ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 
04_Rajshahi-Clash_200914_0002

হরতাল হচ্ছে কোন দাবির পক্ষে জনসমর্থন আছে কি না তা প্রমান করার একটি উপায়। এটিকে বলা যায় ব্যালটবিহীন গণ ভোট। নির্বাচনের দিন যেমন সংস্লিষ্ট মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের কাজকর্ম বাদ দিয়ে নিজেদের, দেশের ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভোট দিতে যায়; ঠিক তেমনই স্বেচ্ছায় নিজের কাজকর্ম বাদ দিয়ে ঘরে বসে সমর্থন জানানোর নামই হরতাল।

যে কেই যে কোন দাবির পক্ষে জন সমর্থন প্রমান করার জন্য সংস্লিষ্ট এলাকায়, প্রদেশে বা দেশে হরতাল আহ্বান করতে পারে। সাধারনত স্থানীয় বা কেন্দীয় সরকারের নিকট থেকে কোন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জনসমর্থ প্রমান করার জন্যই হরতালের ডাক দেওয়া হয়ে থাকে। হরতাল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই সরকার আইন করে হরতাল বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু হরতালের নামে জান-মালের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা তো কোন গণতান্ত্রিক অধীকার নয়। রেলগাড়ি, বাস, টেক্সি, রিক্সা, অটোরিক্সা, এম্বুলেন্স, অফিস, আদালত, দোকানপাঠ, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, শিক্ষালয়, শহিদমিনার ইত্যাদিতে পেট্রল / কেরোসিন / গানপাউডার দিয়ে অগ্নীসংযোগ ও ভাংচূড় করা, বোমা ও ইটপটকেল নিক্ষেপ করা, রেল লাইন তুলে ফেলা, সেতুর পাটাতন খুলে নিয়ে যাওয়া, গাছ ও মাটি কেটে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখিদের হতাহত করাসহ এহেন অপকর্মতো কোন ধর্ম, রাষ্ট্র বা বিবেকের বিধানেই সমর্থন ও ক্ষমাযোগ্য নয়। সাম্প্রতিক হরতালকে কেন্দ্র করে আগুনে পুরিয়ে দেওয়া হলো যে পশু-পাখির শরীর, নিধন করা হলো প্রায় চল্লিশ হাজার গাছপালা, স্কুলে হামলা চালিয়ে মারাত্বক ভাবে জখম করা হলো ছোট্ট ছোট্ট শিশু শিক্ষার্থীদেরকে, তারাতো কোন দলের কর্মী সমর্থক বা ভোটার ছিলো না, গাছপালাগুলোতো অক্সিজেন দিতো সবাইকেই, কোটি কোটি টাকার সম্পদ হতো বাংলাদেশ নামক আমাদের এই প্রিয় রাষ্ট্রেরই। যারা এসব অপকর্ম করেছে তারা কি মনবতা বিরোধী অপরাধের চেয়ে বেশি অপরাধ করেনি? এইসব অপরাধতো মানবতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরোধী অপরাধ।

হরতালের নামে পরিচালিত এসব ভয়াবহ অপকর্মের কারণে দেশের মানুষ এখন ভীত-সন্ত্রস্ত। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতি হরতালে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। ব্যহত হচ্ছে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রির উৎপাদন এবং আমদানি ও রপ্তানি। কর্মহীন থাকছে খেটে খাওয়া মানুষ। বন্ধ থাকছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্যহত হচ্ছে পরিক্ষা ও লেখাপড়া। পিছিয়ে পড়ছে আমাদের সম্ভাবনাময় সন্তানেরা, ব্যহত হচ্ছে সকল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমনসব দিন খুঁজে হরতাল দেওয়া হয় যেনো, হরতালেই শুধু নয় হরতালের আগে এবং পরে আরো কয়েক দিন বন্ধ থাকে দেশের উৎপাদন আমদানি রপ্তানিসহ সকল মানুষের কাজকর্ম। দাবি-দাওয়ার পক্ষে জনসর্মথন প্রমান করা নয়; বরং যে দেশ ও মানুষের জন্য(?) রাজনীতি সে দেশ ও মানুষের সর্বাধিক অপূরণীয় ক্ষতি নিশ্চিত করাই যেনো হরতালের উদ্দেশ্য। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের উপর চাপাতে চেষ্টা করছে এসকল অপকর্মের ক্ষয়-ক্ষতির দায়-দায়ীত্ব। একে অপরকে দোষারোপ করেই শেষ করতে চাচ্ছে নিজেদের কর্তব্য। একজোটের প্রধান পরিস্কার ভাষায় ঘোষণা দিচ্ছেন দেশ অচল করে দিবেন। গণতন্ত্র রক্ষার(?) জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের পরোক্ষ আহ্বান জনাচ্ছেন সামরিক বাহিনীকে! তাঁর বক্তব্যে তিনি অনুচ্চারিত ভাষায় স্বীকার করে নিয়েছেন, দেশ এখনো সচল আছে। কমবেশি সচল এই দেশ অচল করে দেওয়ার মানে কি এই নয় যে: দেশের উৎপাদন ও অমদানি রপ্তানিসহ সার্বিক অথনৈতিক কর্মকান্ড অচল করা, দেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অচল করা, দেশের কলকারখানা ও ব্যবসাবাণিজ্য অচল করা, চাকরিজীবি শ্রমিক-কর্মচারি-কর্মকর্তদের নিয়মিত বেতন-ভাতা অচল করা, খেটেখাওয়া মানুষের আয়-উপার্জন অচল করা, অর্থৎ দেশের সকল মানুষকেই অর্থনৈতিভাবে এবং শারিকিভাবে ল্যাঙড়া লুলা আঁতুর করে অচল করে দেওয়া? তাহলে কার জন্য, কিসের জণ্য এই রাজনীতি?

