ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

ক্যান্সার রোগটি দেহে ধারণ করার দুর্ভাগ্য এখন পর্যন্ত না ঘটলেও, ক্যান্সারের সাথে বসবাস করে হেরে যাওয়া খুব কাছের একজন মানুষকে টানা দু’টি বছর খুব কাছ থেকে দেখার এবং তাঁর কাছাকাছি থাকার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল।

কেমোথেরাপি, ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষটির দৈহিক এবং মানসিক পরিবর্তন, কষ্ট সহ্যের মাত্রা অতিক্রম, মানুষটিকে নিয়ে বিদেশ যাত্রা, চিকিৎসকদের হীন মনোবৃত্তির কারণে আক্রান্ত মানুষটির সাথে থাকা অন্যান্যদের শূন্য দৃষ্টি, চিকিৎসার ব্যয়ভারের ওজন… সবই আমার নখদর্পনে।

আমি হলফ করে বলতে পারি, ক্যান্সারে আক্রান্ত কোনো মানুষের কাছাকাছি থাকার মত দুর্যোগ ঘটলে অল্পদিনেই যে কেউ এই রোগের ভোগান্তি গুলোর বিষয়ে মোটামুটি একজন ক্ষুদে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারবেন।
বেশ কয়েকদিন ধরেই পত্র-পত্রিকায় হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কিত সংবাদগুলো পড়ছি। আমার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল বিধায় উনার সব ব্যাপারেই আমার আগ্রহটা একটু বেশি। তার উপর উনি আক্রান্ত হয়েছিলেন ক্যান্সারে। তাই একজন ক্ষুদে “ক্যান্সার-ভোগান্তি” বিশেষজ্ঞ হিসেবে, উনাকে নিয়ে লেখাগুলো পড়ার আগ্রহ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান, কেমোথেরাপি, অপারেশন, চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্র বিমান বন্দরে শাওনের বক্তব্য, প্রথম শ্রেণীতে বিমান ভ্রমনবিলাস, একই বিমানের জনৈক যাত্রি কর্তৃক বিবৃত বিমানের ভিতরে শাওনের কার্যকলাপ, কবর নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ, নুহাশ পল্লী, নোভা, শীলা, বিপাশা, নুহাশের অভিব্যক্তি, জাফর ইকবালের অসহায় আর্তি, এমপি সাহেবদের লম্ফঝম্প, সহায়-সম্পত্তি, ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা (বর্তমানে আমি নিজেও এই ধরণের একটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি), অন্যপ্রকাশ, মাজহার ইস্যু (উনার এক ভাই আমার বন্ধু হওয়াতে আগ্রহের মাত্রাটা একটু বেশি), গুলতেকিন এর দেশে আগমন, স্মরণ সভায় যোগদান, ইতিবাচক-নেতিবাচক আরও কত বিষয়…।

হুমায়ূন আহমেদ’কে নিয়ে অন্যদের লেখাগুলো এখন যেমন মনোযোগ সহকারে পড়ছি, একসময় তাঁর নিজের লেখাগুলোও মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছিলাম। তাঁর পরিচালিত নাটক, চলচ্চিত্র কিছুই পারে নি আমার নজর এড়াতে। তাঁর তৈরি প্রায় প্রতিটি চরিত্র এখনো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোনটা রেখে কোনটা বলি:

তরুণ প্রজন্মের আকর্ষণ “হিমু”, যুক্তিবাদী অতি মানব “মিসির আলী”, রাজপথে মানুষকে টেনে নামানোর দুর্লভ ইতিহাসের জন্ম দেওয়া চরিত্র “বাকের ভাই”, স্বপ্নবাজ কানাবাবা “শুভ্র”, ফুর্তিবাজ পাগলাটে “মামা”, মায়বতী মেয়ে “কঙ্কা”, ‘আজ রবিবার’ নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র আনিস, ধারাবাহিক নাটক ‘সবুজ সাথী’ –এর লাঠিওয়ালা পাগলা মফিজ, এ ছাড়াও রয়েছে মাজেদা খালা, টুনি, বাদল, সাদেক আলী, পল্টু…।

যখন যে চরিত্রটি সামনে এসেছে, প্রায়ই নিজেকে সেই চরিত্রটির সাথে মিলিয়ে দেখতে, ভাবতে চেষ্টা করেছি। কল্পনা বাস্তব মিলে প্রায়ই হত একাকার।

তিনি ছিলেন কথার যাদুকর। তাঁর বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে তারা তাঁর এই গুণটি অকপটে স্বীকার করে থাকেন।

এত ভালো, এত ভালো, সব ভালো! আমিও সবসময় লিখতে গিয়ে ভালোর মাঝে ভালো’কেই তুলে আনার চেষ্টা করি। শুরুও করি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কিন্তু আমি স্বভাবগতভাবে নেতিবাচক মানসিকতার একজন জীব। তাই হয়ত লিখতে লিখতে ইতিবাচক বিষয়বস্তুর মাঝে লুক্কায়িত নেতিবাচক বিষয়বস্তুর অবস্থান আমার দৃষ্টিগোচর হয়, কিঞ্চিৎ পীড়াও দেয়।

কারো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো উচিত নয় বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু মানুষটি যখন তুমুল জনপ্রিয় এবং তাঁর উপস্থিতি অনেকের কাছে আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাঁর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক ঘটনাগুলো মানুষের মনে দাগ কাটে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই।

