ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অবরোধ শব্দের অর্থ বা প্রতিশব্দ হচ্ছে- প্রতিরোধ, গতিরোধ, বাধাদান, বিরত রাখা, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ইত্যাদি। যার ইংরেজি শব্দ Blockade, Blockading, Barricaded, Barricading. আর পিকেটিং (Picketing- The activity to stop/prevent people from doing job.)শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে- লোকজনকে কাজে বাধাদান করা। এই দুটি কাজই এক কথায় অগণতান্ত্রিক। কেননা বৈধ কাজ করার অধিকার থেকে কাউকেই বিরত রাখা কোনো যুক্তিতেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। শিক্ষার্থীকে লেখাপড়া করায় বাধাদান, শ্রমিককে উৎপাদন কর্মে বাধাদান, কৃষকের কৃষিপণ্য বিক্রয় তথা উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, যানবাহন ও পরিবহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও অগ্নিসংযোগ, মানুষকে চলাচলে বাধাদান ও হতাহত করা, দিনমজুরকে তার কর্ম থেকে বিরত রাখা, রোগীকে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ না দেয়া ইত্যাদি অপকর্ম যে শুধু অগণতান্ত্রিক তা-ই নয় বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

হরতাল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই সরকার আইন করে হরতাল বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু হরতালে পিকেটিংয়ের নামে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করা তো কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। রেলগাড়ি, বাস, ট্যাক্সি, রিকশা, অটোরিকশা, এম্বুলেন্স, অফিস, আদালত, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, শিক্ষালয়, শহীদ মিনার ইত্যাদিতে পেট্রল/কেরোসিন/গান পাউডার দিয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা, বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা, রেললাইন তুলে ফেলা, সেতুর পাটাতন খুলে নিয়ে যাওয়া, গাছ ও মাটি কেটে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া, মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখি হতাহত করাসহ এরকম অপকর্ম কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র বা বিবেকের বিধানেই সমর্থন ও ক্ষমাযোগ্য নয়। আমাদের দেশে হরতালকে কেন্দ্র করে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় যে পশু-পাখির শরীর, নিধন করা হয় যে গাছপালা, এগুলো তো কোনো দলের কর্মী-সমর্থক বা ভোটার না; গাছপালা তো অক্সিজেন দেয় সবাইকেই, কোটি টাকার সম্পদ বাংলাদেশ নামক আমাদের এই প্রিয় রাষ্ট্রেরই। যারা এসব অপকর্ম করছে তারা কি মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে বেশি অপরাধ করছে না? এসব অপরাধ তো মানবতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরোধী অপরাধ। হরতালে পিকেটিং নামে পরিচালিত এসব ভয়াবহ অপকর্মের কারণে দেশের মানুষ এখন ভীতসন্ত্রস্ত। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতি হরতালে পিকেটিংয়ের কারণে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। ব্যাহত হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন এবং আমদানি ও রপ্তানি। কর্মহীন থাকছে খেটেখাওয়া মানুষ। বন্ধ থাকছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্যাহত হচ্ছে পরীক্ষা ও লেখাপড়া। পিছিয়ে পড়ছে আমাদের সম্ভাবনাময় সন্তানরা, ব্যাহত হচ্ছে সব মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমন সব দিন খুঁজে হরতাল দেয়া হয় যেন হরতালেই শুধু নয় হরতালের আগে এবং পরে আরো কয়েক দিন বন্ধ থাকে দেশের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানিসহ সব মানুষের কাজকর্ম। দাবি-দাওয়ার পক্ষে জনসমর্থন প্রমাণ করা নয়; বরং যে দেশ ও মানুষের জন্য (?) রাজনীতি সে দেশ ও মানুষের সর্বাধিক অপূরণীয় ক্ষতি নিশ্চিত করাই যেন এই অবরোধ ও পিকেটিংয়ের মূল উদ্দেশ্য। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের ওপর চাপাতে চেষ্টা করছে এসব অপকর্মের ক্ষয়ক্ষতির দায়-দায়িত্ব। একে অপরকে দোষারোপ করেই শেষ করতে চাচ্ছে নিজেদের কর্তব্য। একজোটের প্রধান পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা দিচ্ছেন দেশ অচল করে দেবেন। গণতন্ত্র রক্ষার (?) জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের পরোক্ষ আহ্বান জানাচ্ছেন সামরিক বাহিনীকে! তার বক্তব্যে তিনি অনুচ্চারিত ভাষায় স্বীকার করে নিয়েছেন, দেশ এখনো সচল আছে। কমবেশি সচল এই দেশ অচল করে দেয়ার মানে কি এই নয় যে দেশের উৎপাদন ও আমদানি-রপ্তানিসহ সার্বিক অথনৈতিক কর্মকাণ্ড অচল করা, দেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অচল করা, দেশের কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য অচল করা, চাকরিজীবী শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিয়মিত বেতনভাতা অচল করা, খেটেখাওয়া মানুষের আয়-উপার্জন অচল করা, অর্থাৎ দেশের সব মানুষকেই অর্থনৈতিকভাবে এবং শারীরিকভাবে ল্যাংড়া লুলা আঁতুড় করে অচল করে দেয়া? তাহলে কার জন্য, কিসের জন্য এই রাজনীতি? পেট্রল বোমা গায়ে পড়বে তা জেনে-মেনে প্রত্যেককে এক কন্টেইনার করে পানি নিয়ে যদি বাসে চড়তে হয়; যেন শরীর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার আগে একটু পানি ঢালা যায় নিজের গায়ে এবং সেই সঙ্গে রাখতে হয় একটি করে গজারি কাঠের মোটা লাঠি; যেন সুযোগ পেলে পাকরাও করা যায় সন্ত্রাসী-বোমাবাজদের। তো কোথায় আমাদের গণতন্ত্র, কোথায় আমাদের সরকার?