ctg_Shibir_Attack_4

আমাদের জানমাল ও আমাদের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার দায়ীত্ব নেবার মতো কেউ যেনো আর অবশিষ্ট নেই এই দেশে। আমাদের ভোটের মূল্য থাকলেও জীবনের কোন মূল্যই নেই তাদের কাছে! আমরা এখন অসহায় ও বেওয়ারিশ। নেই নিজের কাজকর্ম করে স্বাভাবিক জীবন ধারনের নূন্যতম নিশ্চয়তা! আমরা কি এদেশের নাগরিক নয়? আমাদের কি এতটুকু নাগরিক অধিকার নেই? সরকার দলীয় জোট বলছে, দেশের সকল মানুষ তাদের মতামতের পক্ষে; আবার বিরোধী দলীয় জোট বলছে, দেশের সকল মানুষ তদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে! অর্থাৎ এক পক্ষের মতে অন্য পক্ষে অবস্থিত দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫% থেকে ৪৫% সক্রিয় নেতা-কর্মী-সমর্থকের যেনো কোন অস্তিত্বই নেই! সাধারন মানুষ তো অনেক দূরের কথা। সাধারন মানুষসহ পরস্পরকে অবমূল্যায়ণের এই চরম পরিস্থতিতে আমাদের জান-মাল প্রতিহিংসার শিকার হবে; আর একদল আমাদেরকে বলবেন- জীবন দিয়ে এই সরকার উৎখাত করুন, আরেক দল বলবেন- সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধী দলের এসব কর্মকান্ড প্রতিরোধ করুন। আমরা পুড়বো, মরবো, মার খাবো, আর নেতারা-নেত্রীরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে গলাবাজি করবেন। জীবন-জীবিকার অতি প্রয়োজনে আমরা ঘরের বাইরে এলেই; এমনকি ঘরে থাকলেও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিয়ে এক পক্ষ বলবেন, দেশের সকল মানুষ শতষ্ফুর্ত ভাবে হরতাল পালন করেছে। আরেক পক্ষ বলবেন, কোথাও হরতাল হয়নি!

