ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে হাতের সম্পর্ক ওতপ্রোত। সকল ধর্মেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা একটি মহৎ কাজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পবিত্রতার পূর্বশর্ত। ইসলাম ধর্ম মতে, এটি ঈমানের অঙ্গ। হাত ধোয়ার মাধ্যমেই মুসলমান শুরু করেন ওজু, গোসল, খাওয়াসহ অনেক কাজ। শারীরিক ও মানসিকভাবে পবিত্র হওয়ার জন্য, পবিত্র থাকার জন্য, পবিত্র রাখার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। যার প্রথম ধাপ হচ্ছে হাত ময়লা মুক্ত করা। হাত ধোয়া বা সাফ করার গুরুত্ব অপরিসীম ছিলো।

মাসখানেক আগে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব-হাত-ধোয়া-দিবস। এ দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে- বৈশ্বিক ও স্থানীয় সংস্কৃতিতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সোয়াইন-ফ্লু, বার্ড-ফ্লুসহ চক্ষু ও ত্বকের ইনফেকশন প্রতিরোধ করা। শুধু পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা যায় না হাত। সাবান ও পানি দিয়ে সঠিকভাবে দু’হাত ধুয়ে প্রায় ৫০ ভাগ ডায়রিয়া ও ২৫ ভাগ নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণী থেকে অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নরত প্রায় ১কোটি ৮০ লাখ শিশু-শিক্ষাথর্ী একই সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয়ার মাধ্যমে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পর পর দু’বার স্থান করে নিয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড গ্রিনেজ বুকে’। হারিয়ে দিয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশকে। অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের শিশুরা সফল। তারা আবারো প্রমাণ করলো সঠিক হাতেখড়ি ও দিক-নির্দেশনা পেলে ‘আমরাও পারি’। ২০১০ সালেও হয়ত অটুট থাকবে আনুষ্ঠানিক হাত ধোয়ার রেকর্ড। কিন্তু একবার হাত ধুয়ে কি সারা বছর প্রতিরোধ করা যাবে উলিস্নখিত রোগ ? নিশ্চয়ই না। এসব রোগ থেকে কম/বেশি মুক্ত থাকতে হলে সাবান ও পানি দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত-মুখ ধুতে হবে প্রতিদিন, প্রতিবার খাবার আগে ও পরে, শৌচ করার পরে, বাইরে থেকে এসে, কাজের শুরু ও শেষে, খেলাধুলার পরে এবং যখন যখন প্রয়োজন। হাত ধুতে হবে বার বার। অভ্যাসে পরিণত করতে হবে এই হাত ধোয়া। মনে রাখতে হবে, শিশুরা আচরণ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ বাহক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড়দের অনুসরণ করে তারা। তাই এ কাজে আগে হাত আসতে হবে বড়দের।

সঠিকভাবে হাত ধোয়া আমাদের অভ্যাসে পরিণত হলে উপকৃত হবে সবাই। যদিও ছোটদের মত বড়দের হাত ধোলাই/পরিষ্কার করা এত সহজ নয়। কেননা দৃশ্যমান হাতের বাইরেও অনেক বড়দের থাকে নানা রকম হাত। আমাদের সেসব অদৃশ্য পাকা হাতের থাকে বিচিত্র কারসাজি। তখন পাল্টে যায় হাতের অর্থ। শুধু বাহু বা হস্তে সীমাবদ্ধ থাকে না হাত! যেমন: ‘হাত চলা’- হাত দিয়ে প্রহার করা। বিশেষ করে পান থেকে চুন খসলেই নিষ্পাপ শিশুদের, শিশু-শ্রমিকদের, শিশু-শিক্ষার্থীদের উপর চলে অনেকের নিষ্ঠুর হাত। ‘হাতজোড়’ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেও নির্যাতন থেকে রেহাই পায় না অবুঝ শিশুরা। অসহায় নারীদের উপর পড়ে ‘লোলুপ হাত’- এর কালো ছায়া। ‘হাতে-পায়ে’ ধরেও এই ‘শকুনের হাত’ থেকে রক্ষা করা যায় না সমভ্রম। দুর্বলের উপর প্রতিনিয়তই চলে ‘সবলের হাত’। অবলীলায় কেড়ে নেয় অসহায় দুর্বলের ‘হাতের পাঁচ’ বা শেষ সম্বল। কিছুই করার থাকে না বেচারার। কেননা অনেক ‘লম্বা হাত’ সবলের। ‘হাতেনাতে’ ধরা পড়লেও ‘হাতকড়া’ পড়ে না সেই হাতে।

বৈধ/অবৈধ যা-ই হোক সম্পদ-সম্পত্তি ‘হাত করা’ই লোভীদের প্রধান টারগেট। অভিনয়ে ‘হাতপাকা’ হলেও তাদের হাত যেন সাক্ষাৎ ‘চিলের থাবা’! ‘হস্তগত’ সম্পত্তি ‘হাতছাড়া’ হলে অনেক কিছুই করতে পারে তারা। টাকা-পয়সা ‘হাতের ময়লা’ হলেও ঘুষের টাকা না দিলে অনেকেই খুলে না ‘হাতের প্যাচ’।

অন্যের সুখে-শান্তিতে ‘হাত দেওয়া’ হিংসুটে মানুষের স্বভাব। কারো উপকার করার দায়িত্ব ‘হাতে নেওয়া’ তাদের নীতিতে নেই।

বাঘের হাতের চেয়েও হিংস্র খুনির ‘রক্তাক্ত হাত’।

সিংহের নখরের চেয়েও ভয়াবহ ‘সন্ত্রাসী হাত’।

হায়েনার চেয়েও অমানবিক কালোবাজারির ‘কড়াল হাত’।

অনেক উপরে ‘হাত রাখে’ অশুভ কার্যকলাপে লিপ্ত এসব অমানুষের ‘কালো হাত’। কী দিয়ে ময়লা মুক্ত করা যাবে আমাদের সমাজের এত ‘কয়লাযুক্ত হাত’ ? যেসব হাতের মহামারি জীবাণুর আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত আজ আমাদের সমাজ। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন আমাদের দেশ। না, এভাবে চলতে পারে না। অবশ্যই জাগ্রত করতে হবে আমাদের বিবেক। নিতে হবে এমন পদক্ষেপ যাতে সেক্সপিয়রের ওথেলোর মত বিবেকের তাড়নায় বার বার ধুতে হয় আমাদের হাত। অন্যথায় কোনভাবেই পূত-পবিত্র রাখা যাবে না, গ্রিনেজ বুকে স্থান পাওয়া আজকের ও আগামী দিনের নিষ্পাপ শিশুদের হাত আর মন।
[ লেখক :কলেজ শিক্ষক]
পূর্ব প্রকাশ> দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ নভেম্বর ২০১০