ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হরতাল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই সরকার আইন করে হরতাল বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু হরতালের নামে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা তো কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। রেলগাড়ি, বাস, টেক্সি, রিকশা, অটোরিকশা, এম্বুলেন্স, অফিস, আদালত, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, শিক্ষালয়, শহীদ মিনার ইত্যাদিতে পেট্রল/কেরোসিন/গানপাউডার দিয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা, বোমা ও ইটপটকেল নিক্ষেপ করা, রেল লাইন তুলে ফেলা, সেতুর পাটাতন খুলে নিয়ে যাওয়া, গাছ ও মাটি কেটে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া, মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখিদের হতাহত করাসহ এহেন অপকর্ম তো কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র বা বিবেকের বিধানেই সমর্থন ও ক্ষমাযোগ্য নয়।

সাম্প্রতিক হরতালকে কেন্দ্র করে আগুনে পুরিয়ে দেয়া হলো যে পশু-পাখির শরীর, নিধন করা হলো প্রায় চল্লিশ হাজার গাছপালা, তারাতো কোনো দলের কর্মী-সমর্থক বা ভোটার ছিল না, গাছপালাগুলো তো অক্সিজেন দিতো সবাইকেই, কোটি কোটি টাকার সম্পদ হতো বাংলাদেশ নামক আমাদের এই প্রিয় রাষ্ট্রেরই। যারা এসব অপকর্ম করেছে তারা কি মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে বেশি অপরাধ করেনি? এইসব অপরাধতো মানবতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরোধী অপরাধ। হরতালের নামে পরিচালিত এসব ভয়াবহ অপকর্মের কারণে দেশের মানুষ এখন ভীতসন্ত্রস্ত। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতি হরতালে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। ব্যাহত হচ্ছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর উৎপাদন এবং আমদানি ও রপ্তানি। কর্মহীন থাকছে খেটে খাওয়া মানুষ। বন্ধ থাকছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্যাহত হচ্ছে পরীক্ষা ও লেখাপড়া। পিছিয়ে পড়ছে আমাদের সম্ভাবনাময় সন্তানেরা, ব্যাহত হচ্ছে সকল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমনসব দিন খুঁজে হরতাল দেয়া হয় যেন, হরতালেই শুধু নয় হরতালের আগে এবং পরে আরো কয়েক দিন বন্ধ থাকে দেশের উৎপাদন আমদানি-রপ্তানিসহ সকল মানুষের কাজকর্ম। দাবি-দাওয়ার পক্ষে জনসর্মথন প্রমাণ করা নয়; বরং যে দেশ ও মানুষের জন্য(?) রাজনীতি সে দেশ ও মানুষের সর্বাধিক অপূরণীয় ক্ষতি নিশ্চিত করাই যেন হরতালের উদ্দেশ্য। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের ওপর চাপাতে চেষ্টা করছে এ সকল অপকর্মের ক্ষয়-ক্ষতির দায়-দায়িত্ব। একে অপরকে দোষারোপ করেই শেষ করতে চাচ্ছে নিজেদের কর্তব্য। একজোটের প্রধান পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা দিচ্ছেন দেশ অচল করে দেবেন। গণতন্ত্র রক্ষার (?) জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের পরোক্ষ আহŸান জনাচ্ছেন সামরিক বাহিনীকে! তার বক্তব্যে তিনি অনুচ্চারিত ভাষায় ¯^ীকার করে নিয়েছেন, দেশ এখনো সচল আছে। কমবেশি সচল এই দেশ অচল করে দেয়ার মানে কি এই নয় যে, দেশের উৎপাদন ও অমদানি রপ্তানিসহ সার্বিক অথনৈতিক কর্মকাণ্ড অচল করা, দেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অচল করা, দেশের কলকারখানা ও ব্যবসাবাণিজ্য অচল করা, চাকরিজীবী শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা অচল করা, খেটেখাওয়া মানুষের আয়-উপার্জন অচল করা, অর্থৎ দেশের সকল মানুষকেই অর্থনৈতিভাবে এবং শারীকিভাবে ল্যাংড়া লুলা আতুর করে অচল করে দেয়া? তাহলে কার জন্য, কিসের জন্য এই রাজনীতি?
