ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

এ বছর ১০ শিক্ষাবোর্ডে ৭ লাখ ৭১ হাজার ৬৯০ জন ছেলে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ৯১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৩ জন মেয়ে অংশ নিয়ে পাস করে ৯০ দশমিক ৮১ শতাংশ।

সারাদেশে মোট পাসের হার ও প্রাপ্ত জিপিএ-র হিসাবে এবার মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা সামান্য এগিয়ে থাকলেও সমান সুবিধাপ্রাপ্ত মেয়েরা কিন্তু পিছিয়ে নেই মোটেও। যেমন জেলার শীর্ষস্থান দখল করেছে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’। কক্সবাজারে জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ১৪০ জন, যা গত বছরের তুলনায় ১৮০ জন বেশি। এই বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ২৫০ জন। এর মধ্যে পাস করে ২৪৯ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭০ জন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সেরা ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এই বিদ্যালয়ের অবস্থান। শুধু তাই নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত নামকরা স্কুলের মেয়েরাও কেউ পিছিয়ে নেই। ভিকারুন্নেসা নুন কলেজ, ফেনি গার্লস ক্যাডেট কলেজ, জয়পুর হাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ ও ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের মেয়েরাই স্ব স্ব শিক্ষাবোর্ডে কৃতিত্বপূর্ণ ফল করেছে।

একটু পিছনে তাকালেও দেখা যায় আরো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত ১৬ জুলাই ২০১০ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিলো একটি রঙিন ছবি। যার ক্যাপশান ছিল ‘ঢাকা বোর্ডের মেধা তালিকায় প্রথম হওয়া ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কলেজের প্রিন্সিপাল’। সে বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ওই কলেজের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দু’জন বাদে সবাই অর্জন করে জি.পি.এ.-৫। সেরা হয়েছে ঢাকা বোর্ডে। সেরা হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশে। শুধু এরাই নয়, আমাদের অন্য মেয়েরাও এগিয়ে গেছে অনেক। এরাই দেশের অহংকার। আমাদের আজকের সফল মেয়েরা তথা আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ মায়েরা নিঃশব্দে বলে দিয়েছে- ‘কোন কোটা নয়- অগ্রধিকার নয়- অনুকম্পা নয়, প্রাপ্য সুযোগ পেলে আমরাও করতে পারি জয়, আমরাও পেতে পারি উচ্চ মর্যাদার আসন।

তা সত্ত্বেও আমরা কি এখনো নিশ্চিত করতে পেরেছি আমাদের মেয়েদের সুশিক্ষা অর্জনের মৌলিক অধিকার? পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবেও মেয়েদের মেধানুসারে সর্বোচ্চ অর্জনের সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। শুধুমাত্র ক্যাডেট কলেজের কথাই ধরা যাক। ক্যাডেট কলেজসমূহের প্রসপেক্টাস অনুসারে- ‘বাংলাদেশে বিদ্যমান ক্যাডেট কলেজসমূহ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেনাবাহিনীর এ্যাডজুটেন্ট জেনারেল এর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসিত আবাসিক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা পূর্বকালে মোট ৪টি ক্যাডেট কলেজ ছিল। জাতীয় জীবনে ক্যাডেট কলেজের প্রভূত অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা উত্তরকালে আরো ৮টি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১২টি ক্যাডেট কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের। এখানে ইংরেজি মাধ্যমে জাতীয় পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্যাডেটদের শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, চারিত্রিক, সাংস্কৃতিক ও নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের লক্ষে শিক্ষা সম্পূরক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই শিক্ষা কার্যক্রম একজন ক্যাডেটকে সম্যক রূপে বিকশিত করে। ফলে শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রশংসনীয় দক্ষতার ও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে।’ এখানে সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয় যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও উল্লেখিত সুশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সুযোগ মাত্র এক তৃতীয়াংশ। মোট ১২টি ক্যাডেট কলেজে প্রতি বত্সর কম-বেশি ৬০০ জন বাছাইকৃত উত্তম শিক্ষার্থী ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে ৪৫০ জন ছেলে এবং মাত্র ১৫০ জন মেয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। সারা দেশে বিদ্যমান যোগ্য শিক্ষার্থীর তুলনায় এই সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। এই নগণ্য সুযোগটুকুও এসেছে মাত্র কিছু দিন আগে। সকল ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষে নারী-পুরুষ উভয়ের আত্মত্যাগে স্বাধীনতা অর্জনের ১০ বত্সর পর ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের সেরা ‘ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ’। দেশের প্রথম ও একমাত্র এই গার্লস ক্যাডেট কলেজে প্রতি বত্সরে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি হয় সারাদেশ থেকে মাত্র ৫০ জন মেয়ের। স্বাধীনতার ৩৪ বত্সর পর ২০০৬ সালে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়- ‘ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ’ ও ‘জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ’।

দেশ ও জাতির সার্বিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার লক্ষে অধিক যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির জন্যই বৃদ্ধি করা প্রয়োজন মোট ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা। তবে সর্বাগ্রে আনুপাতিকহারে বৃদ্ধি করতে হবে গার্লস ক্যাডেট কলেজ। সামরিক বাহিনীসহ সকল কর্মক্ষেত্রে প্রায় সমানতালেই অংশ নিচ্ছে মেয়েরা। কোটায় চাকরি দিয়ে দয়া দেখানোর চেয়ে শিক্ষার সুযোগ দিয়ে সুযোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবার পথ প্রশস্ত মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও ক্ষমতা।

লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ
[পূর্ব প্রকাশ- দৈনিক ইত্তেফাক >২৯ জুন ২০১৪,আলোকপাত]