ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

ঈশ্বর প্রবতির্ত পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে গৌতমবুদ্ধ (খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০অব্দ) নিজেকে নিরীশ্বরবাদী ঘোষণা দিয়ে স্বতন্ত্র ধর্ম ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন । মানুষকে জরা, মরা ও ব্যাধির অধীনে দেখে তিনি পৃথিবীর সর্বত্র দুঃখময় (সর্বং দুঃখম) বলে মনে করেছেন । বোধিবৃক্ষ তলে দীর্ঘ ধ্যানের পর তিনি বৌদ্ধত্ব (সম্যক জ্ঞান) লাভ করেন এবং তার আদি নাম সিদ্ধার্থের পরিবর্তে গৌতমবুদ্ধ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন । জগতের সকল দুঃখ থেকে নিবৃত্তির জন্য তিনি চারটি আরর‌্য্য সত্য আবিষ্কার করেন এবং সর্বশেষ আরর‌্য্য সত্যে তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গ ব্যাখ্যা করেন । এ অষ্টাঙ্গিক মার্গের সাহায্যে তিনি তার অনুসারী কিংবা সাধারণ মানুষকে দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ প্রদর্শন করেন । তিনি মূলত অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা । জীব হত্যাকে তিনি গুরুতর পাপ মনে করতেন এবং তার অনুসারীদেরকে জীব হত্যা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর আদেশ দিয়েছেন । পরবর্তীতে গৌতম বৌদ্ধের অনুসারীরা হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং হীনযানীরা ব্রক্ষ্মদেশ, শ্যামদেশ ও সিংহলে এবং মহাযানীরা তিব্বত, চিন ও জাপানে ছড়িয়ে পড়ে । হীনযানীরা বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহনে চরম গোঁড়াপন্থী এবং মহাযানীরা কিছুটা উদারপন্থীর পরিচয় দেয় । বিশ্বব্যাপী গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বৌদ্ধরা সাধারণত শান্তিকামী বলেই প্রচারিত ছিল । যারা চরম পাপ বলে জীব হত্যা নিষিদ্ধ মনে করত তাদের উত্তরসূরীরা এখন মানুষের হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছে । বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মায়নমারের আরাকান প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে হত্যা ও বিভিন্নভাবে নিরর‌্য্যাতন করা তাদের নিত্যাকার রুটিনে পরিণত হয়েছে ।

 

রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন আন্দোলনের কলকাঠি নাড়ছে বৌদ্ধদের চরমপন্থী সংগঠন ‘969 movement of Buddism’ । এই সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে উইরাথু নামের বৌদ্ধভিক্ষু; যিনি মুসলিমবিরোধী প্রচারণার কারণে ২০০৩ সাল থেকে ৭ বছর জেলে ছিলেন । স্বঘোষিত মায়ানমারের ‘ওসামা বিন লাদেন’ উইরাথু জেল থেকে মুক্তির পেয়ে ঘোষণা করেন, ‘ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক শুধু বৌদ্ধদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে’ । অন্যসকল ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূলে উইরাথু ও তার মতাদর্শীরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ-ধর্ষন চালিয়ে যাচ্ছে । বিগত কয়েক দশক থেকেই রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে হত্যা, নিরর‌্য্যাতন, ধর্ষণ চলছিল । বর্তমানে অভিবাসী সমস্যা সংকট প্রবল আকার ধারণ করার পর বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মায়ানমারের কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হওয়ায় উহরাথুর নেতৃত্বাধীন সমর্থকগোষ্ঠী সরকারী বাহিনীর সহায়তায় রোহিঙ্গা মুসলামনদের হত্যার উৎসব পালন করছে । বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত যেসকল বিভৎস চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে তা যেমন সহ্য করা নয় তেমনি তা দেখে কোন মানব সন্তান চুপ থাকতে পারে না অথচ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মায়ানমারের অং সান সুচীসহ বিশ্বের সকল আন্তর্জাতিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে । মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ রক্ষায় সৃষ্ট ওআইসি এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ কোন প্রতিবাদ করছে না । কেবল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালন করছে । তুরস্ক ব্যতীত অন্যসকল মুসলিম দেশ ও মুসলিম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বের প্রতিবাদহীনতা তাদের মুখে থু থু দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছে । মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষনের সংগঠন ‘0IC’ রোহিঙ্গা মুসলমানদের চরম দূরাবস্থায় ‘Oh ! I see’ এর ‍ভূমিকা পালন করছে । মায়ানমারের মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুদেরকে যেভাবে বিভিৎস কায়দায় হত্যা ও নিরর‌্য্যাতন করা হচ্ছ সেভাবে হিংস্র কোন পশুও তার শিকারকৃত বস্তুর সাথে এমন বর্বর আচরণ করে না । অথচ মানবাধিকারের এমন লঙ্ঘনের পরেও নির্বাক পৃথিবী । মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা মুখে কুলুপ এঁটেছে । অত্যাচারিদের নির্লজ্জ উল্লাসে অত্যাচারিতদের হাহাকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করলেও তার বেদনা কারো কর্ণকুহরে প্রবেশ করে নিছক প্রতিবাদ জ্ঞাপনের মানসিকতা সৃষ্টি করছে না । দিনে দিনে আমাদের বিবেকবোধ যেন শুঁকিয়ে যাচ্ছে । জাতিসংঘের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে নিরর‌্য্যাতিত মানবগোষ্ঠী মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা । তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, তাদের দায়িত্ব শুধু ঘোষণা পর‌্যন্তই । রোহিঙ্গাদের প্রতি অমানুষিক-অমানবিক নিরর‌্য্যাতন বন্ধে এবং তাদের মানবাধিকার ফিরিয়ে দিতে সামান্যতম পদক্ষেপও নাই । বিশ্বের কর্তাশ্রেণীর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গা নির্মূল করা গেলেই এ ধরা থেকে আপদ বিদায় হবে । রোহিঙ্গারা মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ । যদি তাই না হত, তবে পশু-পাখির অস্বাভাবিক মৃত্যুতে বিশ্ব নেত্রীবৃন্দ যেভাবে হা-হুতাশ প্রকাশ করে তার সিঁকি অংশও কেন রোহিঙ্গাদের ওপর এমন বর্বরোচিত আচরণের পরেও প্রকাশ পাচ্ছে না ? আফসোসের সাথে বলতে হচ্ছে, রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই জন্ম ওদের আজন্ম পাপ ।

