ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০০৭ এর ১১ই জানুয়ারী ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে মধ্যবর্তী তত্ত্ববধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিলো। এই মধ্যবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোর আভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করে। সে কারণেই ১১ই জানুয়ারী থেকে জরুরী ক্ষমতা অধ্যাদেশ বলবৎ হয়। সেখানে বলা হয়েছিলো “আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইন, চুক্তি বা আইনগত দলিলে বিপরীত যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই অধ্যাদেশের বিধানাবলী বা তদধীন প্রণীত বিধিসমূহ এবং বিধিসমূহের অধীন প্রদত্ত আদেশসমূহ কার্যকর থাকিবে৷”

সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষ্যমতে বিরাজনৈতিকরণের উদ্যোগ গ্রহন করে এবং দুর্নীতির অভিযোগে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ জন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির তালিকা প্রণয়ন করলেও, পরবর্তীতে ৫০ জনকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়েছিলো। আটক করা ব্যক্তিদের তালিকায় রাজনীতিতে জড়িত উভয় দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতারাও ছিলেন। পরবর্তীতে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার “মাইনাস টু” ফর্মুলা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তবে জরুরী অবস্থা এবং মজুতদারীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েও দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থতার কারণে ক্ষমতা গ্রহনের মাত্র ১ বছরের মাথায় এই সরকারের জনপ্রিয়তা তীব্রভাবে হ্রাস পায় এবং ২০০৮ সালের মধ্যবর্তী সময় থেকেই এই সরকার মূলত পলায়নের পথ খুঁজতে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে এই ২ বছর মেয়াদী ছদ্ম সামরিক শাসনামলেই দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান মইন উ আহমেদ নিজস্ব ইচ্ছায় আরও এক বছর বৃদ্ধি করে নেন তার সেনাবাহিনী প্রধান থাকবার মেয়াদ। পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই ২০০৮ সালের ২৮শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহনে অযোগ্য বিবেচিত হন।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দায়ের করা মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য ” রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছিলো। বিশেষ কমিটির নির্দেশনা অনুসারে ২০০৯ সালের ১৭ই মে’র ভেতরেই মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা যাবে। সে উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় ”রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার” বিষয়ক জেলা পর্যালোচনা কমিটি গঠিত হয়। ২০১০ এর ৮ই জুন এই বিশেষ কমিটির ১৯তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, সে দিন কমিটির বৈঠকে দুদকের ৭৬১টি মামলা উত্থাপন করা হয়। কমিটি যাচাই-বাছাই করে ৪১১টি আবেদনে সুপারিশ, ৯০টি আবেদন নাকচ ও ২৬০টি আবেদন পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ৮ই জুন ২০১০ সালে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে ” সরকার গঠিত কমিটি এপর্যন্ত কমিটির সামনে আসা সাড়ে আট হাজারের বেশি মামলার মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে।
আইন প্রতিমন্ত্রী বলছেন যেসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই বিগত বিএনপি সরকারের সময় দায়ের করা।”

২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে সংসদে প্রশ্নোত্তর চলাকালীন সময়ে সরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন প্রশ্নের উত্তরে জানান
“বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত দেড় বছরে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় ছয় হাজার ৩৯২টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন দণ্ডবিধি এবং অন্যান্য আইনে থাকা এসব মামলা এখন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি যাচাই-বাছাই করে এসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে বলেছে। প্রত্যাহারের জন্য বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা রয়েছে দুটি। এসব মামলা প্রত্যাহারে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি।”

২০১০ সালের ২৮শে ডিসেম্বর এই বিশেষ কমিটির ২৪তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

