ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সাধারণভাবে সফল বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি পরিবর্তন । এ বিপ্লব যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে হয় তখন সরকার ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন হয় । ‘প্রচলিত সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন দিগদর্শনের সৃষ্টিই হল বিপ্লব’ । [‘The infringement of prevailing constitutional arrangements and use of force’ -James c. Davies ‘Toward a theory of Revolution’, American sociology review 27-5-19] । বিল্পবের ফলে অর্থনীতিতে সূচিত হয় মৌলিক পরিবর্তন, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আসে নতুন সূত্র এবং সামাজিক সংগঠনে সূচিত হয় অভাবনীয় পরিবর্তন । বিপ্লব(Revolution) শব্দটির প্রথম প্রয়োগ ঘটে ইংল্যান্ডে ১৬০০ সালে, ক্রমওয়েলের আমলে । ফরাসী বিপ্লব ও রুশ বিপ্লবের কাহিনী, লক্ষ্য ও গতিপ্রকৃতি বিশ্বময় সুবিদিত । আধুনিক কালে অবশ্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় জননেতাদের দ্বারা স্বৈরতান্ত্রিক, দুর্নীতিপরায়ণ, পরনির্ভরশীল শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ঘুনে ধরা, সেকেলে, অগ্রহনযোগ্য, ক্ষমতানির্ভর, ব্যক্তিসর্বস্ব, গণবিচ্ছিন্ন পীড়নমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে, সমাজব্যাপী এক নতুন জীবনবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে । ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবকেও এই প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা করা চলে । ইতিহাসে ৭ নভেম্বর যা ঘটেছিল তা প্রতিদিন ঘটে না । ৭ নভেম্বরের মত ঘটনা ঘটতে কখনো শতাব্দীকাল আবার কখনো হাজার বছরও লেগে যায় । আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে ১৫৮ বছর পূর্বে ১৮৫৭ সালে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ এর মাধ্যমে এমন বিপ্লব একবার এসেছিল । সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী উপমহাদেশের সর্বাত্মক যুদ্ধ । সিপাহী বিদ্রোহের সাথে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের বেশ কিছুটা পার্থ্যকও রয়েছে । যদিও দু’টোর কেন্দ্রেই স্বাধীনতা শব্দটি, তবুও আগেরটি ছিল স্বাধীনতা উদ্ধারের যুদ্ধ আর পরেরটি স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম । আবার এ দু’টো ঘটনার মধ্যে অনেকটা মিলও রয়েছে । দু’টিই আগ্রাসন যা আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল । সিপাহী বিদ্রাহের প্রতীক ছিলেন বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট কবি বাহাদুর শাহ জাফর । অপরদিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রাণ ছিলেন স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বীর মু্ক্তিযোদ্ধা, তারুণ্যে উদ্বেল মেজর জিয়াউর রহমান । দু’ক্ষেত্রেই সংগঠক ও চালক সাধারণ সৈনিক-জনতা । মূলত আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে, দিল্লীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালীর হাজার বছরের যে ধারাবাহিক সংগ্রাম, ৭ নভেম্বর তার সবচেয়ে উজ্জ্বল শিখরটি । বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডত্ব, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই আমাদের নিরন্তর ৭ নভেম্বরের চর্চা করতে হবে । কারণ ৭ নভেম্বরের পথই হল বাংলাদেশের পথ, বাংলাদেশের টিকে থাকার পথ । অন্য পথ ও অন্য মতে চলার অর্থ হল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মহাভারতে বিলীন হয়ে যাওয়া । অতীতে মানুষের ধারণা ছিল সিপাহী বিদ্রোহের কারণে জনতা এবং সিপাইরা পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয় । কিন্তু গোটা বিশ্ব ব্যতিক্রম লক্ষ্য করল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে । এ বিপ্লবের পর দেশব্যাপী স্লোগান ওঠেছিল, ‘সিপাহী জনতা ভাই-ভাই’ । সিপাহী-জনতা একতাব্ধ হয়েছিল দেশের এক চরম সংকটময় মূহুর্তে ।

রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চে, যেদিন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিশেহারা বিভ্রান্ত মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিলেন । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি অনেকটা পেছনের কাতারে স্ব-পেষায় ফিরে যান । দ্বিতীয়বারের মত তাকে আবার রাজনীতিতে দেখা গেল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর । এবারেও রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ধুমকেতুর মত হঠাৎ করেই হয়েছিল । কিন্তু এবার আর তিনি ধুমকেতুর মত বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডের অন্ধকারে হারিয়ে যাননি । বরং মানুষের মনের মনিকোঠায় তিনি চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছেন । ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনার একটি পটভূমি দেয়া দরকার । স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর আওয়ামীলীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় । আওয়ামীলীগের ৩ বছরের শাসনামালে জনজীবন বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির আকাশ ছোঁয়া মূল্য, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কবলে ব্যক্তি জীবনের নিরাপত্তাহীনতা-সব কিছুই জনগণের জন্য ছিল অনেকটা জগদ্দল পাথরের মত । জনগণের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা-এর সব কিছুই কেড়ে নেয়া হয়েছিল । তৎকালীন শাসক সরকারী ৪টি পত্রিকাবাদে সকল পত্র-পত্রিকা বন্ধ ঘোষণা করে এবং সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল শাসন প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় । অন্যদিকে ভারত সরকার মুক্তিযুদ্ধে প্রভূত সাহায্য করায় তৎকালীন শাসক এদেশের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য ভারতের ইচ্ছাক্রমে রক্ষী বাহিনীকে প্রচুর কর্তৃত্ব দান করে । যে সুযোগে ভারতীয় বাহিনী দীর্ঘকাল এদেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করে নানাবিদ যন্ত্রপাতি ও সমরাস্ত্র ভারতে চালান দেয় ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের অভ্যূত্থাণ সংগঠিত হয় এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে নিহত হয় । অভ্যূত্থানটি ছিল মর্মন্তুদ ও শোকাবহ । তবে দেখা গেল যে, ক্যু’দেতার পরে আওয়ামীলীগের একজন সাবেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ক্ষমতায় আসীন হন । অভ্যূত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী নেতা ও কর্ণেল রশিদ প্রেসিডেন্ট পদে বসালেন খন্দকার মোশতাক আহমেদকে । এদের সকলের পরামর্শমত খন্দকার মোশতাক জেনারেল জিয়াকে করলেন চিফ অব স্টাফ, তবে পদটির ক্ষমতা ও মর্যাদা অনেক কমিয়েছিলেন । সবার উপরে ডিফেন্স উপদেষ্টা হিসেবে বসানো হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সর্বাধিকানায়ক, বঙ্গবন্ধুর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি ওসমানীকে । মাত্র আড়াই মাসের শাসনের মাথায় বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিলের পাল্টা ক্যু’র প্রচেষ্টা শুরু হয় । তারা ২রা নভেম্বর রাতে জিয়াকে গৃহবন্দি করলেন এবং একই তারিখে মোশতাক সরকারের পতন ঘটালেন । ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিলের বিপ্লবের শুরুতে ২রা নভেম্বর রাত্রিতে জিয়াকে বন্দি করা হলেও, জিয়া যেমন ছিল নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ তেমনি নিঃস্বার্থ ও নিরহংকার । বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিলদের ক্যু’র বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ সিপাইরাও বিদ্রোহ করল এবং তারা সফলও হল । জিয়াউর রহমানের গুণে মুগ্ধ বিদ্রোহী সিপাহীরা জিয়াকে ৭ নভেম্বর বন্দীদশা থেকে অযাচিতভাবে ‍মুক্ত করে এবং অযাচিতভাবেই তাকে করা হয় সেনা বাহিনীর প্রধান (Chief of staff) [ জিয়াউর রহমানের স্মারক গ্রন্থ, ছদরুদ্দীন পৃঃ ৩-৩ ও ৩০৬] ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে মাত্র চারদিনের বন্দিদশা কাটিয়ে তিনি যে শুধু মুক্ত হয়েছেন তা নয় বরং ছাত্র-জনতা-সৈনিকের কাছে তিনি আবিভূর্ত হয়েছেন গণতন্ত্রের ত্রানকর্তা রুপে, দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতীকরুপে অনেকটা শেষ ভরসার মতই । ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতাশীন হন কোন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয় । কোন পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমেও তিনি ক্ষমতায় আসেননি । তিনি ক্ষমতাশীন হলেন বিপ্লবের সদর দরজা দিয়ে । তাকে ক্ষমতাশীন হতে হয়েছিল জাতীয় স্বার্থে, জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে । ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমের জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় স্বার্থে জাতীয় জাহাজের কাণ্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ।

প্রত্যেক জাতির জাতীয় জীবনে কোন একটি নির্দিষ্ট দিবস থাকে । যে দিবসটি সে জাতির জাতীয় অগ্রযাত্রায় শুকতারার ভূমিকা পালন করে । ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে তেমন একটা দিবস । এ দিবসটি আমাদের জাতীয় জীবনের শুকতারা । ঘটনা পরম্পরায় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র মঞ্চে আবির্ভাব না হলে দেশ বাকশালী শাসনের নিগড়ে বাঁধা থাকত । বেদনার হলেও সত্য, বর্তমানে ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ম্লান করার চেষ্টা চলছে । ভূলে গেলে চলবে না, ৭ নভেম্বরের চেতনা দেশবাসীর হৃদয়ে প্রোথিত । এই চেতনা উপলব্ধি করার বিষয় । এই চেতনা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চেতনা । যে চেতনা স্তব্ধ করার সাধ্য কারো নাই । ৭ নভেম্বরের সরকারী ছুটি বাতিল কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিনটিকে পালন করা না হলে কি এ দিনের চেতনা মুছে ফেলা যাবে ? নিশ্চয়ই অপ্রপচারে সত্য গোপন থাকে না কিংবা অতীতেও থাকে নি ।