ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সিটিজেন জার্নালিজম

“ব্লগিং” কিংবা নিজের অন্তর্জালিক দিনপঞ্জি লিখে রাখা এবং “নাগরিক সাংবাদিকতা”র তফাতটা কতটুকু? আমি নিজে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু আমার যেকোনো মতামত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুসিদ্ধান্ত কিংবা পর্যবেক্ষণ, সুতরাং যেকেউ আহত হলে সেটা মতাদর্শিক কিংবা দার্শনিক বিরোধজনিত অনুভূতি।

যখন দিনপঞ্জি ধাঁচের ওয়েবলগ রাখবার ধারণার জন্ম হয়েছিলো তখন এটার ভবিষ্যত ” নাগরিক সাংবাদিকতা”য় সমাপ্ত হবে এমনটা সবাই উপলব্ধি করতে পারে নি,”সিটিজেন জার্নালিজম” এবং ওয়েবলগের চরিত্রগত ব্যবধানটুকু এখনও যে সবাই উপলব্ধি করেছে এমনও না। ব্লগিং এবং সিটিজেন জার্নালিজমের ফারাকটুকু শুধুমাত্র উপস্থাপনের ভঙ্গির নয় বরং দুটোর মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা। আর যে কারণেই সম্ভবত “আত্মপ্রকাশের পীড়নে” প্রসবযন্ত্রণাকাতর ব্লগিং এবং নিজস্ব মতামত উপস্থাপনের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলে মানুষ। আমার নিজস্ব কিছু ভাবনা আছে এ বিষয়ে, কম্যুনিটি ব্লগিং এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে “সিটিজেন জার্নালিজম” এর কৌশলী ব্যবহার বিষয়ে পরবর্তী আলোচনার আগে সম্ভবত কিছুটা ভিন্ন আলোচনা জরুরী।

ফাহমিদুল হক প্রথাগত সাংবাদিকতার ৪০ বছর লেখায় সাংবাদিকতার ৩টি পর্যায়কে চিহ্নিত করেছেন, তিনি পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে সংবাদপত্রের বিবর্তন, এদের চরিত্রগত বিবর্তন এবং গঠনতান্ত্রিক বিবর্তনের সামান্য আভাষ পাওয়া যাবে এই নিবন্ধে।

উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে যখন পূর্ব বাংলা-পশ্চিম বাংলা হলো এবং যখন ঢাকা পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হলো তখনও ঢাকা থেকে কোনো দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না, প্রতি সপ্তাহে দুই বার পত্রিকা প্রকাশিত হতো যে সময়ে সে সময় থেকে বর্তমানের প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন পত্রিকার দোকানে না গিয়েও পত্রিকা পড়া সম্ভব, প্রতিটি পত্রিকার আওন লাইন সংস্করণ আছে। তবে ফাহমিদুল হক বর্তমানের দৈনিক পত্রিকাকে বলছেন কর্পোরেট গোষ্ঠীর মুখপত্র এবং কথাটা বহুলাংশেই সত্য- দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা দৈনিক পত্রিকা এবং মাসিক পত্রিকা প্রকাশনার সাথে যুক্ত হয়েছেন। তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং একটা ভোক্তা শ্রেনী তৈরির প্রচেষ্টা এদের আছে। ব্যবসায়িক কারণেই এদের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর সাথে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনাও যুক্ত থাকে। পাঠক চাহিদা ও রুচির দিকে খেয়াল রেখে গৃহস্বজ্জা উপকরণের তথ্য, পড়াশোনা, চাকুরির তথ্য, শিশুতোষ কলাম, কম্পিউটারের টুকিটাকি, বেচা কেনা ও প্রেমের প্রস্তাবনা, যা যা একজন অন্য একজনকে জানাতে ইচ্ছুক সবই প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকাবাহিত হোয়ে পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরে।

সময়ের দাবির সাথে পাল্লা দিয়ে অধিকাংশ দৈনিক হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টারের বিকল্প। তাদের পাতায় থাকছে বিসিএস পরীক্ষা প্রস্তুতি, মডেল টেস্ট, ক্লাশ ওয়ান থেকে শুরু করে ডিগ্রী পরীক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্নোত্তর। থাকছে সাহিত্য পাতা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সম্পাদকীয় প্রধান সংবাদ পত্র থেকে এমন বহুমুখী চাহিদাপূরণকারী সংবাদ পত্রের পথ পরিক্রমার সাথে সাথে সংবাদ পত্র নিজেই একটি রাজনৈতিক মতাদর্শহত্যাকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে।

প্রকাশনা শিল্পের সাথেই প্রকাশনা নিয়ন্ত্রনের ইতিহাস রচিত হয়েছে, সাইবার পরিসরে বিকল্প মাধ্যমের খোঁজে ফাহমিদুল হক সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।

ইউরোপে যখন প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতে শিপিং, ব্যাংকিং, যুদ্ধ-সংঘাত এবং উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণীর চলমান ভাবনা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশিত হতো। এর বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণীর চেতনা উন্নয়নের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকা প্রকাশিত হতো, সেসব পত্রিকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশ সরকার কাগজের ওপর করারোপ করে, লাইসেন্সপ্রথা চালু করে, প্রকাশকদের হেনস্থা করে

