ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ বাস্তব জগতের চেয়ে ঢের বেশি সময় ব্যয় করে ভার্চুয়াল জগতে । ভার্চুয়াল জগতের নির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করা সহজসাধ্য না হলেও সব বয়সের মানুষ এ জগৎ সম্পর্কে কম-বেশি ধারনা রাখে । অক্সফোর্ড ডিকশানারীতে ভার্চুয়াল শব্দের অর্থে লেখা হয়েছে, ‘কার‌্যতঃ কিন্তু বাহ্যতঃ নয়’। ভার্চুয়াল শব্দের শাব্দিক অর্থ ও সংজ্ঞা যতই বিদঘুটে হোক, মানুষের জীবনকে দুটো পৃথক রাজ্যে ভাগ করে ফেলেছে এ শব্দটি । ভার্চুয়াল জগতে সময় অতিবাহিত করতে যতগুলো মাধ্যম ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ও জনপ্রিয় ফেসবুক । শুধু বাংলাদেশে নয় কিংবা গোটা বিশ্বের তরুণ-তরুণ, যুবক-যুবতীই শুধু নয় বরং সব বয়সের মানুষ যে ওয়েবসাইটটি সর্বাধিক ব্রাউজ করে সেটাও ফেসবুক । সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে । যে কোন পরিবর্তনেই যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে তেমনি নেতিবাচক দিকও কম নয় । যেখানে সম্ভাবনা বেশি সেখানে অবশ্বম্ভাবীভাবেই অনিশ্চয়তাও বেশি । সম্ভাবনাকে যদি জনকল্যানে ব্যবহার করা না যায় তখন সেটা হুমকি স্বরূপ আবিভূর্ত হয় । ফেসবুকের অবস্থাও ঠিক তেমন । যারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফেসবুক ব্যবহার করতে পেরেছে তারা উপকৃত কিন্তু যারা এটাকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করেছে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । অবশ্য যারা চরমভাবে ফেসবুকাসক্ত তারা লাভ-ক্ষতির হিস্যা কষার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটানোকেই বেশি প্রধান্য দেয় ।

