৯৮০ সালের শেষ দিকে তিনি দেশে ফিরে আসেন । দেশে ফিরে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন । ২০০৪ সালে তিনি কিছুদিন বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক যুগান্তরের’ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । এছাড়াও নির্ভীক সাংবাদিক এবিএম মূসা জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য এবং আজীবন সদস্য ছিলেন । তিনি চারবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও তিনবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ।

 

 

এবিএম মূসা ছন্দের জাদুতে লিখতে এবং যৌক্তিভাবে কথা বলায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন । মৃত্যুর পূর্ববর্তী বছরগুলোতে তিনি টেলিভিশন টক-শোতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সরকার এবং সরকারী দলের কর্মকান্ডের সমালোচনা করায় তাকে অনেক গঞ্জনার শিকার হতে হয়েছে। কালজয়ী এ লেখক, সম্পাদক ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বই রচনা করেন । এবিএম মূসার পছন্দের সাংবাদিকদের মধ্যে অতীতে হ্যারি ইভান্স এবং বর্তমানে গার্ডিয়ানের রবার্ট ফিস্ক ছিলেন শীর্ষে । সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় এবিএম মূসা শতাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক (১৯৯৯), জেফারসন ফেলোশিপ (১৯৭০), কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন ফেলোশিপ (১৯৬১) প্রভৃতি । এবিএম মূসা তার বৈপ্লবিক কর্মকান্ড এবং নির্ভীক সত্যের সৈনিক হিসেবে বাংলাদেশের তরুনদের মনের গভীর স্থান করে নিয়েছিলেন । তার জীবদ্দশায় সম্পাদিত মহৎ কর্মের কারনে তার এ স্থান তার অনুপস্থিতিতেও তার অনুসারীরা সারা জীবন ধারণ করবে ।

 

পেশার জগতে সাংবাদিকতা মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃত । সেই সাংবাদিকরা বিভিন্ন দলের অন্ধ সমর্থন করুক সেটা এবিএম মূসা কখানো চাইতেন না । কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতিত্ব করতে গিয়ে সাংবাদিকরা সত্যের প্রকাশ থেকে বিচ্যুত হবে এটা তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেন নি । বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাব দু’টি ভাগে বিভক্ত । তার একটি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন অন্যটি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন । এ দুটি দলের একটি আওয়ামীলীগ এবং অন্যটি বিএনপি সমর্থিত সাংবাদিক সংগঠন । আজ থেকে ৮৯১ দিনে আগে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার পর প্রবীন সাংবাদিক এবিএম মূসা বারবার সাংবাদিকদেরকে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি মনে প্রাণে কামনা করতেন একটি অভিন্ন সাংবাদিক সংস্থা । যেখানে কোন দলীয় ব্যানার থাকবে না । একজন সাংবাদিকের বিপদে সকল সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়বে । সত্যকে প্রকাশ করাই হবে সাংবাদিকদের প্রধান এবং একমাত্র ব্রত । কতিপয় সাংবাদিকদের হীনমন্নতা এবং স্বার্থলোভীতারকারণে এবিএম মূসার এ উদ্যোগ সফলতার মূখ দেখে নি । বিভিন্ন টকশোতে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করা এবিএম মূসার জীবনের একটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল তিনি একটি ব্যতিক্রমী স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল চালু করবেন । নবম জাতীয় সংসদের বর্তমান সরকারের কাছে এ দাবী উত্থাপন করেও তিনি সরকারের মর্জি লাভ করতে সামর্থ হননি ।

 

এবিএম মূসা তার জীবদ্দশায় সাংবাদিকতা পেশাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন । তিনি যেমন এ পেশাকে অনেক কিছু দিয়েছেন তেমনি এ পেশাও তাকে অনেক উঁচু স্থানে আসীন করেছে । তার জীবনের অন্তিম ইচ্ছা দুটির দ্বীতয়টি পূরণ করার সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যদি আন্তরিক হয় এবং প্রকৃতপক্ষেই হৃদয় দিয়ে তাকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে তবে প্রথম স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব । যদি এটা করা যায় তাহলে এবিএম মূসার বিদেহী আত্মা যেমনি শান্তি পাবে তেমনি দেশব্যাপী সাংবাদিক নির্যাতনও বন্ধ হবে । জাতিও প্রকৃত সত্যকে জানতে পারবে । দেশ থেকে অন্যায় অপরাধ চিরতরে বিদায় হবে । এবিএম মূসার জীবদ্দশায় আমরা তার প্রাপ্য সম্মান যথাযথ ভাবে শোধ করতে পারি নি তবে সাংবাদিকদের নমনীয়তা ও সহিষ্ণুতায় যদি তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় তবে তার ঋণ কিছুটা শোধ হবে বলে বিশ্বাস। সাংবাদিকদের স্বতন্ত্র স্বার্থ রক্ষার্থেই মূসার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করা সময়ের বড় দাবী । তার লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূসা ভাইয়ের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকিতে আমাদের পক্ষ থেকে তার আত্মার প্রতি এটাই হোক আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিদান ।

 

 

(পত্রিকার লিংক-

http://www.dailyinqilab.com/details/3438/

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট।

raju69mathbaria@gmail.com