অপনারা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে যে যাই বলুন না কেন নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত সরকারের গুরু দায়ীত্ব। সরকার বা সরকার দলীয় জোট যদি মনে করে, জানমালের এইরূপ অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির জন্য মানুষ কেবল বিরোধী দলীয় জোটের উপরই নাখোশ হবে তো সেটি ভুল ধারনা। দায়ীত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকেও মাশুল গুনতে হবে আসন্ন র্নিবাচনে। চলমান চরম নৈরাজ্য প্রতিরোধে সরকার ও সরকার দলীয় জোটের নেতাদের সদিচ্ছা নিয়ে এখই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। হরতালের আগের দিন একদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা সংবাদ মাধ্যমে এসে বলছেন, যে কোন প্রকার নাশকতা ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুত। আর অপর দিকে আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি ভাংচূর, অগ্নিসংযোগ আর হতাহতের উল্লাসে উন্মত্ত কতিপয় যুবক। মারছে এবং মারখাচ্ছে পুলিশ। পকেট থেকে দার্য পদার্থ ও দিয়াশলাই বের করে গাড়িতে ছিটিয়ে দিয়ে আগুন লাগিয়ে ধীরে সুস্থে হেঁটে হেঁটে অপরাধি চলে যাচ্ছে নিরাপদে! দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার গাড়ি এবং মূল্যহীন(?) মানুষ। সেই সাথে পুড়ে যাচ্ছে জাতির বিবেক, দেশের গণতন্ত্র অর্থনীতি রাজনীতি সমাজনীতি এবং ধর্মনীতি। অবশেষে দমকল কর্মীসহ আগুন নেভাতে এসেছেন সেই সর্বোচ্চ প্রস্তুত(?) শতর্ক পুলিশ। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একাধিক টেলিভিশনের কেমেরা পারসন এই অপকর্ম দেখতে পারে, ভিডিও করতে পারে, প্রচার করতে পারে, পুলিশ দেখতে পারে না কেন? কেমেরা পারসনের চেয়ে পুলিশের সংখ্যা তো আর কম নেই। তারা কি জেগে ঘুমাচ্ছে? সরকার কি পারে না প্রতি কেমেরা পারসনের আশেপাশে দু’একজন করে এসব অন্ধ(?) পুলিশকে দায়িত্বে নিয়োজিত রাখতে? দেশপ্রেমিক মানুষ এখন আর দেখতে চায় না বার বার আগুন জ্বলিয়ে, ভাংচূড় চালিয়ে, হতাহত করে অপরাধীরা চলে যাবার পরে এসে পুলিশের এইসব বিতর্কিত একশান । অথচ এসকল ফৌজদারি অপরাধ দমনে পুলিশ সত্যিকারভাবে সক্রিয় হলে অন্যরকম হতে পারতো এসব দৃশ্য। যেমন: (ক) মারছে, ভাংছে, আগুন দিচ্ছে এবং পুলিশ হাতেনাতে ধরে এরেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে সেই অপরাধীকে। অথবা (খ) মারছে, ভাংছে, আগুন দিচ্ছে আর সেখানেই তৎক্ষনাৎ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটয়ে পড়ছে সেই অপরাধীরা এবং সেখান থেকেই এরেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদেরকে। অথবা (গ) মারছে, ভাংছে, আগুন দিচ্ছে আর তখনই সে খানে পুলিশের গুলিতে আহত বা নিহত (অব্যশ্যই অনাকাঙ্খিত) হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সেই অপরাধী।

এইরূপ দৃশ্য দেখে জনগণ নিশ্চয়ই বলবে না যে পাখির মতো গুলি করে গণহত্যা(?) করা হয়েছে। কেউ কোন ইনটেনশন নিয়ে এমন কথা বললেও; অন্যান্যরা এর জবাবে বলবেন- হ্যা, এই পাখিরা পায়রা, ঘুঘু কিংবা আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল ছিলো না বরং এরা ছিলো অত্যন্ত হিংস্র বাজপাখি। তাছাড়া আমরা বিভিন্ন টেলিভিশনের পর্দায় যাদেরকে এহেন অপকর্ম করতে দেখছি দিনের পর দিন, ফুটেজ দেখে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে এনে সেইসব অপকর্মের ফুটেজসহ বার বার দেখানো হচ্ছেনা কেনো টেলিভিশনের পর্দায়? তদুপরি যাদেরকে গুলি করতে ও গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ তাদেরকে এবং তাদের দ্বারা সংগঠিত অপরাধের চিত্র একইসাথে বারবার উপস্থাপন করা হচ্ছে না কোন বিভিন্ন টিভিতে। দেশের মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য উল্লিখিত এই দরকারি একশনগুলো নেওয়ার সাধ্যতো আমাদের পুলিশের না থাকার কথা নয়। এমনটি করা গেলে নিশ্চয়ই নতুন করে আর কেউ সাহস পেতো না যখন তখন এমনভাবে মারো কাটো জ্বালাও পোড়াও করার জন্য। পুলিশকেও আর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে হতো না মিছিলে। মরতো না কোনো নিরপরাধ মানুষ। নিতে হতো না তথাকথিত গণহত্যার অভিযোগ। রক্ষা পেতো আমাদের জানমাল। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে পিকেটিং বিরোধী কঠোর আইন করে পুলিশকে দিতে হবে সেইরূপ ক্ষমতা। সরকারি জোটের নেতাদের মনে যদি এমন প্রতিজ্ঞা থাকে যে, কোনদিন বিরোধী জোটে গেলে তারা হরতালের নামে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর এমনসব অপকর্ম করবেন না, তবেই তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কঠোর আইন করে এহেন পিকেটিং বন্ধ করা। আমরা আশা করি তারা তা পারবেন।

মো. রহমত উল্লাহ্- শিক্ষাবিদ এবং কলাম লেখক।
md.rahamotullah52@gmail.com