ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

কী দেখছি-বলছি-করছি-শুনছি!

তারকা কথন
১।
সম্প্রতি বাংলা সিনেমার এক নায়কের উচ্চারণ সমস্যা থেকে সৃষ্ট কিছু বাক্য নিয়ে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি কত ধরণের আলোচনা করা যেতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র, ফেসবুক, ব্লগ সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে আলোচনায়। কেউ একজন দুঃখ করে বলেছিলেন এই দেশের শিল্পিরা যদি হাসে তাতেও ভুল ধরে, অথচ বিদেশী শিল্পীদের পায়খানা যদি বয়ামে ভরে স্টেডিয়ামে রাখা হয় তা দেখার জন্য টিকিট কিনে লাইনে দাড়াবে। এই হলো আমাদের দেশে তথাকথিত আধুনিক মানুষের মানসিকতা।

২।
সম্প্রতি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন একজন জনপ্রিয় গায়ক। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে দুই স্ত্রী’কে একসাথে বগল দাবা করে শির উঁচু করে গায়ক সাহেবের তোলা ছবি। এ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অনেকে, এখনো আলোচনা চলছে এই বিয়ের পক্ষে বিপক্ষে। কেউ কেউ নিজের ঘরে ভাগীদার আগমনের বিরুদ্ধে, আবার কেউ কেউ বহুবিবাহের পথটি পরিষ্কার রাখার পক্ষে। একজন তো বলেই বসলেন “মুসলমানের বিয়ে কখনো স্ক্যান্ডাল হতে পারে না…।”

৩।
হুমায়ূন আহমেদ পরলোক গমন করার পর তার সম্পর্কিত হেন কোনো বিষয় নেই, যার লেজ ধরে টানাটানি করা হয় নি। সবাই একযোগে বিশেষজ্ঞ বনে গেলাম। অতীত বর্তমান ভবিষ্যত… কিছুই বাদ রাখা হল না। জনৈক ডাক্তার ফেসবুকে শাওনকে হুমকি দেয়ার ফলে, একটি আইনি লড়াইও হয়ে গেল কিছুদিন আগে।

৪।
এভারেষ্টের চুড়ায় আরোহণকারী প্রথম বাংলাদেশী কে? মুসা না মুহিত? মুসা কী আদৌ এভারেষ্টের চূড়ায় উঠতে পেরেছিলেন? শুরু হয়ে গেছে আইনী লড়াই। অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠছে, তাই সমান তালে শুরু হয়ে গেছে যুক্তিতর্ক।

অর্থ ও বাণিজ্য
৫।
কোনো মেহনত করা ছাড়াই শুধু বিনিয়োগ করেই ১০ মাসে দ্বিগুণ টাকা লাভের আশায় জীবনের শেষ সম্বল বিক্রি করে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে (এমএলএম) হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অনেকে। স্বপ্নে মালয়েশিয়ায় কিনে ফেলছে টনকে টন স্বর্ণ। অবশেষে “ইউনেপেটু”-এর মত কোম্পানীর কর্মকর্তাদের ধনী বানিয়ে নিজে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

৬।
“অটবি” নামটি খুবই পরিচিত সবার কাছে। প্রতি মাসেই অটবি ‘বিশেষ ছাড়’ দিচ্ছে। আগ পাছ চিন্তা না করেই আমরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছি বিশেষ ছাড়’কে না ছাড়ার অভিলাষে। মতিঝিলে কর্মরত বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এক সংবাদপত্র’কে জানান, “সেপ্টেম্বরে আমি অটবির শো রুমে গিয়ে একটি খাট দেখে আসি, ভেবেছি পরের মাসে কিনবো। দামও লিখে নিয়ে আসি। অক্টোবরে গিয়ে দেখি ওই মডেলের খাটটিতে স্পেশাল ডিসকাউন্ট দিয়ে ২ হাজার টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে!”

আমদানী রপ্তানী
৭।
ভারত থেকে গড়িয়ে পড়ছে গরু! কোরবানির পশুর হাটে দ্রুত ভারতীয় গরু সরবরাহের জন্য ব্যবসায়ীরা এবার নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন। পাদুয়া সীমান্তবর্তী সোনারহাট, কুলুমছড়া, মনাইকান্দি ও বিছনাকান্দি এলাকায় দেখা গেছে মেহেদীসীমান্তের ওদিকে, ভারতের দিকের পাহাড়ের ওপরে তোলা হয় গরুদের, প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড়, এর ওপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় গরু। এত উঁচু থেকে নামতে গিয়ে কোনোটি গড়িয়ে পড়ে, কোনোটি বা পড়ে হোঁচট খেয়ে। পাহাড়ের ও-পার থেকে উঠে এসে এ-পারে গড়িয়ে নেমে আর দাঁড়াতে পারে না। নিরীহ প্রাণীর এই করুণ অবস্থার দিকে বুদ্ধিমান মানুষের নেই কোনোই ভ্রুক্ষেপ। গরু ব্যবসায়ীদের সময় বাঁচানোর নামে শুরু হয়েছে এমনই নির্মমতা।

