ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রত্যেকের জীবন তার নিজস্ব পরিমন্ডলে অসীম গুরুত্বপূর্ণ হোক সে আস্তিক-নাস্তিক কিংবা ভালো-মন্দ । অনেকটা পূর্ব ঘোষণা দিয়েই একের পর এক খুন করা হচ্ছে ব্লগারদের । যার সর্বশেষ শিকার আমার এলাকার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল নামে লিখতেন) । রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের সকল মানুষের কাছে নিহত ব্লগারদের কতটা মূল্যায়ণ ছিল তার বিবেচনা ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু নিলয়ের একটা পরিবার ছিল । নিলয় তার বাবা-মায়ের কাছে সে ছিল সাত রাজার ধন এক মানিক্ষ তুল্য । ভাই-বোন কিংবা রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের কাছে সে ছিল নয়নের মনি । স্ত্রীর কাছে ছিল ভরসার একমাত্র স্তম্ভ ও আশ্রয় । অথচ কতিপয় পাষন্ড তার প্রাপ্য মৌলিক অধিকার তার থেকে কেড়ে নিল । তাকে বাঁচতে দেয়া হল না । মাত্র চল্লিশ বছর পার না হওয়ার পূর্বেই সে এখন অতীত হওয়া একটি নাম । সামগ্রীক বিবেচনায় মানুষের তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় তথা বাসস্থানে দিনে-দুপুরে তাকে উপর্যপুরি চাপাতির আঘাতে হত্যা করা হল । একটি মানুষকে হত্যার পর হত্যাকারীরা কোন রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়াই খুনীরা বীরের মত পগাড়পার হয়ে গেল । আজ কোথায় মানুষের নিরাপত্তা ? রাষ্ট্র কি তবে আমাদের নিরাপত্তা দিতে পুরোই ব্যর্থ ?

…..

একের পর এক খুনের জন্য অবশ্যই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দায়ী । আরও দায়ী রক্ষকদের উদাসীনতা । রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও কোন অংশে কম দায়ী নয় । প্রতিটি হত্যার পর এদেশের সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে আকুল আবেদন করেছে যাতে অপরাধী চিহ্নিত হয় এবং শাস্তি পায় । ক্ষমতাশীনদের খুব কম অংশই সাধারণ মানুষের সে দাবী কানে তুলেছে । তারা মুখে যা বলেছে তার সাথে কাজের মিল অতীতে খুব কমই দেখা গেছে । আসল খুনীদের চিহ্নিত করার বিপরীতে পরিলক্ষিত হয়েছে বিএনপি-জামাতকে দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মাঠ গরম রাখার এবং দো্ষারোপের রাজনীতির প্রবনতা । অথচ চলতি বছর দেশে এখন পর্যন্ত যে চারজন ব্লগার খুন হয়েছে তার তিনজনের হত্যাকারীদের নামে কোন জামাত-বিএনপির সদস্যদের নাম উঠে এসেছে বলে জানা যায়নি । ব্লগার নিলয় নীল হত্যায় কারা জড়িত তা হয়ত জানা যাবে কিংবা অতীতের ঘটনাগুলোর মত আসল অপরাধীরা হয়ত আড়ালেই থেকে যাবে কিন্তু এদেশের কতিপয় মন্ত্রী যখন তাদের পক্ষে জনমত গঠন কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ঢালাওভাবে সকল অপরাধের জন্য শুরুতেই বিএনপি-জামাতকে সকল দোষ দিয়ে রাখেন তখন সাধারণ মানুষ হিসেবে আঁৎকে উঠি । মনে বদ্ধমূল বিশ্বাস জন্মে, অপরাধীরা বোধহয় শাস্তি পাওয়ার বদলে আবারও পার পেয়ে গেল !

….

