ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

[ মন্তব্য মডারেশনে রাখা সব সময়ই আপত্তিকর, সুতরাং মন্তব্যের বদলে আলাদা করে পোষ্ট লিখতে হলো ]

আপনার ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটা পড়লাম, খুব বেশী মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারি নি স্বীকার করে নিচ্ছি। তবে সূচনা পর্বে আপনি যুদ্ধাপরাধীদের সংজ্ঞা দিয়েছেন, চমৎকার সংজ্ঞা নিঃসন্দেহে, তবে ২০০৯ সালের ২৫শে মার্চ যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবনা পাশ হয়েছে সেটা

“মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ”

বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, আমাদের গণমাধ্যম বিষয়টিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে কিংবা পপুলার জার্গনে বিষয়টা যুদ্ধকালীন সময়ের অপরাধ বিবেচিত হচ্ছে বলেই স্বাভাবিক ভাবে এটাকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলা হচ্ছে, যাই হোক আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা দিয়েই আলোচনা শুরু করতে পারি

“মানবতাবিরোধী অপরাধ”, “শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ” এই বিষয়টা আদতে কি, Crimes against humanity:

murder, extermination, enslavement, deportation, and other inhumane acts committed against civilian populations, before or during the war; or persecutions on political, racial or religious grounds in execution of or in connection with any crime within the jurisdiction of the Tribunal, whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated.

আমরা বিচারের প্রেক্ষাপট এখনও নির্ধারণ করিনি, শুধু সংজ্ঞা দিয়েই শুরু করেছি, প্রশ্ন হলো ১৯৭১ সালে এমন কোনো অপরাধ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঘটেছিল কি না, সেসবের বিবরণ কোথাও পাওয়া যাবে কি না, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসরণে এটা ঘটেছিল কি না, কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় এটার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছিল কি না

বাংলাদেশে কি মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিলো? যদি হয়ে থাকে, এটার ব্যাপকতা কতটুকু ছিলো। যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা কি কোথাও সাক্ষ্য দিয়েছেন ১৯৭১ সালে বিশ্বের গণমাধ্যমে এবং মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে কি এমন কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আপাতত আমাদের প্রয়োজন নেই, আমাদের যা জানা প্রয়োজন মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কাউকে দোষারোপ করা হয়েছে কি না। যদি বিশ্বে কোথাও কাউকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা হয় তাদের অপরাধের ধরণ কেমন ছিলো।

জ্যা পিয়েরী বেম্বা গ্মবো [Jean-Pierre Bemba Gombo] কঙ্গোর উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি, তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক করা হয়েছে, তিনি সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, কিংবা তিনি কোনো সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন না, তার সশস্ত্র রাজনৈতিক সমর্থকদের নেতা হিসেবে এবং তার উস্কানীতে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে তাকে আটক করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো ১৯৭১ এর বাংলাদশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কি এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের অস্তিত্ব ছিলো
তাদের নেতৃত্বে ছিলো কারা এবং তাদের দেওয়া বিবৃতি কেমন ছিলো

জার্মেইন ক্যাটাঙ্গা[ Germain Katanga ] কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা সশস্ত্র সংগ্রাম করছে তাদের নেতা। তার বিরুদ্ধে নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে হত্যা, ধর্ষণের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এবং সে অপরাধে তার বিচার শুরু হয়েছে ২০০৯ সালের ২৪শে নভেম্বব।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কি এমন হত্যা ও ধর্ষণ কিংবা নারীর শ্লীলতাহানি এবং তাদের পাকিস্তানী সেনা বাহিনীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে

সলেমন মোরেল [ Salomon Morel] একজন সুবিধাবাদী চরিত্র, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অধিকৃত পোলান্ডে নিজেদের ডাকাত দল তৈরি করে আশেপাশের মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন, পরবর্তীতে পোলান্ড মুক্ত হলে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার অনুগ্রহভাজন হয়ে একটি বন্দীশালার দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানে আটককৃত বন্দীদের উপরে নির্যাতন চালান এবং তাদের হত্যা করেন।

তিনি যে অপরাধ করেছিলেন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালে ১৯৯৪ সালে সে অপরাধের দায়ে তার বিচার দাবি করে Poland’s Institute of National Remembrance of war crimes and crimes against humanity তার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে বিচার সমাপ্ত হয় এবং তাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা হয় ১৯৯৫ সালে, ইসরাইলের বাধার মুখে তাকে শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয় নি। ২০০৭ সালে তার মৃত্যু হয় ।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোনো ব্যক্তি কি এমন দস্যুতা এবং আটককৃত বন্দী কিংবা সন্দেহভাজনদের নির্যাতন ও হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন,
তাদের রাজনৈতিক পরিচয় অনুহ্য রেখে তাদের কমান্ডারদের চিহ্নিত করা সম্ভব এখন পরাজিত পাকিস্তানী জেনারেল এ এ কে নিয়াজী কি বলেছেন এদের বিষয়ে

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন আরও রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং তাদের সহযোগীগন, বিচার দীর্ঘায়িত হয়েছে, অনেক সময়ই অভিযুক্ত আটক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া অব্যহত থেকেছে।

অবশ্যই আবুল মনসুর আহমেদ চাননি এদেশে যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিলো কিংবা তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্ররোচনায় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের উপরে অত্যাচার করেছিলো তাদের এভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। অলি আহাদও তেমনটা চান নি, আপনি যাদের কথা উদ্ধৃত করেছেন তারাও হয়তো কয়েকটি গুরুতর অপরাধ ব্যতিরেকে অন্য সকল চুনোপুটি অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। কিন্তু তারা সরাসরি আক্রান্ত ছিলেন না, আবুল মনসুর আহমেদ তার নিজের বাসায় কাটিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সম্পূর্ণ সময়টাতেই, তার পুত্র মাহফুজ আনাম ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করলেও তিনি এর আঁচে আক্রান্ত হননি কিংবা নির্যাতিত হননি।

যারা আক্রান্ত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন এবং যাদের উপরে অন্যায়ের প্রতিকার এখনও হয়নি, তারা কি ক্ষমা করেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সেনাদের কিংবা তাদের এ দেশীয় দোসরদের?

রাষ্ট্রপ্রধান, অবৈধ শাসক কি সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন সেটা মেনে নেওয়ার দায়িত্ব কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই নাগরিকের। তারা তাদের উপরে সংঘটিত অপরাধের বিচার চাইতেই পারেন, সময়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনটাই এই বিচারের দাবির বিরুদ্ধে চলে গেলে সেটাকে প্রতিহত করে আক্রান্তের জন্য ন্যায় বিচার দাবী করা সচেতন নাগরিকের কর্তব্য, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিষ্পেষণের অভিযোগ উত্থাপন করা আপত্তিকর, কারণ তারা এই রাজনৈতিক দলের কর্মী, নেতা ও সমর্থক হিসেবেই ১৯৭১ এ এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধে লিপ্ত ছিলেন এমনটাই আক্রান্তদের অভিযোগ, সেটার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা নিছক অপরাধী, কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা আদর্শের সৈনিক নন।
কিন্তু আপনি যুক্তির পথ ধরেছেন, আমিও যৌক্তিক ভাবেই জানতে চাইবো আপনি কি রাজনৈতিক বিবৃতিগুলো পড়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান অংশে কি ঘটেছে সেসব নিয়ে আপনি কতটুকু অবগত আপাতত এ প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।