ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

যেকোনো একটি দেশে যেকোনো একটি সময়ে ক্ষমতাবানদের ভেতরে যুথবদ্ধতার শর্ত সবসময়ই ক্রিয়াশীল ছিলো, রাজনৈতিক মতবিরোধ, রাজপথের সহিংস বৈরিতা পারস্পরিক হৃদ্যতার সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না কখনও। ক্ষমতাবানদের সমর্থনের প্রশ্নে পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানসিক টানাপোড়েন থাকলেও রাজশক্তির আশীর্বাদপুষ্ট বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানসিক সুবিধালোভী চরিত্রের কোনো পরিবর্তন আসে না।

ক্ষুদ্রঋণ আদৌ বিদ্যমান দারিদ্রের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদ্ধতি বিবেচিত হতে পারে কি না এটা নিয়ে বোদ্ধা মহলে সংশয় থাকলেও ইউনুসের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রশংসা না করলেই নয়, তিনি তার ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি অর্থনৈতিক চক্রসঞ্চালন শুরু করেছেন যেখানে এমন কি ভিখারীর থালা থেকেও ঘষা পয়সা আ’টানা চার আনা তুলে যেকোনো স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সামাজিক দারিদ্র ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে। ইউনুস অন্তত প্রমাণ করেছেন বড় বড় শিল্পপতিকে ঋণ দেওয়ার তুলনায় গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ঋণ দেওয়া অধিকতর লাভজনক। বড় বড় শিল্পপতিদের একাংশ সরকারের অর্থ লোপাট করে আজ বড় শিল্পউদ্যোক্তা হয়েছে্ন, লাইসেন্স এবং পারমিট বিক্রী করে যারা কয়েক দশক আগে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছিলেন তাদের একাংশ হঠাৎ করেই সামাজিক সুশীল হয়ে অবসর জীবন যাপন করছেন এবং তাদের নীতিনৈতিকতার বানী বিভিন্ন গণমাধ্যমে বড় বড় হেড লাইনে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এইসব শিল্পপতি পরিবারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের সুবাদে তারা বাংলাদেশের মতো আইনশৃঙ্খলার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্রে যেকোনো আইনী বাধ্যবাধকতার উর্ধ্বে থেকে ঋণগ্রস্ত অবস্থায় দাপটের সাথে জীবন যাপন করতে পারেন। তাদের অনাদায়ী দেনা ‘ অপরিশোধিতব্য ঋণ’ হিসেবে মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সমাপ্ত হয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষেরা হঠাৎ করেই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে সরকারের সাথে দেন দরবার করছেন। সে তুলনায় গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের পরিধি সীমিত, খুব বেশী হলে কয়েক ঘর পড়শি নিয়ে তাদের পৃথিবী, সে পৃথিবীকে তছনছ করে দেওয়া সহজ।

ইউনুস বলেছিলেন ঋণ মানবাধিকার, ঋণ পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে, সে কারণেই তিনি দরিদ্র নারীদের ঋণ প্রদান করেন, যেনো তারা স্বাবলম্বি হয়ে উঠতে পারে, যেনো তারা দারিদ্রের শেকলমুক্ত হয়ে বাঁচতে পারেন, ডেনমার্কের সাংবাদিক টিম এই প্রথাটিকেই প্রশ্ন করেছেন, বলেছেন ঋণ পাওয়া যদি কখনও মানবাধিকার বিবেচিত হয় ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা কোনো ভাবেই মানবাধিকার সম্মত হতে পারে না। একজন কখনই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মৃত্যু বরণ করতে চান না।

ইউনুস অবশ্য বলেছেন তিনি সেইসব উদ্যোক্তাদেরই ঋণ প্রদান করেন প্রথাগত ব্যাংকগুলো যাদের বন্ধকযোগ্য সম্পত্তি না থাকায় ঋণ প্রদানে অনাগ্রহী, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য সকল দারিদ্রের লাভজনক সামাজিক ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিগন কোনো সহায় সম্পত্তি বন্ধক হিসেবে না রাখলেও তারা কয়েকজন ঋণগ্রহীতাদের নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরী করেন এবং এই গ্রুপ সম্মিলিত ভাবে সকলের ঋণের দায় বহন কওরে। এই গোষ্ঠী নিজস্ব অভাবে নৃশংস, এভাবেই “কাঁটা দিয়ে কাঁটা ” তুলবার মতো দরিদ্রদের দিয়েই দরিদ্রদের নিষ্পেষণের এবং ঋণের কিস্তি উত্তোলনের নিশ্চিত বন্দোবস্ত করেছেন যিনি তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রশংসনীয়।

