ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

নিরপেক্ষ ইতিহাস নেই, ব্যক্তির নিজস্ব জীবনদর্শন এবং তার রাজনীতি প্রতিফলিত হয় তার লিখিত ইতিহাসে। শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয় এটা বিশ্বের সকল দেশের জন্য সমানভাবেই সত্য। ইতিহাসের একপেশে ধারাবিবরণী পড়লে খানিকটা বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যায় কারণ জাতীয় ইতিহাস রচনার সময় এ কাজে নিয়োজিত ঐতিহাসিকগণ নিজেদের বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ এবং প্রচলিত জনমতের চাপে নতিস্বীকার করে জাতীয় ইতিহাস হিসেবে নিজেদের যেভাবে তুলে ধরেন তা সব সময়ই অভ্রান্ত এবং নিরপেক্ষ থাকে না।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে মুসলমান ব্যবসায়ী-পুঁজিপতিদের সাথে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ী -পুঁজিপতিদের সংঘাত কিংবা আরও সোজাসাপটা বললে ইংরেজ লর্ড ও বড় লাটদের প্রথম স্ত্রী ও রক্ষিতা হয়ে উঠবার লড়াইয়ের যুযুদ্ধ্যমান পুঁজিপতিদের অনুগ্রহ লাভের লোভের বলি হয়েছে উপমহাদেশের সাধারণ মানুষেরা। এই লড়াইয়ের অস্ত্র হয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মানুভূতি এবং ইংরেজ বণিকেরা স্বীয়-স্বার্থে ধর্মভিত্তিক বৈষম্যবোধের আগুনে ঘি ঢেলেছেন।

উপমহাদেশের ইতিহাস ক্রমশঃ মুসলিম ও হিন্দু জনমানসের ইতিহাস হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে, মুসলমানগণ নিজেদের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস ও তাদের অবদানকে ইতিহাসের ভাষ্য করেছে এবং হিন্দুগণ মুসলমান লুণ্ঠকদের হাতে লুণ্ঠিত সামাজিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ক্ষয়-ক্ষতিকে নিজেদের ইতিহাসের উপজীব্য করেছে। এভাবেই ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর মুসলমানদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ অন্য দিকে অন্য সকল মানুষের স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন জহরলাল নেহেরু।

যারা ১৯৪৮কে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করতে চান তারা ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। সে কারণেই ইতিহাসের জনপ্রিয় বইগুলোতে আমরা পড়ি ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে দেওয়া ভাষণে জিন্নাহ বললেন “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” উপস্থিত ছাত্রেরা প্রতিবাদ করলো। ইতিহাসের ঠিক এই সময়টাতেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিনিধিদল যখন জিন্নাহর সাথে বৈঠক করলেন সে আলোচনায় জিন্নাহ যা বলেছিলেন সেটা কখনই উপস্থাপিত হয় না জনপ্রিয় ইতিহাসের পূঁথিতে। জিন্নাহ সম্মিলিত পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রধান্য দিয়েছিলেন এটা ঐতিহাসিক সত্য এবং তার পেছনে জিন্নাহর প্রদত্ত যুক্তি এবং সে যুক্তিখন্ডন করতে অলি আহমেদের দেওয়া পাল্টা যুক্তিও আমাদের নজরে পরে, কিন্তু জিন্নাহ খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা পূর্ব বাংলার জনপ্রতিনিধিগণ নির্ধারণ করবেন, সে বিষয়ে তার কোনো পালটা বক্তব্য নেই।