পৃথিবীর জানা-অজানা মানুষকে সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে আত্মীয় করেছে ফেসবুক । দূরকে টেনেছে কাছে আর পরকে করেছে আপন । গোটা বিশ্বকে এনেছে হাতের মুঠোয় । দূর দেশের ছেলে-মেয়ের মধ্যে ফেসবুক সূত্রে পরিচয় হয়ে তা পরিণয়ে রূপ লাভ করছে । আবার ফেসবুকের জন্যেই ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেকের সাজানো সংসার । ফেসবুকাসক্ত একদল তরুন-তরুনী তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অহেতুক-অনর্থ হেলায় ফেলায় কাটিয়ে দিচ্ছে । ফেসবুক জ্বরে শুধু তরুন-তরুনীরা নয় বরং সব বয়সের ব্যবহারকারীরাই কম বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়েছে বললেও বোধহয় অতিরঞ্জিত করে বলা হবে না । দিনের অন্যান্য কাজগুলো রুটিন অনুযায়ী না হলেও ফেসবুক ব্যবহার ঠিকই নিয়ম মাফিক হচ্ছে । ফেসবুকের পেইজে নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করা হলেও ঠিক সময়ে বের হওয়া অনেকের জন্যই অসাধ্য । বিভিন্ন কারনে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় ফেসবুকের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি । ফেসবুকের মাধ্যমে ছবি শেয়ার, খবর শেয়ার, বার্তা পাঠানো, দল ভিক্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি, বিজ্ঞাপণ কিংবা চ্যাটসহ বিভিন্ন কাজ অতি সহজে করা যায় । ২০০৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী মার্ক জুকারবার্গের নেতৃত্বে একদল প্রযুক্তিমনস্ক প্রতিভাধারী তরুন-ছাত্রের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত ফেসবুক তার যাত্রার প্রারম্ভকাল হতেই বিশ্বের বুকে সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক আন্তসংযোগ যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ওয়েবসাইটে পরিনত হয়েছে । ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও ফেসবুকের কল্যানে বন্ধুদের সাথে মনের সবকিছু শেয়ার করছে । ফেসবুক আসক্ত অনেক পিতামাতা তাদের অনাগত সন্তানের কাল্পনিক নামে ফেসবুকে সদস্যপদ নিয়ে রাখেন যাতে তাদের সন্তানকে পৃথিবীর আলোয় এসে ফেসবুকের সদস্য হতে অতিরিক্ত সময় দিতে না হয় ! ফেসবুকের প্রতি মানুষের এক ধরনের ম্যানিয়া সৃষ্টি হয়েছে । যে ম্যানিয়া যেমন উপকার করছে তেমনি অপকারও কম করছে না । যদিও ফেসবুকের নিয়ম অনুসারে ন্যূণতম ১৩ বছরের কম বয়সী কোন শিশু ফেসবুকের সদস্য হতে পারবে না তবুও এ নীতি কেবল নিয়মেই সীমাবদ্ধ রয়েছে । বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৪০০ মিলিয়ণ কার‌্যকরী ফেসবুক ব্যবহারকারী এই ওয়েবসাইটি ব্যবহার করছে । অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রচার এবং বিজ্ঞাপনের জন্য ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে । নিমিষেই এখানে আনন্দ উপরকরণের সবকিছু পাওয়া যায় । তাই অন্যান্য সকল সামাজিক মাধ্যমের তুলনায় ফেসবুকের অগ্রযাত্রার গতি দুর্বার । ফেসবুককে পত্রিকার চেয়েও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে ধারণার প্রথা চালু হয়েছে । সমগ্র বিশ্বের আনাচে-কানাচের সকল খবর ফেসবুকের কল্যানে মূহুর্তের মধ্যে দিগ-দিগন্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে । রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বীয় কিংবা দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করছে । বিশেষ কোন বাধ্যবাধকতা না থাকায় ফেসবুক অবর্ণনীয় সুনাম কুড়িয়েছে । তবে ভালো মানুষেরা তাদের সৎ উদ্দেশ্যকে যেভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে তেমনি অসৎ কিছু মানুষ তাদের খারাপ উদ্দেশ্যকেও ফেসবুকের মাধ্যমে প্রসার ঘটাচ্ছে । ফেসবুক ব্যবহার করেই অপরাধীরা এমন কিছু অপরাধ করছে যার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা হুমকীর সম্মূখীন । আমাদের দেশে ফেসবুক বাধাহীনভাবে ব্যবহার করা গেলেও বিশ্বের কিছু দেশে ফেসবুক বাধার সম্মূখীন হয়েছে । সিরিয়া, চায়না এবং ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশে এটা আংশিকভাবে কার‌্যকর আছে । এ সকল দেশের কর্তৃপক্ষ ফেসবুক ব্যবহারে সময় অপচয় হয় আখ্যা দিয়ে কর্মচারীদেরকে এটা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে ফেসবুককে প্রায় নিষিদ্ধ করেছে ।

শত-সহস্র কল্যানের মধ্যেও ফেসুবক এমন কিছু নিরব ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে যার খেসারত দিয়ে শেষ করা যাবে না । প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বে গতির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ ক্রমশ যান্ত্রিকতায় রুপ নিচ্ছে । এ কারনে পরিবার, সমাজের সাথে সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটছে । অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার বাইরে যেটুকু পালন করলেই নয় মানুষ শুধু সেটুকুই দায়সারাভাবে পালন করে যাচ্ছে । যে কারনে পারিবারিক দৃঢ় বন্ধনে ছেদ পড়তে শুরু হয়েছে, সামাজিক সম্প্রীতি প্রায় বিলীনমূখী । স্বামী-স্ত্রীর, পিতামাতা-সন্তানের, ভাই-বোনের মধ্যকার সম্পর্কে দূরত্ব বেড়েই চলছে । শত ব্যস্ততার মধ্যেও যেটুকু অবসর সময় পাওয়া যায়, যে সময়টুকু অতীতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আড্ডা ও গল্পে কেটে যেত কিন্তু এখন আর পূর্বের মত সময় কাটানো হচ্ছে না । অবসর সময় কাটানোর ধরণেও এসেছে পরিবর্তন । স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি বসে কিংবা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপাড়ায় দূরত্বের পাহাড় সৃষ্টি করেছে ফেসবুক । স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ফেসবুকে তাদের বন্ধুদের সাথে আলাপে ব্যস্ত । পরের খবর রাখতে গিয়ে আপন ঘরের খবর যেন বহুদূরে । সন্তানের সাথে পিতামাতার পূর্বের মত যোগাযোগ কিংবা সামান্যতম আন্তরিকতাও অবশিষ্ট নেই । ভাই-বোনের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির সময় হচ্ছে না । সবাই সবার মত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । ফেসবুকে বন্ধুর স্ত্রী-সন্তানের যতটুকু খবর রাখা হচ্ছে তার সামান্য অংশও রাখা হচ্ছেনা নিজ-স্ত্রী, সন্তান কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের । পরকে আপন করতে গিয়ে আপনের কাছে যে চিরতেরে পর হয়ে যাচ্ছে তার খবর কেউ রাখছে না । ভাব দেখে মনে হয়, আপনের খবর রাখা যেন দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না । অন্যের চাল-চুলো অর্থ্যাৎ গোটা বিশ্বের খবর নখদর্পণে অথচ আপন নীড়ের খবর জানা নাই । পরিবারের সদস্যরা কোন পথে চলছে, তাদের কোথায় সমস্যা সে বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নাই । সবাই সবার থেকে যেন মুক্ত ।

