ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

দেশে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি সংকট তীব্র হয়ে উঠছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এসব সমাধানের জন্য আমরা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রিরা এবং বিরোধীদলের সমালোচিত সদস্যরা এসকল সমস্যা সমাধানে উঠে পড়ে লাগবেন- এটাই স্বাভাবিক এবং আমাদের মত আম জনতার কাম্য।

কিন্তু আমাদের ভাগ্যের স্রোত গড়ালো ভিন্ন দিকে। শেয়ার বাজারের ঐতিহাসিক পতন, দ্রব্যমূল্যের আকাশ ছোঁয়া উর্ধ্বগতি, কৃষি ক্ষেত্রে কৃষকদের অসন্তুষ্টি, বিএসএফের গুলিতে ধারাবাহিক ভাবে বাঙালী খুন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যার আড়ালে চলে গেল মৌলিক চাহিদাগুলো। এবার আমাদের নেতানেত্রীরা কী করে এসব সমাধান করেন সেটাই মুখ্য বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল। তবে আমরা কিংবা আমাদের নেতানেত্রীরা বুঝলেনই না এটা কেবল শুরু।

আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতে যে দুটি দল সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা দখল করেছে, যারা ক্ষমতালোভী হিসেবে বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে লজ্জাহীন-ভাবে পরিচিত, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি বড় অংশ হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং বাঁধা সৃষ্টি। যাই হোক, এভাবেই চলতে পারত যদি সাগর-রুনি আকস্মিকভাবে নির্মম হত্যার স্বীকার না হতেন।
সাগর-রুনির হত্যাই বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি। এই হত্যার পর সবচেয়ে সমালোচিত বক্তব্য হচ্ছে- “৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের ধরা হবে “। এ বক্তব্য সমগ্র দলকে এক নাড়া দিয়ে যায় এবং তাদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করে। এর বিচার না পেয়ে জনগন, সাংবাদিক, বিরোধীদল ক্ষেপে ওঠে। একের পর এক কর্মসূচী ও সরকারের দিকে আঙুল উচিয়ে রাখে। জনগনের এক অংশকে বলতে শোনা যায় যে, সরকারের দূর্নীতির কিছু প্রমান ওই সাংবাদিক দম্পতির হাতে ছিল বিধায় তারা খুন হন। এ ধরনের জল্পনা কল্পনার ভিতর দিয়ে মামলা ঘোলাটে হতে থাকে- সর্বোপরি এ হত্যার বিচার সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয় বলে জনগন বিশ্বাস করে ফেলে।
সরকারের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। এ ধাক্কা সামলাতে যখন তারা হিমশিম খাচ্ছে ঠিক তখনই দলের এক গুরূত্বপূর্ণ ও আলোচিত মন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে বিশাল অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। জনগনের বুঝতে বাকি থাকেনা- টাকার উৎস। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে সুরঞ্জিতকে প্রথমে পদত্যাগ করান এবং পরপরই দফতর বিহীন মন্ত্রিত্ব দেন -যা আমাদেরকে সোহেল তাজের কথা মনে করিয়ে দেয়; আরেক জন স্বেচ্ছায় পদত্যাগকারী প্রতিমন্ত্রী-দপ্তরবিহীন। যাই হোক ঘটনার এ নাটকীয় সমাধানে জনগন অপমানিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, চারদিক থেকে হাজারো প্রশ্ন সরকারের দিকে ছুটে যায়, তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে ওঠে।

এ ঘটনা নিয়ে যখন চায়ের কাপে ঝড় চলছে ঠিক তখনই সুনামির আবির্ভাব। বিএনপির শীর্ষ নেতা ইলিয়াস আলী উধাও। চাপা পড়ে যায় সুরঞ্জিত ইস্যু। জনগন এবার হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার পিছু পিছু এ ঘটনার শেষ দেখতে বিরোধী দলের পিছু নেয়, সবার গন্তব্য সরকারদলীয় নেতাদের দিকে। বলে রাখা ভাল- আমাদের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে ঢাকা পড়ে গেছে, জনগন বিদ্যুৎ সমস্যার সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার ও বিরোধীদল পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকে। বিরোধীদল পাঁচদিনের সফল হরতাল পালন করে। দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও জনগন মেনে নেয়, কেননা গুমের রাজনীতি দেশের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনে এবং এর সমাধান প্রয়োজন। পরস্পরকে দোষারোপের মধ্যে দিয়ে হরতাল এগিয়ে চলে কিন্তু সমাধান নেই। ওদিকে সরকার পক্ষ হরতাল পরিত্যাগ করে সহযোগিতা করতে বলেন কিন্তু কী সহযোগিতা তা বলেননা।