যারা রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করছিলো তাদের অধিকাংশই সংস্কৃতি-কৃষ্টি কিংবা নিজেদের ঐতিহ্যলগ্নতা থেকে এই আন্দোলনে যোগদান করেন নি, নিছক অর্থনীতি এবং মধ্যবিত্ত চাকুরীর লড়াইয়ে টিকে থাকবার প্রচেষ্টার একটি অংশ হিসেবে তারা এই আন্দোলন করেছেন। তারা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি চাওয়ার আগে চেয়েছিলো প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি। হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী পাকিস্তানে গিয়ে রাষ্ট্রভাষার সপক্ষে ওকালতি করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন নি। পরবর্তীতে তিনি নিজেও প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েছিলেন গণমাধ্যমে। পাকিস্তানের শাসক দলের কোনো সময়ই প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য আপত্তি প্রকাশিত হয় নি। কিন্তু পূর্ব বাংলার শিক্ষা সচিবের উস্কানিতে বিভিন্ন ক্যারিকেচার ও ভাষা সংশোধন প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিলো পূর্ব বাংলায়। আরবী হরফে বাংলা লেখা, বাংলা ভাষা থেকে অমুসলমানী শব্দ হটিয়ে বাংলা ভাষাকে মুসলমানদের লবজ করে তোলার প্রচেষ্টা এবং সেসব কার্য পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খাত থেকে বিশেষ বরাদ্দ এসেছে পূর্ব বাংলায়। জিন্নাহ যদিও ধর্মীয় বিবেচনায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি আদায় করেছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর তার লক্ষ্য ছিলো একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে পাকিস্তানে। তার প্রথম ভাষণে সে আশাবাদই ব্যক্ত করেছিলেন জিন্নাহ, আজ থেকে পাকিস্তানে কোনো হিন্দু নেই মুসলমান নেই, আজ থেকে সকলেই পাকিস্তানী।

তার মৃত্যু হয়তো পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হবে ভবিষ্যতে, কারণ পাকিস্তানের পরবর্তী প্রশাসকগণ জিন্নাহর আদর্শ থেকে সরে এসে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ব্ল্যাসফেমী আইনের কঠোর সমালোচনা করে নিজের দেহরক্ষীর হাতে নিহত হয়েছেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ কিংবা মুমূর্ষু বর্তমানে। সেখানে বছরওয়ারি কোটা পূরণে ইসলামী জঙ্গীরা মসজিদ আর ময়দানে নির্বিচারে সাধারণ মানুষদের হত্যা করছে। প্রশাসন কার্যত ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ অংশে বিভাজিত এবং বর্তমানের প্রেক্ষিতে ধর্মপন্থীরাই নিজেদের অধিকতর সংঘবদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। মানুষকে ও তার সহজাত মনুষ্যত্ববোধকে হত্যা করতে ধর্মীয় অনুশাসনের অস্ত্রে সমর সাজে সজ্জিত হয়েছে এইসব নব্যধর্মীয়হুজুগে মানুষেরা। পাকিস্তানের নিজস্ব ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে দেশটির বুদ্ধিজীবী অংশ যেভাবে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন, যেভাবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিকাশের একটি পর্যায়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয় তাতে এ সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে নিদারুণ পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার মানসিকতা এখনও সেখানকার বুদ্ধিজীবীদের আয়ত্ত হয় নি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে এর বিপরীত প্রক্রিয়া চলমান। এখানেও পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক বিচ্যুতি কিংবা বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশের ঘটনাগুলো বিশ্লেষিত হয় নি তেমন করে। সমস্যা ও সংকট এড়িয়ে একপেশে দোষারোপ করা হয়েছে পাকিস্তানের প্রশাসকদের, কিন্তু তারা যাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করে নিজেদের মতাদর্শিক বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, যারা যারা বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষকে সংশয়ী চোখে দেখেছিলেন, তারা নিজেদের পাপ স্খলনের জন্য অতিজাতীয়তাবাদী চাদরের আড়ালে নিজেদের লুকিয়েছিলেন। এই ধারায় হয়তো জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তুলনায় আলাদা মনোভাব পোষণ করেন একাডেমিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের কারণেই অন্তত নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত হয়েছিলো ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ ইয়াহিয়া পূর্ব নির্ধারিত অধিবেশন রদ করার সাথে সাথেই।