ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

সম্প্রতি রামুতে ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনা এবং এর পরবর্তি সংবাদ গুলো নিয়মিত পড়ছি। ছোট বড় রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের অপরকে দোষারোপের পুরানো কৌশল প্রয়োগের খেলা দেখছি।

আমজনতার প্রতিবাদের স্বরূপের বিভিন্নতা লক্ষণীয়। কয়েক মিনিটের ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ থেকে শুরু করে… ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি কালো করে দেয়া সবই চলছে। প্রতিবাদের স্বরূপ নিয়েও পক্ষ বিপক্ষ রয়েছে। সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই। সংবাদপত্র, ব্লগ, ফেসবুক সব জায়গাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত লেখালেখি।

‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ নামের ধর্মীয় অনুভুতিতে সুড়সুড়ি প্রদানকারি কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও চিত্রকে কেন্দ্র করে যখন লিবিয়া, ইয়েমেন, মিসরসহ মুসলিম বিশ্ব বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে উত্তাল, ঠিক সে সময় বাংলাদেশ তুলনামূলক ভাবে ছিল শান্ত। যদিও বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে ভিডিও চিত্রটি নিয়ে। দেশের সবাই যখন বুদ্ধিদীপ্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই ঘটল রামুর ঘটনাটি।

রামুতে লঙ্কাকাণ্ড ঘটানোর পিছনের অভিযোগটি বা যুক্তিটি নিয়ে ভাবছিলাম। এ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ পড়ে যা জানতে পারলাম তা হল, ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামক এক বাংলাদেশের নাগরিক পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ছবি ফেসবুকে তার নিজের দেয়ালে যুক্ত করে (অনেকে বলছেন অন্য কেউ যুক্ত করে দিয়েছে) ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি প্রদান করেছে, আঘাত হেনেছে। এতে ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে। তাই সময়ক্ষেপন না করে এর প্রতিশোধ নিতে হবে।

ধর্মের মান নিয়ে কথা, তাই অন্যায়কারির ধর্মে আঘাত করার মাধ্যমেই নিজের ধর্মের মান রক্ষা করতে হবে। অঙ্ক কষার বিষয়টি সহজ করে দিল অন্যায়কারির নামের শেষের অংশটুকু “বড়ুয়া”। সহজেই বোঝা গেল সে কোন ধর্মাবলম্বী। শুরু হয়ে গেল রামুতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি মন্দির ভেংগে পুড়িয়ে দেয়ার এই মহৌৎসব। পরিণামে কাঠ কয়লার মাঝে গৌতম বুদ্ধের ভেঙ্গেচুড়ে যাওয়া পোড়া মূর্তি… কোথাওবা কাত হয়ে… আবার কোথাওবা সোজা বসে ধ্যানে মগ্ন… সেই সাথে তাঁর আরাধনাকারী কিছু অসহায় শুন্য দৃষ্টি।

উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুক দেয়াল বা কোন ছবিটি দেয়ালে দেয়ার ফলে এই শাস্তির ঘোষণা, সে ছবিটিও আমি দেখি নি। আমি কোনো ধর্মের অবমাননার পক্ষে নই। ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানে এমন ছবি পোষ্ট করা থেকে সবারই বিরত থাকা উচিত।

তবে তর্কের খাতিরে না বলে পারছি না, মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহনকারি কোনো “নাস্তিক” যদি ইসলাম ধর্ম অবমাননাকারি কোন ছবি তার ফেসবুক দেয়ালে দিত, সেক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেওয়ার সমীকরণটা কী হত? এক ধর্মকে আঘাত করে আর এক ধর্মের মান রক্ষার সমীকরণটি কী হাস্যকর নয়?

প্রশ্ন থেকে যায়, এই ধবংসের মহৌৎসবে অংশগ্রহনকারী কতজন ফেসবুক ব্যবহারকারি ছিল? কতজন উত্তম বড়ুয়ার দেয়ালে ঢু মেরে ঐ ছবিটি দেখেছে?

পাশাপাশি প্রশ্ন জাগে, উত্তম বড়ুয়ার জনপ্রিয়তা নিয়ে। তার ফেসবুক দেয়াল কতটা জনপ্রিয় যে তার দেয়ালে প্রকাশিত একটি ছবি এত বড় ঘটনা ঘটাতে পারে?

একটি ছবি এত বড় ধবংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়।

একটি ছবি বা ভিডিওচিত্র যেমন ধর্মের মান ক্ষুন্ন করতে পারে না, তদ্রুপ অন্যের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত নিজের ধর্মের মান রক্ষার হাতিয়ার হতে পারে না।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ যেমন তার জীবন যাত্রায় অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে তেমন এর অপব্যবহারের ফল ও কিন্তু কম নয়।

ধর্মীয় অনুভুতিতে সুড়সুড়ি প্রদানে, উত্তেজনা বৃদ্ধি করে জনসাধারণের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লুটে নেওয়া ইন্ধনদাতাদের সন্ধান করে আইনের অধীনে যথাশীঘ্রসম্ভব বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক।

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বর্তমান আইন সময়োপোযোগী করে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক। আসুন আমরা আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করি, ওয়েবসাইটে, ফেসবুকে বা অন্যকোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর, ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারী বা উস্কানি প্রদানমূলক পোষ্ট প্রদান করা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখি।