ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমি বিগত বছর এইচএসসি’তে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী। আমার এসএসসি’তেও একই ফলাফল রয়েছে।দুইবারই বোর্ড থেকে বৃত্তি পেয়েছি।আমার তো সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি হওয়ার কথা।আমি খুশি হতামও।শুধু বিবেকবোধ একটু খোঁচাচ্ছে।মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক হচ্ছে না।আমি আমার কিছু অভিজ্ঞতা তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।

আমার ফলাফল দেখেই যে কারোর ধারনা হতে পারে আমি বুয়েট কিংবা এ জাতীয় কোথাও পড়ি। না,তা নয়।আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর শিক্ষার্থী।যদিও আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সায়েন্সের।আমি শিক্ষার্থী ছিলাম পাবনা ক্যাডেট কলেজের।সেখানে থেকে ৬ বছরে আমি যা উপলব্ধি করেছি তা হল,পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ হল বোর্ড পরীক্ষায় এ+ পাওয়া। বাঁধাধরা কিছু প্রশ্ন,বাজারের কিছু সাজেশন পড়লেই যেখানে গোল্ডেন এ+ পাওয়া সম্ভব,সেখানে কোন বেকুবের দল পুরো বই পড়বে???কিন্তু কলেজ থেকে বের হয়েই দেখলাম,ওই নিয়ম এখন আর খাটবে না।একটা শিক্ষার্থী তার জীবনের সবচেয়ে পরিশ্রম করে এই সময়ে।এই ৩/৪ মাস যারা কাজে লাগায়,দেখা যায়,তারাই সফল হয়।আমি নিজে সারাজীবনে যত অংক করিনি,ওই ৩ মাসে তার বেশি করেছি।এইচএসসির আগে যেখানে একটা বইই পড়িনি, সেখানে ওই সময়ে বিভিন্ন লেখকের ৩/৪ টা বই প্রতি বিষয়ের জন্য পড়া লেগেছে।কারণ,উচ্চশিক্ষার যে সূচি তা কখনই এইচএসসি’র ওই পড়া দিয়ে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব না।ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুধু ভর্তি’র জন্যই জরুরী না, পরবর্তীতেও তা অনেক কাজে আসে। তাছাড়া সবারই একটা দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত।যারা নকল,অন্যের খাতা দেখে বা হলে শিক্ষকের বিশেষ সুবিধা নিয়ে জিপিএ ৫.০০ পেল,তারা কি আদৌ ডাক্তার হওয়ার যোগ্য??সরকার কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে এইগুলো হয়না??? আমি বলতে পারব,যে এইগুলো হয়।কারণ নিজের চোখে আমি ৪০ জনকে অন্যের খাতা দেখে গোল্ডেন এ+ পেতে দেখেছি শুধু আমার হলে। বাইরের অবস্থা কি তা সহজেই অনুমেয়।

সব জায়গাতেই এখন ভর্তি হতে জিপিএ’র সাহায্য লাগে।জিপিএ ভালো না হলে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া যায়না,বিভিন্ন জায়গায় ৫০/৮০ নম্বর থাকে শুধু জিপিএ’র উপর।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতে আমার স্কোর ছিল ৮০.৫,জিপিএ স্কোর ৮০ তে ৮০।১৬০.৫ নিয়ে আমি ৫৭ তম হয়েছিলাম।আমার সাথেই একজন ভর্তি পরীক্ষাতে ৯২.৫ পেয়েও আমার চেয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলো শুধু তার জিপিএর জন্য। এই যে সুবিধা জিপিএ’র জন্য,এটাই কি যথেষ্ট না??এই ধরনের পরীক্ষায় যেখানে ১ নম্বরের জন্য ৫০ জনের পিছনে চলে যেতে হয় সেখানে এতটুকু সুবিধাই তো অনেক ব্যবধান তৈরি করে দেয়।এই বাধা অতিক্রম করেও যারা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়,তারাই তো প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী।তাদের এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কে দিলো সরকারকে????

সারাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্ন তৈরি ও উত্তরপত্র যাচাই করে দশটি ভিন্ন ভিন্ন বোর্ড। একেক বোর্ডের প্রশ্ন, নিরীক্ষকদের মান একেক রকম।কোথাও প্রশ্ন একবার কঠিন হয়,তখন ওই বোর্ডের শিক্ষার্থীরা খারাপ করে।আবার কোথাও হয় সোজা,যার ফলে ওই বোর্ডের ফলাফল ভালো হয়।জনৈক শিক্ষকের মুখে শুনেছিলাম,তিনি যখন পরীক্ষকদের সম্মেলনে গিয়েছিলেন,তখন বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছিলেন,নিজের ছেলেমেয়ের খাতা মনে করে নম্বর দেবেন!!!তাহলে কিভাবে বলা সম্ভব যে ওই ফলাফল শতভাগ সঠিক???

প্রতি বছর এইচএসসি শেষ হওয়ার পরেই শিক্ষার্থীরা কোথাও না কোথাও তাদের প্রস্তুতি শুরু করে।যারা মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নেয়,তারা সাধারনত অতিরিক্ত চাপ পড়বে ভেবে আর কোথাও ভর্তি’র প্রস্তুতি নেয়না।ইতিমধ্যেই সবাই প্রস্তুতি’র ২মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে।এখন হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত???তাদের এই মূল্যবান সময়কে ফিরিয়ে দেবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকলেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই কি কাম্য নয় দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের কাছ থেকে???