এখানেই নির্মমতার শেষ নয়। এ-পারে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে না-পারা গরু টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় নির্ধারিত স্থানে। অবস্থা মরণাপন্ন হলে শেষ রক্ষা হিসেবে জবাই দিয়ে মাংস ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। ভারতে গিয়ে গরু আনতে গেলে ২/৩ দিন সময় লাগে। তাই তারা বিকল্প এ পথ বেছে নিয়েছে, ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের কাছে এসে যাচ্ছে ১৫/২০টি গরু। এ সম্পর্কে সিলেট-৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল আজমের কথা শুনলে যে-কেউ স্তম্ভিত হয়ে যাবেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা আসলে গরু কারবারিদের নিজস্ব বিষয়। তাদের গরু তারা অক্ষত অবস্থায় আনলেন, নাকি আনলেন না, তা আমাদের দেখার নয়। আমরা শুধু গরু বৈধভাবে আসছে কি না তা নজরদারি করি। আমরা চাই আমদানি বেশি হোক। ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় এমনটি হলেও তা হয়তো সাময়িক।

আইন-আদালত
৮।
কিছু দিন আগেই নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ভবনে বোমা-হামলা করার পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাংলাদেশী তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস’কে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নাফিস এমন এক যুবক যে আসল নকল বোমার পার্থক্য পর্যন্ত ধরতে পারে নি। এদিকে নাফিসের বিচার শুরুর আগেই আমরা একশনে নেমে গেছি, বাংলাদেশে অবস্থানরত নাফিসের বাবা’কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। নাফিসের বাবা অবশ্য অন্য কথা বলছেন।

৯।
রামুতে বৌদ্ধদের উপর আক্রমনের ঘটনাটি ঘটার পর, ঘরে বসেই অনেকে এই ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দেয়া শুরু করে দিলেন। সাথে যুক্ত হয়েছে নেতা নেত্রীদের মন গড়া সংলাপ।

১০।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির নিহত হওয়ার পর থেকে কত কিছু ঘটে গেল। এটিন বাংলার অলরাউণ্ডার চেয়ারম্যানের কী হল তা এখনো ধোঁয়াটে। প্রাক্তন তালা মন্ত্রীর পরিবর্তন হয়েছে। তাই নতুন মন্ত্রীর আমলে শুরু হয়েছে, নতুন অধ্যায়। সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘকে নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি। গত ৩১ অক্টোবর র্যা ব সদর দপ্তরে নিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে র্যা ব। ছোট বাচ্চাটা আর কতো মানসিক চাপ নেবে? ও (মেঘ) কি অনেক দোষ করে ফেলেছে বেঁচে গিয়ে? মেঘের ‘জিজ্ঞাসাবাদে’র বিষয়ে জানতে চাইলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা মোহিত কামাল একটি সংবাদপত্র’কে জানান, “যদি কোনো শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হয় তাহলে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকই থাকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। আমাদের র‍্যাব বাহিনীতে সে রকম রয়েছেন কী না আমার জানা নেই।”
শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পরিবেশটাই হতে হবে শিশু উপযোগী। সেখানে কালো পোশাক পরা র‍্যাব সদস্যরা যদি চারদিকে বসে থাকে তাহলে সেটা একটা শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোটেই উপযোগী স্থান নয়।”

রাজনীতি
১১।
রেলের অর্থ কেলেঙ্কারির পেছনে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র জড়িত দাবি করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, সত্তর লাখ টাকার অপবাদ না দিয়ে সত্তর কোটি টাকার অপবাদ দিলে তা তার কাছে সহনীয় হতো। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত মন্ত্রী, এমপিদের দাঁত কেলিয়ে টেলিভিশন পর্দার সামনে নিদোর্ষ নিষ্কলঙ্ক দাবী করা এখন আর কোন অর্থবহন করে না।

১২।
বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রায় এক সপ্তাহের ভারত সফর শেষে শনিবার ঢাকায় ফিরে এসেছেন। অনেকেই খালেদা জিয়ার ইন্ডিয়া সফর যখন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই আলোচনা সমালোচনা শুরু করেছেন, কেউ বলছেন হায় হায় পাকিস্তান প্রেমী, খালেদা এইটা কী করল? অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছেন উনি ভগবান বদল করেছেন।