আমাদের জানমাল ও আমাদের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ যেন আর অবশিষ্ট নেই এই দেশে। আমাদের ভোটের মূল্য থাকলেও জীবনের কোনো মূল্যই নেই তাদের কাছে! আমরা এখন অসহায় ও বেওয়ারিশ। নেই নিজের কাজকর্ম করে স্বাভাবিক জীবন ধারণের ন্যূনতম নিশ্চয়তা! আমরা কি এ দেশের নাগরিক নয়? আমাদের কি এতটুকু নাগরিক অধিকার নেই? সরকারদলীয় জোট বলছে, দেশের সব মানুষ তাদের মতামতের পক্ষে; আবার বিরোধীদলীয় জোট বলছে, দেশের সব মানুষ তদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে! অর্থাৎ এক পক্ষের মতে অন্য পক্ষে অবস্থিত দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫% থেকে ৪৫% সক্রিয় নেতা-কর্মী-সমর্থকের যেন কোনো অস্তিত্বই নেই! সাধারণ মানুষ তো অনেক দূরের কথা। সাধারণ মানুষসহ পরস্পরকে অবমূল্যায়নের এই চরম পরিস্থিতিতে আমাদের জানমাল প্রতিহিংসার শিকার হবে; আর একদল আমাদের বলবে- জীবন দিয়ে এই সরকার উৎখাত করুন, আরেক দল বলবেন- সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধী দলের এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করুন। আমরা পেট্রল বোমার আগুনে পুড়ব, মরব, মার খাব, আর নেতা-নেত্রীরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে গলাবাজি করবেন। জীবন-জীবিকার অতি প্রয়োজনে আমরা ঘরের বাইরে এলেই; এমনকি ঘরে থাকলেও জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে এক পক্ষ বলবে, দেশের সব মানুষ স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে হরতাল ও অবরোধ পালন করেছে। আরেক পক্ষ বলবে, কোথাও হরতাল ও অবরোধ হয়নি! যা হয়েছে তা পিকেটিং নামক সন্ত্রাস।

