ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বিভিন্ন সময়ে জামায়াত সমর্থকদের একাত্তরের পাপমোচন প্রকল্পের সফল ধারাবাহিকতা পুষ্পিতার ব্লগ

পুষ্পিতা গত এক মাস ধরে তার শিক্ষাবছরের অধিকাংশ সময়টাই রাজনৈতিক বিবেচনায় লিখিত বিভিন্ন ইতিহাস পুস্তিকা পাঠ করে কাটিয়েছেন, তিনি সেসবের উপরে ভিত্তি করে অদ্যাবধি ছয় পর্বের জামায়াতের পাপ স্খলন প্রকল্প হিসেবে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে বিভিন্ন আকর্ষণীয় ব্লগ লিখেছেন, তার সমর্থক গোষ্ঠীর অভিমত অনুসারে সেসব যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ এবং তারা বিভিন্ন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য করছেন পুষ্পিতার ব্লগে এবং অন্য সবাইকে গালিবাজ বলছেন, অযৌক্তিক আচরণের দায়ে অভিযুক্ত করছেন।

গত ৫ বছর ধরে এই একই ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সমর্থকদের সাথে বিভিন্ন মেহফিলে আলোচনা কিংবা বিতর্ক হয়েছে, এবং সেসব বিতর্কের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি জামায়াতের তথাকথিত সমর্থকেরা জামায়াতের ‘একাত্তরের ভুমিকা’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যেসব প্যাটার্ন অবলম্বন করে পুষ্পিতার প্রচেষ্টা তার একটা সাধারণ উদাহরণ, পুষ্পিতার অভিনবত্ব তার যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা বিষয়ক ব্লগটি, সেটাও বাধ্য হয়েই তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ(ট্রাইব্যুনাল) আইনটি সংশোধন করে সে আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হলে হয়তো পুষ্পিতা পর্ব ৪ থেকেই আলোচনা শুরু করতো অধিকাংশ জামায়াত সমর্থকদের মতো।

দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় এটুকু বলা যায় বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে যারা জামায়াতের একাত্তরের ভুমিকা নিয়ে আলোচনা করেন তারা সবাই একাত্তরে জামায়াতের দালালির ইতিহাস সম্পর্কে অবগত এবং এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট সচেতন। তারা সচেতন ভাবেই জামায়াতের এই ভুমিকা বিষয়ে অন্যান্যদের বিরোধিতাকে প্রতিরোধ করতে চান। তাদের আলোচনা শুরু হয় দালাল আইন দিয়ে, এবারও তাদের ধারণা ছিলো তাদের দালালির অভিযোগের বিচার হবে দালাল আইনে, কিন্তু সরকার আন্তর্জাতিক আইনে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করায় পুষ্পিতাকে একটু এগিয়ে গিয়ে শুরু করতে হয়েছে।

যুক্তির ধারাগুলো হবে দালাল আইন রদ করেছেন বঙ্গবন্ধু, গত দুই বছরে ছাত্র শিবির এবং ছাত্রী সংঘ ছাত্রলীগের চেয়ে বেশিবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছে এ কারণেই। সুতরাং তাদের নেতাদের দালালির অভিযোগ এখন ধোপে টিকবে না। এই যুক্তির পরবর্তী ধাপ হবে শুধুমাত্র জামায়াত নয় বরং অন্যান্য অনেকেই তো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দালালি করেছে, শুধুমাত্র জামায়াতকেই কেনো সকল দালালির অপবাদ হজম করতে হবে, তাদের এই অভিমানের জন্য আমার যথেষ্ট করুণা আছে, তাদের প্রতি আমি যথেষ্ট সহানুভূতি সম্পন্ন , তারা এই বিষয়ে আক্রান্ত বোধ করে, তাদের মনে হয় ঘর শুদ্ধ মানুষ তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে, সে হাত থেকে একাত্তরের বাংলাদেশে নিহত সাধারণ নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরছে।

