ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

“পৃথিবিতে যাহা কিছু আছে চিরকল্যানকর,
অর্ধেক তাঁর গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তাঁর নর।”

কী সুন্দর একটি সত্য! এখানে নারীর অধিকার ও সম্মান যেমন সুরক্ষিত, তেমনি পুরুষের গৌরবেরও সামান্যতম ঘাটতি নেই। নারী-পুরুষ নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এ পৃথিবিকে গড়ে তুলেছে। শিশুর নির্ভরতা ও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ‘সংসার’ নামের আবাসের সৃষ্টি। এখানে দু’জনের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হয়। যথাসাধ্য পরিশ্রম করে যেতে হয় শুধুমাত্র সন্তানের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ভালবাসার বিনিময়ে। অর্থ কখনই এর বিনিময় হতে পারেনা।

আমরা ছোটবেলায় মীনা কার্টুন দেখে শিখেছিলাম যে ছেলে-মেয়ে দু’জনের কাজই সমান কঠিন। একটি সংসারে ছেলেদেরকে বেশি কাজ করতে হয়, নাকি মেয়েদের- এ ধরণের প্রশ্ন শিশুসুলভ। সন্তান প্রতিপালন ও সংসারের দেখভালের দায়িত্বটি প্রকৃতিগতভাবেই মেয়েদের উঁপর। আর ঘরের বাইরের ঝক্কি-ঝামেলাপূর্ণ কাজগুলো ওই একই কারণে ছেলেদের। এখানে কোন তুলনা চলেনা। সারাদিন সংসার থেকে, ওই প্রিয় শিশুটির কাছ থেকে দূরে থেকে পুরুষটি যে অর্থ উপার্জন করছে- সে তো সংসারের জন্যই। নারীটি সংসারের জন্য ঘরের বাইরে মুক্ত বিচরণ থেকে যেমন বঞ্চিত হয়, পুরুষটিও বঞ্চিত হয় ঝামেলাহীন ওই নিবিড় ঘরটি হতে। এই ত্যাগের জন্য নারীকে পারিশ্রমিক দিলে, পুরুষকেও দিতে হবে।

গৃহী শব্দের অর্থ সংসারী, এবং বিপরিতার্থক শব্দ সন্ন্যাসী। যে পুরুষটি সংসারের প্রয়োজনে অর্থ উপার্জনের জন্য বাহিরে যায়, সে অবশ্যই সন্ন্যাসী নয়- গৃহী। লিঙ্গ পরিবর্তন করলে হয় গৃহিনী, যে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সংসারের দেখাশোনা করে থাকে। তাহলে কোন যুক্তিতে গৃহিনীটি স্বামীর কাছে পারিশ্রমিক দাবি করতে পারে? এটা কী একটি অসুস্থ চিন্তা নয়?

ভারতের নারী ও শিশু উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী কৃষ্ণা তিরাথ এই চিন্তাটিই করেছেন। এই মন্ত্রনালয়ের মতে সংসারের কাজের জন্য আয়ের একটা অংশ প্রতি মাসে স্ত্রীকে দিতে বাধ্য থাকবেন স্বামীরা, এতে করে নাকি নারীদের সামাজিক ক্ষমতায়ন বাড়বে। তাদের যুক্তি- যদি সন্তানকে যত্নের জন্য কোনো ক্রেইশে (কর্মজীবী নারীদের সন্তানকে পালনকারী প্রতিষ্ঠান) পাঠানো হতো, তাহলে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতো। যদি বাইরের কেউ রান্না করত বা বাজার করত, তাহলেও অর্থ ব্যয় করতে হতো।

প্রথম আলো’র অনলাইনে দেয়া সংবাদটি পড়ে শুরুতে আমার হাসি পাচ্ছিল। পরমুহূর্তেই আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসি। আচ্ছা – যে সংসারের রান্নাবান্না এবং সন্তানের কথা এখানে বলা হচ্ছে তা কী গৃহিনীর নয়! সে কি সংসারটির অর্ধেক অংশ নয়! সে কী তাহলে পুরুষটির ভৃত্য? মন্ত্রী কৃষ্ণা তিরাথ বোধহয় বুঝতেই পারছেননা যে তিনি নারীদের সামাজিক ক্ষমতায়ন বাড়াতে গিয়ে তাঁদের অসম্মান করছেন। এই ধরনের চিন্তা গৃহিণীদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। প্রেম-ভালবাসা কিংবা মমতার মত বিষয়টিকে তিনি অর্থের মানদণ্ডে নিয়ে এলেন যা কোন গৃহিনীরই কাম্য হতে পারেনা।

ভারতে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ ব্যাপারে কথা হওয়াটা একদিকে যেমন হাস্যকর, আরেকদিকে আশঙ্কাজনক। আমাদের দেশের নারী সংগঠনগুলো যদি এর বৃহত্তর নেতিবাচক দিকটি বুঝতে ব্যার্থ হয় তবে দুইদিন পর তাঁরাও আন্দোলনের তালিকায় এই অন্যায় ও অমানবিক সিদ্ধান্তটি যুক্ত করতে পারে যা খুবই দূঃখজনক। স্বামী-স্ত্রীর সুন্দর সম্পর্কটি কলুষিত হবে, সন্তান অর্থের বিনিময়ে মায়ের ভালবাসা পাবে। এতে ব্যাবসায়িক গন্ধ পাওয়া যায়, আর পাওয়া যায় প্রকৃত ভালবাসার মৃত্যুর আভাস।

আমাদের নারীরা অবশ্যই এই সত্যটি বুঝবেন। স্নেহ-মমতা, প্রেম-ভালবাসা কে স্থান দিবেন সবকিছুর উর্দ্ধে। প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে থেকে নিজেদের সূখ ও সম্মান অটুঁট রাখবেন- এই হবে আমাদের কামনা। ভালবাসার জয় হোক।