ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

তখন সবেমাত্র এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। ময়মনসিংহ শহরের আর দশটা সাধারণ পরিবারের একটি ছেলের সাধারণ স্বপ্নের মতো আমার চোখেও স্বপ্ন, ঢাকার কোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার।

শুরু হল দল বেঁধে বন্ধুদের সাথে ঢাকায় আসা যাওয়া। এরই মাঝে একদিন উপস্থিত হয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অচেনা কার্জন হল প্রাঙ্গনে।

কার্জন হলের পুরানো আমলের লাল রঙ্গা বাড়িগুলো স্থাপত্যকলার বিচারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও, আমাকে তেমন আকর্ষণ করে নি। কারণ আমার চোখ তখন খুঁজে বেড়াচ্ছিল একজন মানুষকে। আগেই জানা ছিল, এই প্রাঙ্গনেই কাংখিত মানুষটির নিত্য আসা যাওয়া। তিনি হচ্ছেন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

মনে হচ্ছিল, ‘এই মুহূর্তেই বুঝি আমি মুখোমুখি হব জনপ্রিয় সেই মানুষটির!’ কিন্তু প্রথমদিন সেই আশা পূরণ না হওয়াতে খুব আশাহত হয়েছিলাম।

এরপর বেশ অনেকদিন পার হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছি কার্জন হলে। ইতোমধ্যে স্যারের দেখাও পেলাম। এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরী হল। আরও কাছাকাছি যাওয়ার সু্যোগ খুঁজতে লাগলাম!

আমার কয়েকজন বন্ধু শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিল। ওদের কাছ থেকে জানতে পারলাম স্যার শহীদুল্লাহ হল লাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন।

আমার কী হল জানি না! মাঝে মাঝে শহীদুল্লাহ হলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে থাকা শুরু করলাম। শহীদুল্লাহ হলের টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, কী এক আকর্ষণে প্রায়ই স্যারের বাসাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম! বন্ধুরা দুষ্টামি করে বলত, ‘কিরে, স্যারের মেয়েকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস!’

আমি ‘হাসতাম!’

দর্শন আগেই হয়েছিল, কিন্তু পরিচয় হয়েছিল বেশ অনেকদিন পর। অদ্ভুত এক ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সাথে প্রথম পরিচয়, অনুভূতিটাও ছিল অদ্ভুত। অবশেষে সুযোগ হল তাঁর খুব কাছে থেকে মোহিত হয়ে তাঁর কথাগুলো শোনার। গুরুশিষ্যের মতো এক সম্পর্ক গড়ে উঠল। তাঁর সংস্পর্শে এসেই শিখেছিলাম সবকিছুকে একটু অন্যভাবে, অন্যচোখে দেখার। শিখেছিলাম আরো অনেক কিছুই।

স্যারের মায়ার মোহের জালে জড়িয়ে কেটে গেল অনেকগুলো বছর। হতে হল অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি। এক সময় ছিন্ন হল বন্ধন। সঙ্গি হল শর্তের কঠিন অবিচ্ছিন্ন জাল!

হারাতে হল অনেক কিছু। অপ্রকাশিত রয়ে গেল জীবনের একটি অধ্যায়। অস্বস্তি হল নিত্য সঙ্গি। বাস্তব জগত হয়ে উঠল জটিল। জীবনটা হয়ে গেল টালমাটাল।

এরপর আর যোগাযোগ করা হয়নি। সত্যি বলতে, শর্তের বেড়াজালে ইচ্ছে করেই মুখোমুখি হই নি।

প্রথম আলো পত্রিকায়, স্যারের অসুস্থতার সংবাদ নিয়মিত পড়ছিলাম। আজ জানতে পারলাম স্যার সময়ের হাত ছেড়ে চলে গেছেন।

সৃষ্টির নিয়ম অনুসরণে প্রত্যেকেই তাঁর জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে এলে সময়ের হাত ছেড়ে দিয়ে গত হয়, এই ধরাধাম থেকে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না, বয়ে চলে আপন গতিতে, সেই সাথে বয়ে নিয়ে চলে হাত ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর কর্মকে।

শত বাঁধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমি শর্ত ভঙ্গ করি নি।

আজ স্যার মুক্ত। আজ মুক্ত আমি, স্যারের মায়ার মোহের জাল থেকে।

কঠিন শর্তের জালে আবদ্ধ আমি যখন জীবনের মানে খুঁজে বেড়াচ্ছি, খুঁজে ফিরছি মুক্তির সন্ধান, তখন স্যার নিজেই হারিয়ে গিয়ে সেই শর্তের জাল ছিন্ন করে মুক্তির সন্ধান দিয়ে গেলেন আমায়।