 

ফেসবুকের উপকারের কথা বর্ণনায় শেষ হবে হয়ত কিন্তু ক্ষতির প্রভাব শেষ হবার নয় । ফেসবুক আমাদের চিরাচরিত জীবনকাঠামোতেও প্রভাব ফেলেছে । সুদূঢ় অতীতকাল থেকে এদেশের মানুষ সন্ধ্যা রাতে নিদ্রায় যেত যাতে খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে কাজে যেতে পারে । চিরাচরিত এ নিয়মে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে ফেসবুক । এখন রাতের শেষ প্রহরে নিদ্রায় যায় এবং দ্বিপ্রহরে জাগে । সাধারণ মানুষের ওপর ঘুমরীতির পরিবর্তনে যে প্রভাব পড়ুক কিন্তু তরুণ, যুব ও ছাত্র সমাজে পরিবতির্ত প্রভাবে যে ভয়াবহ ক্ষতির হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । তরুণ, যুব ও শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের প্রাণ । তারা ক্ষতিগ্রস্থ হলে রাষ্ট্র সঠিক পথে হাঁটবে কিভাবে ? অফিস আওয়ারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ফেসুবক ব্যবহার অভ্যাসের রীতিতে পরিণত হয়েছে । সীমিত অফিস টাইমের একটি নির্বারিত সময় যদি ফেসবুকে ব্যয় হয় তবে রাষ্ট্রের কাঙ্খিত উন্নয়ন তো বাধাগ্রস্থ হবেই । ধর্মকে কটাক্ষ করার মাধ্যম হিসেবেও ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে । বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে হত্যার হুমকির মাধ্যম হিসেবেও ফেসবুকের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে । সব কিছুর পরেও মনে রাখতে হবে, আমাদের সার্বিক জীবনের সাথে ফেসবুক আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে । কোনভাবেই ফেসবুকহীন কাটানোর কল্পনাও করা যায়না । সুতরাং ফেসবুকের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো দূর করে কিভাবে এটাকে কল্যানমূখী করা যায় তার প্রচেষ্টা থাকতে হবে । পরকে আপন করার মত গৌরবের কিছু নাই কিন্তু পরকে আপন করতে গিয়ে যেন চিরতরে আপন পর হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে । ব্যক্তি ও জাতীয় উন্নতির জন্য ফেসবুকাসক্তি থেকে দূরে থাকতেই হবে । মনে রাখতে হবে, ফেসবুক আমাদের জীবনের একটি সহযোগী সংঘঠন মাত্র । সম্ভাবনার ভবিষ্যতে যেন ফেসবুকের ক্ষতিকারক তীব্রতা কোনভাবেই হানা দিতে না পারে । অধিক স্মার্ট হতে গিয়ে যেন চিরতরে আনস্মার্ট হয়ে না যাই ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

www.facebook.com/raju69mathbaria/