২৪তম বৈঠকে উপস্থাপিত ১৭০টি মামলার ১৪৫টি ছিলো ফৌজদারী বিধিতে দায়ের করা মামলা। রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মমলা বিবেচনার জন্য গঠিত বিভিন্ন জেলাওয়ারী কমিটি ১০২৯৩টি ফৌজদারী মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা ৫১৮টি মামলা অদ্যাবধি বিবেচনার জন্য গৃহীত হয়েছে, এর ভেতরে ৬৬৩৫ ফৌজদারী মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর ভেতরে খুন ও ডাকাতির মামলায় রয়েছে। রাজধানীর দক্ষিণখানে সংঘটিত ডাকাতির সময় ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হামিদকে গুলি করে হত্যা করা হয়, এ সময়ে ডাকাতদের গুলিতে আব্দুল হামিদের কন্যা ফারাহ হামিদও গুলিবিদ্ধ হয়। সে মামলাও রাজনৈতিক হয়রানিমুলক মামলা হিসেবে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে এই বিশেষ কমিটি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু সাংবাদিকদের বলেছেন” সরকারের নির্দেশনা মেনেই আমি মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ গ্রহন করেছি, অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতা কিংবা ডাকাত হলেও আমার কিছু করার নেই, আমাকে সরকারের নির্দেশনাঅনুসারেই কাজ করতে হচ্ছে।”

যদিও দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারেরজন্য বিশেষ বিবেচনায় এই কমিটি গঠিত হয়েছিলো এবং কমিটির সুপারিশে হাজী সেলিম এবং অন্যান্য অনেকেরই দুর্নীতির সাজা মওকুফ করা হয়েছে তবে দুদকের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, কমিটি কম সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ পাঠাচ্ছে। রাজনৈতিক কমিটির সুপারিশে দুদক দুর্নীতির অভিযোগ থেকে কাউকে রেহাই দিতে পারে না।

এ বছর ৩রা জানুয়ারী ডেইলী স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাপ রত্যাহারের নামে এইসব ফৌজদারী মামলা , ডাকাতি ও হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশে বিষ্ময় প্রকাশ করা হয়। আজ প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবেচনা করে সরকার ৪ জনকে খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার কমিটিতে রাজনৈতিক অসূয়াপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করবার সময় দলীয় নেতারা স্বজন ও দলীয় কর্মীদের ফৌজদারী অপরাধগুলোকেও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নিতে চাইবেন এমন আশংকা এই কমিটি গঠিত হওয়ার সময়ই প্রকাশ করা হয়েছিলো, তবে সরকার কেনো বিশেষজ্ঞদের এই আশংকা আমলে নিতে চান নি তা এখনও বোধগম্য না। এমন ভাবে যদি সকল রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের সকল অপরাধই মার্জনীয় বিবেচিত হয় তবে দেশে কখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্যে অত্যুৎসাহী আইন বহির্ভুত মামলার তান্দবে প্রকৃত অপরাধীদের অধিকাংশই পরবর্তীতে হাইকোর্ট থেকে অপরাধের দায়মুক্ত হয়েছিলো এবং নির্বাচিত সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে এখন অন্যান্য অপরাধীদের অপরাধ মার্জনা প্রকল্প গ্রহন করেছে।
‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভাপতি আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন
সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এসব মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধরে নেওয়া হবে।
স্বয়ং পুলিশ এসব মামলা প্রত্যাহারের বিরোধিতা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়কে চিঠি দেয়। সরকারী নির্দেশনায় প্রস্তাবিত সকল মামলা প্রত্যাহার করা হলে সেটা আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এমনটা আশংকা করাই যুক্তিসংগত, এমন যুক্তিসংগত অভিমতই প্রদান করেছেন
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ এস এম শাহজাহান, তিনি জানিয়েছেন “মামলা তার মতোই চলতে দেওয়া উচিত। মাঝপথে মামলা প্রত্যাহার হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার ধারণা মানুষের মনে জন্মাতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অরাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা কোনোভাবেই উচিত নয়। ”

——————-
ফিচার ছবি: ছবিসূত্র বাংলার চোখ। নাটোরের যুবদল নেতা গামা হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষণায় মুক্তি পাওয়া ২০ জনের মধ্যে ৭ জনকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার (মাঝে কোট পরিহিত) ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। ইনসেটে নিহত সাব্বির আহমেদ গামা।
——————-