ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

নবুয়ত লাভের ১৩ বছরেরও অধিক সময় পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় থাকাকালে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে কোরবানির আদেশপ্রাপ্ত হন। এই আদেশপ্রাপ্তির পরই তিনি নিজে কোরবানি শুরু করেন। এরপর তিনি যে ১০ বছর বেঁচেছিলেন, সে ১০ বছরই এক বা একাধিক পশু কোরবানি দিয়েছেন। কোরবানি মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদত নয়। বেশির ভাগ নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুসারে কোরবানি সুন্নাতে মোয়াক্কাদা। ইবাদতের গুরুত্বের দিক বিবেচনায় অনেকেই এটিকে ওয়াজিব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে যে মুসলমান বালেগ বা নাবালেগ, নারী-পুরুষ ন্যূনতম জাকাতযোগ্য বা নিসাব পরিমাণ (সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্য পরিমাণ) অথবা এর চেয়ে বেশি মালের মালিক, সে-ই কোরবানি দেবে। যার সম্পত্তির মূল্য নিসাব পরিমাণের চেয়ে কম, ইচ্ছা করলে সে-ও কোরবানি দিতে পারবে এবং নেকিপ্রাপ্ত হবে। একটি ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, হরিণ একটি কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। আবার একটি গরু, মহিষ, উট সাতটি কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। মনে রাখতে হবে, উলি্লখিত পশুর বাচ্চা কোরবানির যোগ্য পশু হিসেবে গণ্য হবে না। কেবল বাচ্চা বয়স অতিক্রমকারী সুস্থ, সবল, হালাল এবং গর্ভবতী নয়- এমন পশুই কোরবানির জন্য যোগ্য। (যে পশুর চোয়ালের নিচের পাটির সামনের দুটি প্রথম বা দুধের দাঁত নিজে নিজে পড়ে গিয়ে আবার নতুন দুটি বড় বড় দাঁত গজিয়েছে, সে পশুটি তার শিশুকাল অতিক্রম করেছে।) সাধ্য অনুসারে একজন ব্যক্তি নিজে এক বা একাধিক কোরবানি দিতে পারবে এবং তা দেওয়া উচিত। তবে নিজের নামে নয়; কোরবানি দিতে হবে নিজের পক্ষে আল্লাহর নামে। নিজের পক্ষে কোরবানি করা প্রথম শর্ত। সাধ্য বেশি থাকলে বালেগ বা নাবালেগ, জীবিত বা মৃত মা, বাবা, ভাই, বোন, পুত্র, কন্যা এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর পক্ষেও কোরবানি করা যাবে। তবে নিজের পক্ষে কোরবানি না করে অন্য কারো পক্ষে কোরবানি করা যাবে না। কোরবানির পশু জবাই করার সময় কোনো ব্যক্তির নাম লেখা বা বলা বাধ্যতামূলক নয়। এতে করে অনেকেরই মনে হতে পারে, ওই ব্যক্তির নামে কোরবানি করা হয়েছে। যা মোটেও সঠিক নয়। কোরবানি মুসলিম মুমিন ব্যক্তির পক্ষে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার নামেই উৎসর্গীকৃত। যা অবশ্যই হতে হবে সৎ উপার্জনে এবং খালেস নিয়তে। কোরবানির নামে লোকদেখানোর জন্য বা কোনো দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে বড় বড় পশু জবাই করে গোশত বিলানো বা খায়ানো আসলে কোরবানি নয়। কেননা এটির সুফল দুনিয়ায়ই পাওয়া যেতে পারে, আখেরাতে নয়। আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছে, যারা সঠিকভাবে জাকাত আদায় (ফরজ ইবাদত) করে না, অথচ কোরবানির ঈদ উপলক্ষে লাখ লাখ টাকার পশু প্রদর্শন ও জবাই করে।

মহান আল্লাহ তায়ালা কোরবানির পশুর গোশত খাওয়া মুসলমানদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। কেউ যদি নিজের কোরবানির পশুর সব গোশতই নিজে বা নিজেরা খেয়ে নেয়, তার কোরবানির নির্ধারিত সওয়াব কমবে না। কিন্তু গরিব-মিসকিনদের বিলিয়ে দিলে যে অতিরিক্ত সওয়াব পেত, তা থেকে বঞ্চিত হবে। কোরবানির পশুর গোশত গরিব-মিসকিনদের বিলিয়ে দেওয়া অত্যধিক সওয়াবের কাজ। কেননা ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে কোরবানি দিতে সক্ষম ব্যক্তিদের ওপর অক্ষম ব্যক্তিদের একটা হক রয়েছে। এমনকি কোরবানির পশুর চামড়া, পশম, শিং, দাঁত- সবই কোরবানিদাতা সরাসরি নিজের প্রয়োজনে সদ্ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু এসব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা-পয়সা কোনো অবস্থায়ই নিজে ভোগ করতে পারবে না। সে টাকা-পয়সা অবশ্যই গরিব-মিসকিনদের বিলিয়ে দিতে হবে। যদি কোরবানির পশুর গোশতসহ যেকোনো অংশের বদলে কোরবানিদাতা কোনো অর্থ আয় করেন বা কোনো ব্যয় থেকে আংশিক অথবা সম্পূর্ণ মুক্তিলাভ করেন, তো যতই সৎ উপার্জনে ও খালেস নিয়তে কোরবানি দিয়ে থাকুক, তার কোরবানি আর সঠিক থাকবে না।

দুনিয়াবি কোনো ফায়দা হাসিলের বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্যে কোরবানি দেওয়া এবং কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিলি-বণ্টন করা হলে তা আর কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না। কোরবানি হতে হবে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মতো ত্যাগের অপার মহিমায় কেবল মহান আল্লাহ তায়ালাকে রাজি-খুশি করার প্রত্যাশায় এবং সেই সঙ্গে জবাই বা নিধন করতে হবে নিজের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অকল্যাণকর অদৃশ্য হিংস্র পশুর দল। তবেই পূর্ণতা পাবে কোরবানির মাহাত্ম্য। সত্যিকারের ঈদময় হবে কোরবানির ঈদ!

মো. রাহামত উল্লাহ্‌ : লেখক ও অধ্যক্ষ
পূর্ব প্রকাশ> কালের কন্ঠ, ২৬ অক্টোবর ২০১২