ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

অশ্রুকণা দাশ

স্বপ্ন দেখতে কে না ভালবাসে…! এই স্বপ্ন পূরণের আনন্দ, শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, আত্মিক আনন্দের উর্ধ্বে।

মানুষ বাস্তবে যা চিন্তা করে, তা কখনও হুবহু কিংবা আংশিকভাবে অবচেতনমনে ধরা দেয়… মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়, অনাগত কঠোর বাস্তবের প্রতিচ্ছায়াও থাকে এই স্বপ্নে।

আজ লিখতে বসেছি এমন একজন মানুষকে নিয়ে, যিনি এই ধরাধামে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন তাঁর স্বপ্নের বাস্তব রূপ রূপায়নে।

যখন যে কর্তব্যটি স্কন্ধে এসে পড়েছে, তাকে ফেলে না দিয়ে, সহিষ্ণুভাবে বহন করেছেন। একদিকে ছিলেন পরিবারের কান্ডারি, অপরদিকে সততার সাথে পালন করে গেছেন পেশাগত দায়িত্ব, আবার খ্রিষ্টিয়ান সমাজে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

মোটা দাগে চিন্তা করলে তাঁর ব্যস্ততার ক্ষেত্র ছিল মূলতঃ তিন ভাগে বিভক্ত… পরিবার, পেশা এবং সমাজ। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত নেশা ছিল তাঁর স্বপ্ন পূরণের “পেশা”।

তাঁর কাছে আবেগের দাবি এবং চিন্তার দাবি দুই-ই ছিল প্রবল।

তিনি হচ্ছেন, “স্বর্গতঃ অশ্রুকণা দাশ”।

ইন্দ্রিয়চালিত একজন মানুষ। রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। তাঁরও অন্য আর দশটা মানুষের মতো মানবীয় সীমাবদ্ধতা ছিল। ছিল লোভ, ছিল হিংসা, ছিল ক্ষুদ্রতা, ছিল মহত্ব, ছিল ভালবাসা, ছিল প্রেম। ছিল প্রশংসনীয় মানবীয় গুণাবলী এবং সেই সাথে সাথে নিন্দাযোগ্য অগুণাবলীও।

পাঠক আসুন জেনে নেই অশ্রুকণা দাশ সম্পর্কে…

অশ্রুকণা দাশ ১৯৪৫ সালের ২৫ মার্চ বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় জন্মগ্রহন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবন শুরু করেন শাহীন স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে, পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন।

কি ছিল অশ্রুকণা দাশের স্বপ্ন…?

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঞ্চিত হত দরিদ্র নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

এ দেশের নিপীড়িত-নিগৃহীত নারীসমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্রত নিয়ে তিনি শিক্ষকতা পেশাকে বিদায় জানিয়ে ১৯৭২ সালে যোগ দেন বঞ্চিত হত দরিদ্র নারীদের সেবায় নিয়োজিত ওয়াইডাব্লিউসিএ নামক ছোট পরিসরের একটি বেসরকারি সংগঠনে। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ ইয়াং উইমেন্স খ্রীষ্টিয়ান এসোসিয়েশন (ওয়াইডাব্লিউসিএ)-এর প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

তাঁর এই স্বপ্ন পূরণের সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন মিসেস রীনা দাস, মিসেস সবিতা ডি কস্তা…, সেই সাথে আরও অনেককে।

প্রচারবিমুখ এই নারী বাংলাদেশের নারী ও শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এ মানবাধিকার সংরক্ষণে রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান। আর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশে বিদেশে সম্মানিত হয়েছেন নানাভাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য “World YWCA Leading Women Change 2003 Award.”

২৪ জুলাই ২০০৬ সালে অশ্রুকণা দাশ সময়ের হাত ছেড়ে চলে গেছেন এই ধরাধাম থেকে।

সৃষ্টির নিয়ম অনুসরণে প্রত্যেকেই তাঁর জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে এলে সময়ের হাত ছেড়ে দিয়ে গত হয় এই ধরাধাম থেকে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না, বয়ে চলে আপন গতিতে, সেই সাথে বয়ে নিয়ে চলে হাত ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর কর্মকে।

সময়ের প্রয়োজনে নতুনেরা এসে পুরাতনের কর্মকে বেগবান করার লক্ষ্যে বহমান বাতাসে নিজ নৌকার পাল তুলে দেয়।

পুরাতন আর নতুনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নারীদের-সেবার স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তোলা ওয়াইডাব্লিউসিএ নামক ছোট পরিসরের ছোট্ট সংগঠনটি এখন পরিণত হয়েছে মহীরুহে।

পূর্বসূরীদের স্বপ্নের রস আস্বাদন করে নতুনেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের মেধা আর মননের ছোঁয়ায়, পূর্বসূরীদের কর্মের বর্ধিত বাস্তব রূপ রূপায়নের।

ওয়াইডাব্লিউসিএ-র পূর্বসূরী স্বপ্নদ্রষ্টাদের অধিকাংশই গত হয়েছেন। কেউ কেউ রোগাক্রান্ত। অনেকেই বয়সের ভারে মেরুদণ্ড ভেঙ্গে অষ্টাবক্রের মতো বেঁকে চুরে গেছেন।

কিন্তু গিরিশিখরে স্বপ্ন যে গিরিশিখরে আবদ্ধ নহে! তাইতো এর জলপ্রপাত দুই তীরবর্তী ক্ষেত্রগুলিকে ফলবান্ করার স্বপ্ন নিয়েই জনস্থানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই জলপ্রপাত প্রতিনিয়ত তৈরী করে চলে স্বপ্নের নতুন নতুন শাখা
প্রশাখার। সাময়িক বাঁধার সৃষ্টি হলেও, তার চলা কিন্তু থেমে নেই…।

অশ্রুকণা দাশ এবং তাঁর সহযাত্রীদের বাস্তবায়িত কর্মের “পবিত্র আলো” আজ ছড়িয়ে পড়েছে লক্ষ লক্ষ নারীর মাঝে। বাস্তবতার কষাঘাতে, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা ক্ষয়ে যাওয়া, অক্ষম হত দরিদ্র নারীদের মাঝে সৃষ্টি করেছে “স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষমতা”।

এক সময়ের বঞ্চিত হত দরিদ্র নারীরাই এখন এক একজন “স্বপ্নদ্রষ্টা”।

এই স্বপ্নদ্রষ্টারাই প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করছে স্বপ্নের নতুন নতুন শাখা প্রশাখার। জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন স্বপ্নের।

অশ্রুকণা দাশের উত্তরসূরী স্বপ্নদ্রষ্টাদের পবিত্র স্বপ্নগুলো বাস্তবে আরও বিস্তৃতি লাভ করুক এই কামনা করি।

ওয়াইডাব্লিউসিএ-র সাথে জড়িত সকল সদস্যকে শুভেচ্ছা।

আগামী ২৪ শে জুলাই অশ্রুকণা দাশের মহাপ্রয়ান দিবস। সবাই গভীর শোক, শ্রদ্ধা এবং ভালবাসায় তাকে স্মরণ করছি।