ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমরা যদি একটা ফুটবল দলের খেলোয়ারদের সবাইকে রক্ষণভাগে রেখে একটি খেলা পর্যালোচনা করি তবে আমি নিশ্চিত এই দল কোন গোল করতে পারবেনা। আর যদি ভাগ্য খারাপ হয় তাহলে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াররা রক্ষণভাগ ভেঙে দু-একটি গোল ঢুকিয়েও দিতে পারে। ধরা যাক, এভাবে খেলার ফলে দলটি এক গোলে হেরেছে। এবার দলটির কোচের মন্তব্যটি যদি হয় এমন-

“আমরা খুব কম ব্যাবধানে হেরেছি। রক্ষণভাগ শক্তিশালী করার ফলে আমরা মাত্র এক গোলে হেরেছি। আশা করি সবাই আমার সাথে একমত যে গোল ঠেকানোর জন্য এরচেয়ে ভাল পদ্ধতিত আর নেই।”

এখানে স্পষ্ট যে এ লোক পরাজয় বরণ করেই খেলতে নেমেছেন। তার কাছে আক্রমনের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। সুতরাং, এ দল প্রতিবারই হারবে; আর নয়ত ড্র করবে। কোন উন্নতি নেই।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে আওয়ামী সরকারের জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন, এরা মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো মামলার বিচার আর নাম পরিবর্তনে আটকে আছে। আমরা অর্থাৎ দেশের আম জনতরা এতসব মার-প্যাঁচ বুঝিনা বা বুঝতে চাইনা।আমরা চাই একটা একটা করে বিজয়, আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর সহজলভ্যতা। স্বস্তায় চাল, ডাল, তেল, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস; সন্ত্রাস দমন, শিক্ষার প্রসার, যানজটমুক্ত রাস্তা, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। যে জনগন আরেকটু সচেতন তারা গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, বিদেশি অপশক্তিকে শক্ত হাতে দমন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, পরিবেশ নীতি ইত্যাদির উপর আলোকপাত করবেন।

বাংলার মহান নেতা শেখ মুজিবের হত্যার বিচার সম্পন্ন হোক আমরা সবাই চাই, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার নিষ্পত্তি অবশ্যই চাই, যুদ্ধপরাধীরা সাজা পাক এটা চাইব না কেন? এগুলোকে আমি দেশের রক্ষণভাগ আগলে রাখার মতই গুরুত্ব দিতে চাই। এই রক্ষণভাগ ব্যর্থ হলে সমগ্র জাতির উপর এক হীনমন্যতা, ব্যর্থতা চেপে বসবে। সর্বোপরি দেশের মৌলিকতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কিত থাকব। জেলহত্যা মামলার সুষ্ঠু বিচার না হলে এর কুফল হত্যাকারীদের অনুপ্রেরণা যোগাবে।জাতির অভ্যন্তরে বিষাক্ত বীজ ছড়িয়ে পরবে।আমাদের সবাইকে এসবের প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে এ সবই কিন্তু রক্ষণাত্বক কর্মসূচি।

অন্য একটি ব্যাপারে আলোকপাত করা যাক- বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে পৌর নির্বাচনে তুলনামুলক রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ না করার জন্য। যেন এই নির্বাচনে ক্ষমতাশীল দলের প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। হায়রে দেশ! একটি অনিয়ম প্রধানমন্ত্রী করতে পারতেন কিন্তু করেননি- এই মর্মে আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এটা আমাকে লজ্জা দেয়।

যাই হোক, আমরা স্বাধীনতার এই চল্লিশ বছর পরও রক্ষণাত্মক পর্যায়ে খেলছি। আমরা যদি পূর্বে উল্লেখিত মৌলিক চাহিদাগুলোর নিশ্চয়তা পেতে চাই তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের সরকারকে আক্রমন ভাগেও নজর দিতে হবে, বরং একটু বেশিই দিতে হবে।

আমাদের সাধারণ জনগন বর্তমান নেত্রীর কাছ থেকে সুযোগ্য নেতৃত্ব না পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের দ্বারস্থ হয়েছে, আশা করছে এরা আক্রমনভাগ নিয়েও খেলবে। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা যেন এক গোলক ধাঁধাঁয় আটকে আছে। জনগন একবার এদিকে, আরেকবার সেদিকে চক্কর খাচ্ছে- বিকল্প কোন ব্যবস্থা চোখের সামনে দেখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান চালক। তাঁরা আমাদের জন্য তথা দেশের ভবিষ্যতের জন্য স্বার্থহীন জীবন বিসর্জন দিবেন, জনগনের স্বার্থে তাঁরা থাকবেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এজন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করবে। কিছু জরুরি সুযোগ-সুবিধার দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তারা হবেন আমাদের অগ্রপথিক।

কিন্তু যখন দেখি তারাই শিশুদের মত বুলি আওড়ানোর রাজনীতিতে মেতে উঠছেন, দেশের হাজারো সমস্যা সমাধান না করে ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে মেতে থাকছেন বছরের পর বছর- তখন আমরা কেবলই হতাশ হই। আর এটা যদি আমার ব্যক্তিগত না হয়ে থাকে তবে সমগ্র জাতির জন্যই লজ্জার, হীনমন্যতার, ব্যার্থতার।

আমরা বাঙালীরা পরিশ্রম করে, সংগ্রাম করে জয়ী হতে অভ্যস্ত। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, গনতন্ত্রায়ন, বন্যা মোকাবিলা- এসবই আমাদের সঠিক পরিচয়, প্রকৃত বাঙালী প্রবৃত্তির ধারক। আমরা কেবল রক্ষণভাগ শক্তিশালী করার মাধ্যমে লজ্জা থেকে বাঁচতেই চাইনা, আক্রমণভাগেও বাঙালী স্পৃহা দিয়ে জয়ী হতে চাই।