এবার শুরু হয় বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের ধরে ধরে বন্দি করার খেলা। হরতালে ভাংচুর ও বেআইনি কার্যকলাপের উছিলায় ক্ষমতাশীল দল এ কাজ করতে উঠে পড়ে লাগে। আমি এ লেখাটি লেখা পর্যন্ত ঘটনা এখন এইরকম: বিএনপির শীর্ষ কিছু নেতার বাসায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং অনেককে গ্রেফতারও করেছে। কয়েকজন নেতা আবার মামলার ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।এতদিন ধরে জনগন যাদের পিছু পিছু সরকারের কাছে জবাব আদায় করতে ছুটছিল তারাই এখন মামলার ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এই হচ্ছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি। আমার এ লেখা দেশকে উদ্ধার করার মত কিছু নয়, শুধুমাত্র সামগ্রিক পর্যালোচনা।

চলুন একটি কৌতুক শোনা যাক। এটি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হকের লেখা- বুশ একদিন এক স্কুল পরিদর্শনে গেলেন। ক্লাসে তিনি ছেলেদের উদ্দেশ্যে ভাষন দিলেন। তারপর শুরু হল প্রশ্নোত্তর পর্ব। ববি হাত তুলল। সে দাঁড়িয়ে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে -১. নির্বাচনে কম ভোট পেয়েও কী করে আপনি প্রেসিডেন্ট হলেন? ২. কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও কেন ইরাকে হামলা করা হল? ৩. হিরোশিমায় অ্যাটম বোমা ফেলা কি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা নয়? বিরতির ঘন্টা বেজে উঠল। বিরতির পর আবার সবাই মিলিত হল। এবার দাঁড়ালো জন। জন বলল, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার পাঁচটি প্রশ্ন: ১. নির্বাচনে কম ভোট পেয়েও কী করে আপনি প্রেসিডেন্ট হলেন? ২. কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও কেন ইরাকে হামলা করা হল? ৩. হিরোশিমায় অ্যাটম বোমা ফেলা কি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা নয়? ৪. বিরতির ঘন্টা কেন ২০মিনিট আগে বেজে উঠল ? ৫. ববি কোথায় ?
কোন নেতা বা জন-প্রতিনিধিদের দৃঢ়তা হওয়া উচিৎ ববি বা জনের মত, আওয়ামী বা বিএনপির এ সকল ভীতু ও অদূরদর্শিদের মত নয়।

এবার একটি গরম খবর: শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান পহেলা মে মঙ্গলবার সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে বিধবা উলেখ করে বলেছেন, তাঁর স্বামীর খুনি কে- তিনি (ইলিয়াসের স্ত্রী) তা জানেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বিষয়টি খুলে বলার জন্য তিনি ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদির প্রতি অনুরোধ জানান। এ হচ্ছে আমাদের মন্ত্রি -প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য। তার মানে কি তিনি (মন্নুজান) জানেন যে ইলিয়াস আলীকে খুন করা হয়েছে? কথাগুলো তিনি স্বজ্ঞানে বলেছেন কিনা আমার সন্দেহ। এ বক্তব্য আবার সরকারকে বিব্রত করবে কিন্তু যারা এ সকল বক্তব্যের জবাব চাইবেন- বিরোধীদলের নেতারা তো জনসম্মুখে আসতে পারছেননা সরকারের চাপে। তাহলে কে চাইবে জবাব? আমরা কী নেতৃত্বহীনতায় ভুগছি? হ্যাঁ এ মুহূর্তে আমাদের কোন নেতা নেই, এই প্রধান দুই দলের বিকল্প খোঁজা এখন সময়ের দাবি।

অনেক বাঙালী প্রলাপ বকলাম, আরেকটি রূপক কৌতুক দিয়ে শেষ করব। বিড়াল ইঁদুর খায়। একবার সব ইঁদুর মিলে সিদ্ধান্ত নিল- যখনি বিড়াল বেটা ইঁদুর ধরতে আসবে তখন সবাই মিলে বিড়ালের লেজ ধরে টেনে গর্তে নিয়ে যাবে। যেই কথা সেই কাজ, সব ইদুর মিলে গর্তের সামনে অপেক্ষা করতে লাগলো। যেই বিড়াল এসে মিঁয়াও করলো তখন ইঁদুরের দল কার আগে কে গর্তে ঢুকবে সে রাস্তা খুঁজতে লাগলো।

ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকার ও অযোগ্য বিরোধী দল- উভয়কে ধিক্কার।