আপনারা দলীয় রাজনীতির স্বার্থে যে যাই বলুন না কেন, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের গুরুদায়িত্ব। সরকার বা সরকারদলীয় জোট যদি মনে করে, জানমালের এরূপ অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির জন্য মানুষ কেবল বিরোধীদলীয় জোটের ওপরই নাখোশ হবে তো সেটি ভুল ধারণা। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য তাদেরও মাসুল গুনতে হবে আগামীতে। চলমান চরম নৈরাজ্য প্রতিরোধে সরকার ও সরকারদলীয় জোটের নেতাদের সদিচ্ছা নিয়ে এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। হরতালের আগের দিন একদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা সংবাদ মাধ্যমে এসে বলছেন, যে কোনো প্রকার নাশকতা ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুত। আর অপরদিকে আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ আর হতাহতের উল্লাসে উন্মত্ত কতিপয় যুবক-যুবতী। প্রতিরোধের নামে কেবল মার খাচ্ছে পুলিশ। পকেট থেকে দাহ্য পদার্থ ও দিয়াশলাই বের করে গাড়িতে ছিটিয়ে দিয়ে আগুন লাগিয়ে ধীরেসুস্থে হেঁটে হেঁটে অপরাধী চলে যাচ্ছে নিরাপদে! দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার গাড়ি এবং মূল্যহীন মানুষ। সেই সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে জাতির বিবেক, দেশের গণতন্ত্র অর্থনীতি রাজনীতি সমাজনীতি এবং ধর্মনীতি। অবশেষে দমকল কর্মীসহ আগুন নেভাতে এসেছেন সেই সর্বোচ্চ প্রস্তুত সতর্ক পুলিশ। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একাধিক টেলিভিশনের ক্যামেরা পারসন এই অপকর্ম দেখতে পারে, ভিডিও করতে পারে, প্রচার করতে পারে, পুলিশ দেখতে পারে না কেন? ক্যামেরা পারসনের চেয়ে পুলিশের সংখ্যা তো আর কম নেই। তারা কি জেগে ঘুমাচ্ছে? সরকার কি পারে না প্রতি ক্যামেরা পারসনের আশপাশে দুয়েকজন করে এসব অন্ধ পুলিশকে দায়িত্বে নিয়োজিত রাখতে? তাহলে কি বিশ দলীয়দের কথাই সঠিক যে, সরকারের লোকরা এসব অপকর্ম করছে বলেই ধরা পড়ছে না?
দেশপ্রেমিক মানুষ এখন আর দেখতে চায় না বারবার আগুন জ্বালিয়ে, ভাঙচুর চালিয়ে, হতাহত করে অপরাধীরা চলে যাওয়ার পরে এসে পুলিশের এসব বিতর্কিত একশন। অথচ এসব ফৌজদারি অপরাধ দমনে পুলিশ সত্যিকারভাবে সক্রিয় হলে অন্যরকম হতে পারত এসব দৃশ্য। যেমন : (ক) মারছে, ভাঙছে, আগুন দিচ্ছে এবং পুলিশ হাতেনাতে ধরে এরেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে সেই অপরাধীকে। অথবা (খ) মারছে, ভাঙছে, আগুন দিচ্ছে আর সেখানেই তৎক্ষণাৎ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সেই অপরাধীরা এবং সেখান থেকেই এরেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের। এরূপ দৃশ্য দেখে জনগণ নিশ্চয়ই বলবে না যে পাখির মতো গুলি করে গণহত্যা করা হয়েছে। কেউ কোনো ইনটেনশন নিয়ে এমন কথা বললেও; অন্যরা এর জবাবে বলবেন- হ্যাঁ, এই পাখিটি পায়রা, ঘুঘু কিংবা আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল ছিল না বরং এটি ছিল অত্যন্ত হিংস্র বাজপাখি। তা ছাড়া আমরা বিভিন্ন টেলিভিশনের পর্দায় যাদের এরকম অপকর্ম করতে দেখছি দিনের পর দিন, তাদের গ্রেপ্তার করে সেসব অপকর্মের ফুটেজসহ বারবার দেখানো হচ্ছে না কেন টেলিভিশনের পর্দায়? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য উল্লিখিত এই দরকারি একশনগুলো নেয়ার সাধ্য তো আমাদের পুলিশের না থাকার কথা নয়। এমনটি করা গেলে নিশ্চয়ই নতুন করে আর কেউ সাহস পেত না যখন তখন এমনভাবে মারো কাটো জ্বালাও-পোড়াও করার জন্য। পুলিশকেও আর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে হতো না মিছিলে। মরতো না কোনো নিরপরাধ মানুষ। নিতে হতো না তথাকথিত গণহত্যার অভিযোগ। রক্ষা পেত আমাদের জানমাল। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে অবরোধ ও পিকেটিং বিরোধী কঠোর আইন করে পুলিশকে দিতে হবে সেরূপ ক্ষমতা। সরকারি জোটের নেতাদের মনে যদি এমন প্রতিজ্ঞা থাকে যে, কোনোদিন বিরোধী জোটে গেলে তারা হরতাল অবরোধের নামে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এমন সব অপকর্ম করবেন না, তবেই তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কঠোর আইন করে এরকম অবরোধ ও পিকেটিং বন্ধ করা। আমরা আশা করি তারা তা পারবেন।

মো. রহমত উল্লাহ্‌

ভোরের কাগজ > সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০১৫, http://www.bhorerkagoj.net/