 

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করার পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় । সে সময় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং এ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কয়েকজন সরকারী পদস্থ দায়িত্বও পালন করেন । ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যূত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মায়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে । রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দূর্ভোগের নতুন অধ্যায় । সামরিক জান্তা তাদের বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় । ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার শুরু হয় । নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয় এবং হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা । রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদেরকে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয় । তাদেরকে শিক্ষা-স্বাস্থ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় । বিয়ে করার অনুমতি নেই, সন্তান হলে নিবন্ধন নেই । জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না এবং রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সেজন্য আরোপিত হতে থাকে একের পর এক বিধিনিষেধ । সর্বশেষ ১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে । মায়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘কালা’ নামে পরিচিত । বাঙালী ও ভারতীয়দেরকেও তারা একই পরিচয় দেয় এবং এ পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম ঘৃণায় ভরা । অথচ এ রোহিঙ্গাদের সুদিন সোনালী বার্মার ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর‌্যন্ত প্রায় ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল । মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয় । শোষণের স্টীম রোলার চলতে থাকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর । বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম প্রবর্তকের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমননীতির অনুসরণ করে । জাতিসংঘের শরনার্থীবিষয়ক সংস্থা ‘UNHCR’ প্রকাশিত তথ্যমতে, গত তিন বছরে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছে । যাদের ২০ হাজার দেশান্তরী হয়েছে ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে মার্চের মধ্যে ।

 

আপনদেশে যারা পরবাসী সেই রোহিঙ্গাদের স্বার্থ সংরক্ষনের দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি । বাধ্যহয়ে দেশান্তরী হওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া । বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে পুশব্যাপক করা হয়েছে । সম্প্রতি এক সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তার দেশের সমুদ্র উপকূলে ভাসমান প্রায় আট হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থীর কোন একজনকেও তিনি তার দেশে আশ্রয় দেবেন কিনা ? তার জবাবে তিন একবার না বলে ক্ষান্ত হয়নি বরং নৈতিবাচক উত্তরের প্রতি জোর প্রদানের জন্য তিনি ‘না, না, না, একজনকেও নয়’ বলে জানিয়েছে । তবে সর্বশেষ সুখবর হলো, কুয়ালালামপুরের বৈঠকে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুরাপঙ, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাতালগোয়া, ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফা আমিন ঐক্যমত পোষণ করে বলেছেন যে, তারা সাময়িকভাবে হলেও সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে আশ্রয় দেবে । তবে এটা স্থায়ী সমাধান নয় । জীবন বাঁচাতে যে রোহিঙ্গারা মরণসঙ্কুল জেনেও খাদ্যহীন অবস্থায় দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে তার মূলে সামাধান করতে হবে । অবিলম্বে মায়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপ প্রদান করে রোহিঙ্গা হত্যা ও নিরর‌্য্যাচন বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করাতে হবে । মায়ানমারের সকল রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে । বিভিন্ন গণমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত নিরর‌্য্যাতন ও হত্যার যে দৃশ্য প্রকাশ হয়েছে তা কোন মানুষের পক্ষে সহ্য করার নয় । সুতরাং এ অপরাধে যারা জড়িত তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করতে হবে । মায়ানমারের অগণতান্ত্রিক সরকার সে দেশে উগ্রজাতীয়তাবাদের যে লেলিহান শিখা জ্বালিয়েছে তা অবিলম্বে বন্ধ না করলে বিশ্বব্যাপী আবারও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধলে তার সকল দায়ভার মায়ানমারের কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ব মোড়লদের ওপর বর্তাবে । বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর রক্ত যতই শীতল মনে হোক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের তেজ যদি একবার জেগে ওঠে তবে দাবানলের স্ফূলিঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং এর দহন থেকে কেউ রক্ষা পাবে না । সুতরাং অবিলম্বে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থ করা হোক । সারা বিশ্বের মুসলিমদের এমন দুরবস্থা আর ক্ষমতার মোহে ঘুমন্ত অবস্থা খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না বলেই ইতিহাস স্বাক্ষী দিচ্ছে । তুরস্কের জাগরণ তার প্রাথমিক ইঙ্গিত মাত্র । সুতরাং মুসলিম বিরোধী শক্তির অট্টহাসি খুব বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয়না । জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে মায়ানামারের চলমান সংকট নিরসনের জন্য আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার অনুরোধ রাখছি । ঘুমন্ত দাবানল জ্বালানোর মতো বোকামী করা উচিত হবেনা । ২০১২ সালের জুনে রোহিঙ্গা মুসলমানের ওপর রাখাইন বৌদ্ধদের নির্মম হামলার ঘটনায় বিশ্ববাসী যেভাবে নিন্দা জানিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিলো তেমন ব্যবস্থা পূনরায় গ্রহন করা হোক । গোটা বিশ্ববাসীর কাছেই মিয়ানমারকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করানো এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণ সময়ের দাবী ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69alive@gmail.com