আমাদের জানমাল ও আমাদের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ যেন আর অবশিষ্ট নেই এই দেশে। আমাদের ভোটের মূল্য থাকলেও জীবনের কোনো মূল্যই নেই তাদের কাছে! আমরা এখন অসহায় ও বেওয়ারিশ। নেই নিজের কাজকর্ম করে স্বাভাবিক জীবন ধারনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা! আমরা কি এ দেশের নাগরিক নয়? আমাদের কি এতোটুকু নাগরিক অধিকার নেই? সরকার দলীয় জোট বলছে, দেশের সকল মানুষ তাদের মতামতের পক্ষে; আবার বিরোধীদলীয় জোট বলছে, দেশের সকল মানুষ তদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে! অর্থাৎ এক পক্ষের মতে অন্য পক্ষে অবস্থিত দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫% থেকে ৪৫% সক্রিয় নেতা-কর্মী-সমর্থকের যেন কোনো অস্তিত্বই নেই! সাধারণ মানুষ তো অনেক দূরের কথা। সাধারণ মানুষসহ পরস্পরকে অবমূল্যায়নের এই চরম পরিস্থতিতে আমাদের জান-মাল প্রতিহিংসার শিকার হবে; আর একদল আমাদেরকে বলবেনÑ জীবন দিয়ে এই সরকার উৎখাত করুন, আরেক দল বলবেনÑ সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধী দলের এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করুন। আমরা পুড়বো, মরবো, মার খাবো, আর নেতারা-নেত্রীরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে গলাবাজি করবেন। জীবন-জীবিকার অতি প্রয়োজনে আমরা ঘরের বাইরে এলেই; এমনকি ঘরে থাকলেও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিয়ে এক পক্ষ বলবেন, দেশের সকল মানুষ ¯^তঃস্ফ‚র্তভাবে হরতাল পালন করেছে। আরেক পক্ষ বলবেন, কোথাও হরতাল হয়নি!
অপনারা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে যে যাই বলুন না কেন, নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত সরকারের গুরু দায়িত্ব। সরকার বা সরকার দলীয় জোট যদি মনে করে, জানমালের এইরূপ অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির জন্য মানুষ কেবল বিরোধী দলীয় জোটের ওপরই নাখোশ হবে তো সেটি ভুল ধারণা। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকেও মাশুল গুনতে হবে আসন্ন র্নিবাচনে। চলমান চরম নৈরাজ্য প্রতিরোধে সরকার ও সরকার দলীয় জোটের নেতাদের সদিচ্ছা নিয়ে এখই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। হরতালের আগের দিন একদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা সংবাদ মাধ্যমে এসে বলছেন, যে কোনো প্রকার নাশকতা ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুত। আর অপরদিকে আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ আর হতাহতের উল্লাসে উন্মত্ত কতিপয় যুবক। মারছে এবং মার খাচ্ছে পুলিশ। পকেট থেকে দার্য পদার্থ ও দিয়াশলাই বের করে গাড়িতে ছিটিয়ে দিয়ে আগুন লাগিয়ে ধীরেসুস্থে হেঁটে হেঁটে অপরাধী চলে যাচ্ছে নিরাপদে! দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার গাড়ি এবং মূল্যহীন (?) মানুষ। সেই সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে জাতির বিবেক, দেশের গণতন্ত্র অর্থনীতি রাজনীতি সমাজনীতি এবং ধর্মনীতি। অবশেষে দমকল কর্মীসহ আগুন নেভাতে এসেছেন সেই সর্বোচ্চ প্রস্তুত (?) সতর্ক পুলিশ। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একাধিক টেলিভিশনের ক্যামেরা পারসন এই অপকর্ম দেখতে পারে, ভিডিও করতে পারে, প্রচার করতে পারে, পুলিশ দেখতে পারে না কেন? ক্যামেরা পারসনের চেয়ে পুলিশের সংখ্যা তো আর কম নেই। তারা কি জেগে ঘুমাচ্ছে? সরকার কি পারে না প্রতি ক্যামেরা পারসনের আশপাশে দুএকজন করে এসব অন্ধ (?) পুলিশকে দায়িত্বে নিয়োজিত রাখতে? দেশপ্রেমিক মানুষ এখন আর দেখতে চায় না বার বার আগুন জ্বলিয়ে, ভাঙচুড় চালিয়ে, হতাহত করে অপরাধীরা চলে যাবার পরে এসে পুলিশের এইসব বিতর্কিত একশন। অথচ এ সকল ফৌজদারি অপরাধ দমনে পুলিশ সত্যিকারভাবে সক্রিয় হলে অন্যরকম হতে পারতো এসব দৃশ্য। যেমন : (ক) মারছে, ভাঙছে, আগুন দিচ্ছে এবং পুলিশ হাতেনাতে ধরে এরেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে সেই অপরাধীকে। অথবা (খ) মারছে, ভাঙছে, আগুন দিচ্ছে আর সেখানেই তৎক্ষণাৎ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সেই অপরাধীরা এবং সেখান থেকেই এরেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদেরকে। অথবা (গ) মারছে, ভাঙছে, আগুন দিচ্ছে আর তখনই সেখেনে পুলিশের গুলিতে আহত বা নিহত (অব্যশ্যই অনাকাক্সিক্ষত) হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সেই অপরাধী। এইরূপ দৃশ্য দেখে জনগণ নিশ্চয়ই বলবে না যে পাখির মতো গুলি করে গণহত্যা (?) করা হয়েছে। কেউ কোনো ইনটেনশন নিয়ে এমন কথা বললেও; অন্যরা এর জবাবে বলবেনÑ হ্যাঁ, এই পাখিটি পায়রা, ঘুঘু কিংবা আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল ছিলো না বরং এটি ছিল অত্যন্ত হিংস্র বাজপাখি। তাছাড়া আমরা বিভিন্ন টেলিভিশনের পর্দায় যাদেরকে এহেন অপকর্ম করতে দেখছি দিনের পর দিন, তাদেরকে গ্রেপ্তার করে সেইসব অপকর্মের ফুটেজসহ বারবার দেখানো হচ্ছে না কেনো টেলিভিশনের পর্দায়? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য উল্লিখিত এই দরকারি একশনগুলো নেয়ার সাধ্য তো আমাদের পুলিশের না থাকার কথা নয়। এমটি করা গেলে নিশ্চই নতুন করে আর কেউ সাহস পেতো না যখন তখন এমনভাবে মারো কাটো জ্বালাও পোড়াও করার জন্য। পুলিশকেও আর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে হতো না মিছিলে। মরতো না কোনো নিরপরাধ মানুষ। নিতে হতো না তথাকথিত গণহত্যার অভিযোগ। রক্ষা পেতো আমাদের জানমাল। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে পিকেটিং বিরোধী কঠোর আইন করে পুলিশকে দিতে হবে সেইরূপ ক্ষমতা। সরকারি জোটের নেতাদের মনে যদি এমন প্রতিজ্ঞা থাকে যে, কোনোদিন বিরোধী জোটে গেলে তারা হরতালের নামে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এমনসব অপকর্ম করবেন না, তবেই তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কঠোর আইন করে এহেন পিকেটিং বন্ধ করা। আমরা আশা করি তারা তা পারবেন।
মো. রহমত উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট।
md.rahamotullah52@gmail.com
http://www.bhorerkagoj.net/new/blog/2013/06/13/121929.php

ভোরের কাগজ : মুক্তচিন্তা » বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৩