চারিদিকে যখন লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময় তিনি বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন গুলতেকিন এবং চার ছেলেমেয়ের সাথে। সংযোগ ঘটিয়েছেন শাওনের সাথে। জীবন তো একটাই, তাই হয়ত এই ইচ্ছাপূরণে ব্রত হয়েছিলেন।

উন্মুক্ত মনের মানুষই পারে সমাজের সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে দৃঢ় চিত্তে স্বীয় উদ্দেশ্যকে সফল করতে সবকিছুকে অবজ্ঞা করতে। উন্মুক্ত মনের হুমায়ূন আহমেদ এবং শাওন তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বীয় লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিলেন। ন্যায় কিংবা অন্যায়? এই ব্যাপারে আমি কোন তর্কে যাব না। একান্ত ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয়!

হুমায়ূন আহমেদ তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন পাঠককুলের কাছে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। যদিও তাঁর লেখনীর সাহিত্য মূল্য নিয়ে রয়েছে তর্ক বিতর্ক। তিনি তাঁর জাদুকরি কলমের ছোঁয়ায় জনপ্রিয় করে গেছেন কল্পরাজ্যের অনেক চরিত্র।

কিন্তু তিনি কি সফল হয়েছেন, একজন আদর্শ পিতার চরিত্র রূপায়নে? তাঁর লেখনীতে বা বাস্তব জীবনে?

পিতার চরিত্র রূপায়ন করতে গিয়ে তিনি নিজেই লিখেছেন, “আমার তিন কন্যাই দূরদ্বীপবাসিনী। ওরা এখন আমাকে চেনে না, হয়ত আমিও তাদের চিনি না।”

জীবন পরিক্রমায় কারো কারো সম্পর্কে ছেদ পড়তেই পারে। সম্পর্কের যবনিকা টেনে স্বামী তার স্ত্রী-সন্তান’কে তাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বলে কি সংসারের অন্য সবাই সেই ক্ষতিগ্রস্তার বা তাঁর সন্তানদের সাথে সম্পর্কের যবনিকা টেনে দিবে? এই কী মানবিকতা…?

আমাদের সমাজ-সংসারে কিন্তু অহরহ এই ঘটনাই ঘটছে। স্বামী বা ছেলেটির দ্বারা আঘাতে জর্জরিত মেয়েটির সাথে একসময় ছেলেটির পরিবারের সবাই সমস্ত সম্পর্ক/বন্ধন এর যবনিকা টেনে দেয়। আর ছেলেটি যদি হয় যশ-খ্যাতি সম্পন্ন, তাহলে তো কথাই নেই। সব দোষ মেয়ের ঘাড়ে ফেলে দিয়ে ছেলেটি হয় যায় ধোঁয়া তুলসিপাতা।

আয়েশা ফয়েজ, জাফর ইকবাল এবং এই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। হুমায়ূন আহমেদ এত যশ-খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও পরিবারের কেউ তার পথ অনুসরণ করেন নি।

একদিকে আমরা সবাই যখন হুমায়ূন আহমেদে’কে নিয়ে বা তাঁর লেখনীতে কল্পজগতের তৈরি করা চরিত্রগুলো অনুসরণ বা অনুকরণে ব্যস্ত, তখন অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদের মা-ভাইয়েরা, হুমায়ূনের সৃষ্ট ফেলে দেওয়া বাস্তব চরিত্রগুলো: নোভা, শীলা, বিপাশা আর নুহাশ’কে নিয়ে ব্যস্ত।

হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশায় যাদেরকে ফেলে দিয়েছিলেন, তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, সেই ফেলে দেয়া নোভা, শীলা, বিপাশা, নুহাশকে নিজেদের কাছে টেনে নিয়ে পথ চলেছেন…!

তাইতো নোভা, শীলা, বিপাশ, নুহাশ-কে দেখা যায় তাদের দাদীর পাশে, জাফর ইকবাল স্যারের পাশে- মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।

এতকিছুর পরও দেখি স্বামী কর্তৃক “উক্ত/অনুক্ত” শেষ আশা পূরণের নামে হিমঘরে লাশ ফেলে রেখে, অধিকারের দোহাই দিয়ে, উন্মত্তের মত কেউ আদালতে যেতে চায়…

আবার কেউ কেউ নিজেদের অধিকারকে তুচ্ছ করে, লাশকে ভালবেসে, শ্রদ্ধা প্রদর্শনে সমস্ত দাবি মেনে নেয়…

তখন, একটি প্রশ্ন নিজ প্রয়োজনেই উত্তর বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে …

কী ধরণের মানসিকতা চাই?
উন্মুক্ত মানসিকতা
উন্মত্ত মানসিকতা
উন্নত মানসিকতা

মানুষ গত হয়ে গেলেও তাঁর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক কর্মগুলো রয়ে যায়। গত হয়ে যাওয়া মানুষটির জন্য আমরা শুধু দোয়া করতে পারি। হুমায়ূন আহমেদের আত্মা স্বর্গবাসী হোক এই কামনা করি, সেইসাথে তাঁর এবং তাঁকে নিয়ে ঘটিত কর্মকাণ্ডের বাস্তব উপন্যাস এবং চরিত্র গুলো থেকে শিক্ষা নেয়াটাও অপরিহার্য বলে মনে করি।