পরবর্তী ট্রাম্পকার্ড হলো বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের কারা কারা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাথে করমর্দন করেছেন, এইসব তারা ট্রফির মতো সাজিয়ে রাখে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ফাইলে, তাদের কম্পিউটারের মাই পিকচার ফোল্ডারে এইসব ছবি সাজানো থাকে, তারা বিভিন্ন পিয়ার শেয়ারিং সাইটে গিয়ে এইসব বিনিময় করে কি না আমার জানা নেই, কিংবা তাদের কোনো সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে এইসব ছবি সরবরাহ করা হয় কি না সেটাও আমার জানা নেই,শাহ হান্নানের ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে হয়তো অনুগত শিক্ষিত জামায়াত কর্মীদের এইসব পেন ড্রাইভে সরবরাহ করা হয়েছে।

সুতরাং ষষ্ঠ পর্বে এসে এইসব পরিচিত ছবি আর পরিচিত কথাবার্তা শুনে বুঝলাম এই আলোচনার এখানেই সমাপ্তি, এরপর আর নতুন কিছু আসবে না আলোচনায়, এখানেই ঘুরপাক খাবে, পরবর্তীতে অন্য কোনো নিকে কিংবা অন্য কোনো অনুগত জামায়াত কর্মী এই বিষয়টা পুনরায় উত্থাপন না করা পর্যন্ত এটা এ রকমই থাকবে। গত ৫ বছরে অন্তত ৬ বার এইসব আলোচনা সমাপ্ত হয়েছে, সপ্তম কিংবা অষ্টম বারের মতো একই আলোচনা পুষ্পিতা শুরু করলো নতুন ফোরামে, হয়তো বিডিনিউজ ব্লগে তার আগে কেউ এটা করতে পারেনি, সেই পাইয়োনিয়ারিজমের অ্যাডভেঞ্চার এবং সমীহ পুষ্পিতা পেয়েছে। আশা করা যায় নতুন কোনো ব্লগসাইট হলে সেখানে পুনরায় এই আলোচনা শুরু হবে। কিন্তু আমি একটা বিষয় বুঝতে পারি না, ছাদ থেকে লাফিয়ে মানুষ নিচেই পরে বারবার, কেউ চাঁদের কাছাকাছি পৌছেছে এমন তথ্যও আমার জানা নেই, একই কথা বিভিন্ন আঙ্গিকে বললেই সেটা সত্য হয়ে যায় না এই বিষয়টা সম্পর্কেও আমি যথেষ্ট নিশ্চিত কিন্তু এরপরও বিভিন্ন ফোরামে জামায়াতের ভূমিকাকে যারা ডিফেন্ড করতে চায় তাদের জামায়াতি অধ্যাবসায়ের কারণটা উপলব্ধি করতে পারিনি আমি। অভিযোগটা আওয়ামী লীগ এবং যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চাইছে তাদের সাথে জামায়াতের রাজনৈতিক ঐক্যের। সেটার ভিত্তিতেই পরবর্তী আলোচনাটুকু।

আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে করেছে এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য, একই সাথে এটাও সত্য যে জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংযুক্ত ছিলো, তারা সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহন করেছে একাত্তরের বর্বরতায়, তারা নৈতিক ভাবে এটা সমর্থন করেছে, এবং প্রয়োজনে নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় উদ্যোগে স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষের মানুষদের হত্যার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা লিপ্সায় যা করেছে সেটার সাথে এ বিষয়গুলোকে সম্পৃক্ত করতে চাওয়াটা কিংবা এটার সাথে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বিষয়টা ট্যাগ করতে চাইলে রাজনৈতিক ভাবে বিচার করে বলা যায়,

আওয়ামী লীগ জামায়াতকে কাছে টানতে চাইছে কিন্তু জামায়াত খালেদা জিয়ার আঁচলের তলা থেকে বের হতে চাইছে না বলে তাদের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল, তাদের রাজনৈতিক অভিলিপ্সা রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন করা কিংবা সরকার গঠন করা। জামায়াত যেমন ধর্ম বেচে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়, আওয়ামী লীগও বিএনপি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিপক্ষের লোকজনের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা গড়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়। এ কাজের জন্য তারা যা যা নষ্টামি করার করবে, সেটা ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলের চরিত্র।