কেউ অথবা কতিপয় যখন কোন অপরাধ করে তখন সেটায় আর রাজনৈতিক তকমা লাগানোর কোন প্রয়োজনীতা আছে কি ? অপরাধীকে কি আমরা শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না ? সরকার দলীয় কোন ক্ষমতাধর ব্যক্তি যখন অন্যতম বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তাদের জোট জামাআতকে কোন ঘটনায় অভিযুক্ত করে তখন একদিকে যেমন এদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে এটা ক্ষমতাশীনদের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত রাখার কৌশল তেমনি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের এমন ব্যক্তব্যে ন্যায় বিচার যথেষ্ট বাধাগ্রস্থ হয় । হতে পারে বিএনপি-জামাতের কতিপয় লোক কোন কোন ব্যাপারে অপরাধের সাথে জড়িত কিন্তু বিগত কয়েক বছর বিএনপি-জামাতের চেয়ে অপরাধ কর্মে ক্ষমতশীনদের কম সদস্য কি জড়িত ছিল ? ঢালাওভাবে বিএনপি-জামাতকে জড়িয়ে ন্যায় বিচার বাধাগ্রস্থ করার মত কোন কাজ যেন না করা হয় সেটা নিশ্চিত করা দরকার । আমরা অপরাধীর শাস্তি চাই; সেটা কোন দলের কিংবা ব্যানারের সেটা মূল্যায়ণ যদি করতেই হয় তবে সেটা যেন অপরাধী পাকড়াও হওয়ার পর করা হয় । অপরাধী চিহ্নিত হওয়ার আগেই যদি সকল দোষ নন্দঘোষ টাইপের দাবী করে তা বিএনপি-জামাতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় তাতে বিএনপি-জামাত কিংবা আওয়ামীলীগের কতটা লাভ-ক্ষতি হচ্ছে সেটার চেয়েও বড় কথা-প্রকৃত অপরাধী হয়ত থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে । কেননা ব্লগার রাজীব হায়দারের খুনীরা একটি উগ্রপন্থির জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিল বলে আমরা জেনেছি । অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদের এখনো ট্রেস করা না গেলেও যাদেররেক সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে তারাও উগ্রপন্থি । ওয়াসিকুর রহমান বাবু হত্যা নিয়েও রয়েছে রহস্যের জটলা ।

 

হত্যাকারীরা হত্যার পূর্বে হিট লিস্ট দিয়ে একের পর এক ব্লগার হত্যা করে যাচ্ছে এটা চাট্টিখানি ব্যাপার নয় । স্বাধীন রাষ্ট্রে এমন ঘটনা কোন মাপকাঠিতে বিবেচনা করা হবে তা নীতি-নির্ধারকদেরকে নির্ধারন করতে হবে । দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে এসে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্লগারদের হত্যাকারীদেরকে চিহ্নিত করে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে । হত্যাকারীরা যতদিন নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত না হয় ততদিন রাজনৈতিক স্বার্থপ্রণোদিত হয়ে বক্তব্য না দিয়ে অন্তত সঠিক তদন্ত ও বিচারের সহায়তা করা প্রত্যেকটি সুনাগরিকের জন্য অবশ্য কর্তব্য । আমরা একদিকে যেমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই তেমনি রাজনৈতিক ঐক্য কামনা করি । রাজনৈতিক দলগুলো যতদিন সকল স্বার্থের ওপর পূর্ণ দেশপ্রেমিকতার মানসিকতা দেখাতে না পারবে ততদিন সাধারণ মানুষ জীবনসহ সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পাবে; এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায়না । নিলয় নীলের খুনীদের শনাক্তের মাধ্যমেই আমাদের মিশন শুরু হোক । ধর্মের অপব্যাখ্যা কিংবা ধর্ম বিদ্বেষের জন্য মিথ্যা সমালোচনা যেমন বন্ধ হওয়া আবশ্যক তেমনি খুনীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সকল ব্লগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবী । প্রত্যেক ব্লগার হত্যার পর বিশ্ববাসী আমাদের দেশের ওপর টিটকারীপূর্ণ চাহনি রাখে । সাধারণের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান হোক রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রথম দায়িত্ব ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69alive@gmail.com