আন্তর্জাতিক
১৩।
আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন। এবার এই নির্বাচনের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৫০ কোটি ডলার। হিসাব করে দেখা গেছে, এতে ভোটপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ২০ ডলার। নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি অংশ নিতে পারে না এমন গ্রুপগুলোও নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। এসব গ্রুপকে ডাকা হয় ‘সুপারপ্যাকস’ নামে। মজার ব্যাপার হচ্ছে নিজ পছন্দের প্রার্থীকে সহযোগিতা করতে বা প্রতিপক্ষকে সমালোচনার মাধ্যমে আঘাত করার উদ্দেশ্যে তারা এই অর্থ ব্যয় করে থাকে। এবারের নির্বাচনে এই ‘সুপারপ্যাকস’ খাত থেকে এসেছে ৬০০ মিলিয়ন ডলার।

নাগরিক সমস্যা
১৪।
একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে গত এক দশকে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৫০%৷ কিন্তু সেখানে মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র ১১০%-১২০%৷ আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলো কখনো বিষয়টি কি ভেবে দেখেছে? তারা কি কখনও বুঝতে চেষ্টা করেছে যে, মানুষের আয়ের প্রায় ৭০% টাকা ব্যয় হচ্ছে বাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে গিয়ে৷ মনে হয় না!! তারা শুধু বুলি আওরাচ্ছে যে মানুষের আয় সাধারন মানুষই বোঝে আয় কতটা বেড়েছে এবং ব্যায় তার কতগুন বেড়েছে।

১৫।
আমরা প্রতিদিন সকাল বেলা মনের আনন্দেই বাজারে যাচ্ছি আর বাজার থেকে ব্যাগভর্তি বিষাক্ত মাছ, তরিতরকারি, ফলমূল কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরছি। । ফরমালিন মিশিয়ে মাছকে তাজা রাখা, পেট্রল দিয়ে চানাচুর ভাজা, মিষ্টি বানানোর দুধের কিমার সঙ্গে টিস্যু পেপার মেশানো এখন যেন একেবারেই দুধভাত। আপেল, কমলা, কলা, আম, পেঁপে, আনারসসহ প্রায় সব ফলই এখন বিষাক্ত কেমিক্যালের সৌজন্যে পাকানো হচ্ছে। শাক সব্জী সবকিছুতেই কেমিক্যালের ছড়া ছড়ি।

স্বপ্নযাত্রা
১৬।
বাংলাদেশি অশীতিপর আবু আল কালাম (৮০)।
তিনি ৮০ বছরের জীবনের ৬০টি বছর অর্থ সঞ্চয় করে এসেছেন— হজব্রত পালনের জন্য। সেই স্বপ্ন-সাধ শেষপর্যন্ত এবার পূরণ হয়েছে। আবু আল কালাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ২০ বছর বয়সে সঞ্চয় শুরু করেন হজ পালনের জন্য। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মুসলমানের সঙ্গে হজ পালনে মক্কা-মদিনার পূণ্যভূমিতে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জমাতে তিনি বিয়ে করার চিন্তাও করেননি। তিনি বলেন, এজন্য আমি খেতে-খামারে প্রচুর শ্রম দিয়েছি।

সম্পাদকীয়
তারপরও বাংলাদেশ সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট সাময়িকীর ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, দ্য পাথ থ্রু দ্য ফিল্ডস’ নিবন্ধটির মূল্যায়ন হচ্ছে, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে গত ২০ বছরে বাংলাদেশ বেশ কিছু ‘বড় অর্জন’ করেছে। ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের মানুষ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে, দেশটিতে খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের তেমন মজুদও নেই। যে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরুতে সংশয় ছিল, সেই দেশটিই নানা ক্ষেত্রে বড় অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ভারতের চেয়ে বেশি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় কমতে না দিয়ে ধরে রাখা, ধান উৎপাদন একাত্তর সালের তুলনায় তিন গুণ বৃদ্ধি, অপুষ্টির হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমা—এসবই দেশটির সফলতার কারণ। একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই অগ্রগতি অর্জন সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক।

এই মুহুর্তে প্রয়োজন আমাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন, একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ফরমালিন আর বিষাক্ত কেমিক্যালমুক্ত মানসিকতা।

মানুষের নৈতিক চরিত্র না বদলালে এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই।

আমার এই পোষ্টটি বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এবং ব্লগারের লেখার একটি সঙ্কলিত রূপ। সবাইকে ধন্যবাদ।