ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

বহু বহুবছর আগের কথা। চিংহাউ ও তার পরিবার চারবেলা যাবৎ না খেয়ে আছে, শেষ খেয়েছিল গতকাল দুপুরের দিকে। তাও আবার একটি খরগোশ, খাদক- সে সহ নয়জন। ওইতো হাড়গুলো পড়ে আছে। এরপর থেকে শুধু পানিই চলছে। ছোট বাচ্চাদুটো সমস্বরে কাঁদছে।

গতকাল বনে হুতাশন এসেছিল। হুতাশনকে এখন আমরা আগুন বলি। বনে আগুন লাগাকে অশুভ কোন শক্তির আগমন বলে মনে করতো চিংহাউ এর পরিবার। হুতাশন এলেই বনের সব পশু-পাখি কোথায় যেন পালিয়ে যায়। তখন এভাবে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। কিন্তু আর তো পারা যায়না। বৃদ্ধা মা তো মৃত প্রায়, তবুও এসময় শিকারে যেতে মানা করছে। এখনও তো ওই দূরে হুতাশনের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এভাবেই একদিন তার স্বামীকে হারিয়েছেন। এখন ছেলে দুটোকে হারাতে চান না। তখনও আগুনকে নিজেদের দখলে আনতে পারেনি এই পরিবারটি।
অবশেষে দুইভাই ঠিক করলো মাকে না বলেই শিকারে যাবে। কিছু একটা খাদ্য যোগাড় করতেই হবে। আর কিছু না হোক গতকালের মত খরগোশ হলেও চলবে। শুধু নিজ নিজ স্ত্রীকে বলে দুইভাই গাছের ডালপালা নির্মিত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। ঘর না বলে ঝোঁপ বলাই ঠিক হবে।

পুরে যাওয়া অঞ্চলটার কাছাকাছি পৌছতেই গায়ে উত্তাপ টের পায় চিংহাউ। ভয় ভয় লাগলেও ছোট ভাই মিংরাউকে বুঝতে দিচ্ছেনা। অবশ্য মিংরাউকে দেখে মনেই হচ্ছে না ভয় পাচ্ছে। খুবই উৎসাহ নিয়ে আগে আগে হাঁটছে। হঠাৎ মিংরাউ থমকে দাড়ায়। চিংহাউ সাবধানে ছোট ভাইয়ের কাছে গিয়ে দাড়ায়। একটা হরিণ আগুনে ঝলসে পরে আছে। বোধহয় অনেক বয়ষ্ক ছিল- অন্য হরিণদের সাথে দৌড়ে পালাতে পারেনি। হুতাশনের সামনে পরে গেছে।

পাশেই একটি ভাঙা ডালে তখনও আগুন জ্বলছিল। ডালটির কাছে পা টিপে এগিয়ে যায় দুইভাই। ছোট ভাই মিংরাউ একদৃষ্টে তাঁকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলে “এই তাহলে হুতাশন!”

চিংহাউ এবার পুরে যাওয়া হরিণটির দিকে দৃষ্টি দেয়। ক্ষুধা পেটে আক্ষেপের স্বরে বলে, “ইশ- এটা যদি মৃত না হত! পরমুহুর্তেই ভাবলো- আরে আমরা তো মেরেই খাই।” সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে, হরিণটির দেহের এক দিকে চামরার ভেতরে মাংস দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে কিছুটা মাংস ছিড়ে নেয় সে। ভয়ে ভয়ে মুখে দিয়ে চিবোতে থাকে। মিংহাউ ততক্ষণে ভাইয়ের দিকে অবাক দৃষ্টে তাঁকিয়ে। চিংহাউ এর মুখটি ধীরে ধীরে উজ্জল হয়ে ওঠে। হাত নেড়ে ভাইকে কাছে আসতে বলে হাতের অবশিষ্ঠ মাংসটাই এগিয়ে দিয়ে বলে, “খেয়ে দেখ!”

তারা এই প্রথম ঝলসানো মাংসের স্বাদ পায়। হরিণটিকে দুইভাই মিলে পরিবারের কাছে নিয়ে আসে। পরিবারের সবাইকে শিখিয়ে দিলে সবাই মিলে আনন্দের সাথে হরিণটি খেতে থাকে। সবাই বুঝতে পারে হুতাশনে মারা যাওয়া বস্তু খেতে চমৎকার। মিংরাউ সেই আগুনসহ ডালটাও সাথে করে নিয়ে এসেছিল। খাওয়ার পর সবাই মিলে সেটা নিয়ে গবেষণায় মেতে উঠল। হুতাশনকে কি করে শিকারের কাজে লাগানো যায় তাও চিন্তা করে ফেলে তারা। নতুন উপকারি শক্তি আবিষ্কারের আনন্দ নিয়ে সবাই ভরপেট খেয়ে ঘুমুতে যায়। যাওয়ার আগে অন্য একটি বড় ডালে হুতাশন জালিয়ে রেখে যায় যেন না নেভে।

প্রচন্ড যন্ত্রনায় ঘুম ভাঙে মিংরাউ এর। চোখ মেলে চারপাশে দাউ দাউ করে হুতাশন জলতে দেখে সে। বাঁচার তাগিদে বুঝতে পারে এখান থেকে বের হতে হবে। তুলনামুলক কম হুতাশনের দিক দিয়ে দৌড়ে ঝোঁপের বাইরে বেরিয়ে আসে সে। এতক্ষণে মনে পড়ে তার স্ত্রী-বাচ্চা ভিতরেই রয়ে গেছে, কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সাহস বা শক্তি কোনটাই অবশিষ্ঠ নেই তার। সমগ্র শরিরে অসহ্য যন্ত্রনায় জ্ঞান হারায়। বোধ লোপ পাওয়ার আগে বউ-বাচ্চার চিৎকার শুনতে পায় মিংরাউ।

অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোন মহিলা কন্ঠ শুনতে পায় মিংরাউ। চোখ মেলতেই প্রচন্ড আলোর ঝলকানিতে আবার বন্ধ করে ফেলে। এবার ধীরে ধীরে মনে পড়ে হুতাশন তান্ডবের কথা। এবার চোখ মেলে ভাইয়ের সঙ্গিনীটির মুখ দেখতে পায় সে। উঠতে গিয়ে শরিরের যন্ত্রনা অনুভব করে। কোনমতে উঠে দাড়ায় সে। তাদের আবাসটি পুরে ছাই হয়ে গেছে। সাথে স্ত্রী, বাচ্চারা, ভাই এবং মা সহ সাতজনই পুরে কয়লা। তারা দুজনই কেবল বেচে আছে।

চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরে তার। পাশে তার ভাবীও কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা বুঝতে পারে- হুতাশন অনেক উপকারী শক্তি হলেও কাজ শেষে তাকে নিভিয়ে রাখতে হয়। আর নয়তো ধ্বংস করে দেয় সমাজ কিংবা গোষ্ঠিকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সাত-সাতটা জীবন বিসর্জন অনেক বেশিই ক্ষতি বলে মনে হয় তাদের কাছে।