তারা নিজেদের একাত্তরের পক্ষের দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না কিন্তু জামায়াত মরিয়া হয়েই তাদের হাতে একাত্তর তুলে দিতে চায়, তাদের দাবী ”

আওয়ামী লীগকে মুক্তিযুদ্ধের দল

আওয়ামী লীগকে মুক্তিযোদ্ধাদের দল বলে গুরুত্বপূর্ণ করে তুললে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুত্বটা হ্রাস পায় কিছুটা। তারা দাবী করতে পারে তাদের রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ, সুতরাং তারা স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল নয়।

গণতান্ত্রিক ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার সনদ পাওয়া আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের প্রশাসন পরিচালনার স্বীকৃতি দিতে না চাওয়ার বিভিন্ন ছলচাতুরিতে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলনের একটা পর্যায়ে জনগণ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করে, তাদের শ্লোগান এবং মনস্তাত্ত্বিক বদলের ধরণটা উপলব্ধি করতে পারেনি জামায়াত, এটা একটা ঐতিহাসিক সত্য, তারা একাত্তরের অধিকাংশ সময়ই জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে গিয়ে এদেশের সাধারণ জনগণের স্বাধীনতা লড়াইয়ের বিরোধিতা করেছে, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেছে কিংবা পাকিস্তানীদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছে এমন নয় বরং তারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রতিহত করতে চেয়েছে।

জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধাচারণের ক্ষমতা ছিলো না আওয়ামী লীগের, তারা বাধ্য হয়েই জনগণের পাশে থেকে জনগণকে দিক নির্দেশনা দিয়ে জনগণের মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনায় সহযোগিতা করেছে, কিন্তু মূল অংশগ্রহণকারী শক্তি ছিলো জনগণ, তাদের উপরে যেমন নির্মম অত্যাচার হয়েছে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষী হওয়ার কারণে তাদের যেমন মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে, যেমন ভাবে কল্পিত খায়েশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গ্রামের পর গ্রাম জ্বালানো হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কিংবা তাদের তাঁবেদারদের প্রতি কোনো মমত্ববোধ অবশিষ্ট ছিলো না।

আওয়ামী লীগ পরবর্তীতে ক্ষমতার লোভে জনগণের দাবীর সাথে, জনগণের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ, কিন্তু সেটা আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত, সম্মিলিত ভুল, সেটার সাথে দেশের সাধারণ জনগণের আকাঙ্খা আর প্রত্যাশাকে মিলিয়ে ফেলবার কোনো কারণ নেই, জনগণ সব সময়ই এই অবিচারের বিচার দাবী করেছে, তারা বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও জনগণ বিচারের দাবি থেকে পিছু সরে আসেনি। আওয়ামী লীগ এইসব জনগণের দাবির প্রতি লক্ষ্য রেখেই নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করছে, সেতা জনগণের দাবীর জয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রকাশ নয় সেটা। এটা বুঝতে হলে জনগণের সাথে একাত্মতা থাকতে হবে, জনগণের প্রাণস্পন্দন বুঝতে হবে, এটা বুঝতে আইনস্টাইন হতে হয় না , চোখ কান খোলা রাখলেই সেটা স্পষ্ট বুঝা যায়।

আমার আশ্চর্য লাগছে, পুষ্পিতা বিভিন্ন বই পড়েও এই সত্যটা উপলব্ধি করতে পারছে না, হয়তো রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে রচিত ইতিহাস পাঠ করে তার চোখে একটা আলাদা পর্দা উঠেছে, এর বাইরে পুষ্পিতার গত ৬ পর্বের জামায়াতের পাপস্খলন প্রচেষ্টার অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেলো না।