সে বিবেচনায় এখনকার কর্পোরেট কবলিত সংবাদপত্রও একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীর মুখপত্র হিসেবেই তাদের আদর্শ প্রচারের যন্ত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে মুক্তির খোঁজে বিকল্প এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের উৎস হোয়ে উঠেছে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’। অবশ্য সিটিজেন জার্নালিজম তেমন প্রভাবশালী হোয়ে উঠবার আগেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসার ঘটেছে অন্তর্জালে ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কম্যুনিটি সাইট এবং কম্যুনিটি ব্লগিং এর ভেতরেই মানুষ নিজের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করতে অভ্যস্ত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যের প্রতি আস্থা কিংবা অনাস্থা, তীর্যক পর্যবেক্ষণ এবং তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের সুযোগ করে দিয়েছে ব্লগিং এবং কম্যুনিটি ব্লগিং এর মন্তব্যের সুবিধা আরও অনেকের সাথে ভাব বিনিময়ের সুযোগ বাড়িয়েছে।

এটুকু পশ্চাত্পট রেখে ” সিটিজেন জার্নালিজম” সংক্রান্ত ধারণা প্রকাশ করা সম্ভব। প্রকাশিত তথ্যের বিশ্লেষণ, বিকল্প মতাদর্শের উপস্থাপন, নিজস্ব ভাষ্য এবং উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা সমেত একটি সংবাদকে নতুন করে উপস্থাপন করা। এর বাইরে স্থানীয় সংস্কৃতির সচিত্র উপস্থাপন এবং যেকোনো নতুন দার্শনিক মতকে নিজস্ব ভাবধারায় বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলো, যা নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি হয়েও একটি সামগ্রিক ধারনার অংশ, সেটুকুই ‘ সিটিজেন জার্নালিজমের” পরিসর। এর বাইরে গল্প কবিতা, সাহিত্যের উপাদান জীবনে আছে, হয়তো নিজের বিরহ-যাতনা, নিজের যৌন-চেতনা এবং নিজের বিমর্ষতা ও সঙ্গী কামনাও ব্যক্তিগত ব্লগের অন্তর্ভুক্ত হয়ে উঠতে পারে কিন্তু সেসব কোনো ‘সিটিজেন জার্নালিজম” এর অংশ না।

কম্যুনিটি ব্লগিং এর পথিকৃত হিসেবে সামহোয়ার ইন ব্লগ যেখানে পৌঁচেছে, সেটার পিছু ধাওয়া করেছে অনেকে। প্রথম আলো ব্লগ ব্যর্থ হয়েছে কারণ সেটা সিটিজেন জার্নালিজম প্রোমোট না করে হয়ে উঠেছে পাঠক ফোরামের অন্তর্জালিক ভার্স। সচলয়াতন হয়ে উঠেছে সাহিত্য পত্রিকা এবং আমার ধারণা অন লাইনে সেরা বাংলা সাহিত্য পাতা এটা। আমার ব্লগ মডারেশনমুক্ত স্বাধীন ব্লগিং এর স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলো, তবে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় উপলব্ধি করেছে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমানাটুকু কেউ চিহ্নিত করে না দিলে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা আছে।

এর বাইরে ব্যক্তিগত মান অভিমানে যেসব ব্লগসাইট গড়ে উঠছে সেসবগুলোতেই সাহিত্যচর্চার সুযোগ আছে, গলাবাজি এবং দায়িত্বহীন আচরণের সুযোগ আছে, সেসব দিকে ধাওয়া করে বিডিনিউজ বেশীদুর যেতে পারবে না। কিন্তু সম্ভবত বিডিনিউজ সে দিকেই ধাবিত হচ্ছে- বড়ের ঔজ্জ্বল্যে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ঈর্ষায় নয় বরং নতুন কিছুর সূচনা করে সেটাতে সাফল্য লাভের প্রচেষ্টা করাটাই এই ব্লগাধিকারীদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিলো, সে কারণেই আরও সচেতন হয়ে উঠলে আশাবাদের নিভে যাওয়া দীপ জ্বলতে পারে।

আমার ধারণামতে সিটিজেন জার্নালিজমের চর্চা করছে এমন বেশ কয়েকজনের তালিকা দিয়ে যাই, যারা কষ্ট করে পড়বেন তারা উপলব্ধি করবেন আদতে বিষয়টা কেমনঃ

রেজওয়ান – গ্লোবাল ভয়েস অনলাইনের সাথে যুক্ত আছেন অনেক দিন
দিনমজুর– সাম্যবাদে বিশ্বাসী একদল যুবক
এস এম মাহবুব মোর্শেদ
সচল জাহিদ

তবে সচলায়তনে অনেকেই চমৎকার লিখেন, “হাসান মুরশেদ“, আমার ব্লগের ” যুদ্ধদেব” কিংবা “হোরাস”, কিংবা নিজস্ব ওয়েব সাইটে “হাসিব” – এদের মতো বেশ কয়েকজন, যাদের নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না, ব্লগিংয়ের ধারা অক্ষুন্ন রেখেও আদতে সিটিজেন জার্নালিজমের চাহিদাই পুরণ করছেন। এখানে আইরিন সুলতানার লেখাটাও তেমনই সিটিজেন জার্নালিজমের চরিত্র ধারণ করে আছে, এর বাইরে হয়তো তেমন আলাদা নিদর্শন দেখানো সম্ভব হবে না।