টিমের ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে আটক পড়া মানুষদের জীবন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের নিপূন উপস্থাপনায় ক্ষুদ্রঋণের মাকড়সার জালে আটকা পড়া মানুষদের দুর্ভোগের সাথে সাথে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানুষদের মন্তব্যও উপস্থাপন করা হয়েছে। জোবরা গ্রামের সুফিয়ার কন্যার ভাষ্যে ইউনুসের কল্পিত সৌধের ভিত্তি ধ্বসিয়ে দিয়েছেন টিম, তবে এরই প্রতিক্রিয়ায় নির্মীত অন্য একটি “সত্য ভাষণ” তথ্যচিত্রে নির্মিত হয়েছে, সেখানে সুফিয়ার কন্যা অস্বীকার করেছেন তার মায়ের সাথে গ্রামীণ ব্যংকের সংশ্লিষ্ঠতার কথা। তিনি বলেছেন তার মা কখনই গ্রামীণ ব্যংক থেকে ঋণ গ্রহন করেন নি। সুফিয়া কন্যার ” ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে ” আটকা পড়োবার অভিযোগের অস্বীকৃতি এবং একই সাথে জনৈকা চানা বেগমের স্বীকারোক্তি তিনিই ইউনুসের কাছে প্রথম ঋণ গ্রহন করেছিলেন, উভয় ্তথ্যচিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে । দ্বিতীয় তথ্যচিত্রের নির্মাতা বলেছেন ইউনুস ঋণগ্রহীতাকে সামাজিক অসম্মান কিংবা অন্য কোনো কিছুর দায় থেকে বাঁচাতেই তার প্রকৃত পরিচয় এড়িয়ে গিয়েছেন। এখানে চিত্রে ভাষ্যে নির্মিত একটি অভিযোগ অন্য একটি চিত্রভাষ্যময় প্রতিরোধে পথ হারায়।

ইউনুসের সাম্প্রতিক কর্মকান্ড এবং নরওয়ের রাষ্ট্রদুতের স্বচ্ছতার দাবীর প্রেক্ষিতে তার পত্রযোগাযোগের নমুনা দেখে আমার মনে হয় না তিনি এতটা শোভন মানুষ, তিনি যেমন কাতর অনুনয় করে নিজের কর্মকান্ডকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন তাতে অন্তত বিশ্বাস হয় না তিনি নিজের আত্মসম্মানকে যতটা খেলো করেছেন তাতে তার অন্যের আত্মসম্মান কিংবা সামাজিক গৌরবের বিষয়ে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। তিনি গ্রামীণ ব্যংকএর ব্যবস্থা পরিষদ থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর সেটাকে আইনত প্রতিরোধ করবার আগেই ফোন করেছেন বিদেশী বন্ধুদের, যারা তার জন্য ফ্রেন্ডস ওফ ইউনুস সংগঠন খুলেছেন।

আমাদের মানসিকতায় মাত্রাতিরিক্ত পশ্চিমাপ্রীতি বিদ্যমান, সে কারণেই টিমের তথ্যচিত্র নির্মিত হওয়ার অনেক আগেই আনু মুহাম্মদের প্রবন্ধে ক্ষুদ্র ঋণের দারিদ্রনিরসনী ভুমিকা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হলেও সেটা তেমন পাত্তা পায় নি বোদ্ধা মহলে। কিন্তু সাদা চামড়ার উন্নত দেশের সাংবাদিক টিম যখন ইউনুসের মীমাংসিত দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরেন, তার ভিত্তিতে সাংবাদিকেরা ব্রেকিং নিউজ ছাপাতে তৎপর হয়ে উঠে। আবার অন্য একজন ‘সফেদ বালিকা’ যখন টিমের তথ্যচিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তখন ইউনুস সমর্থক গোষ্ঠী সেটাতেই উদবুদ্ধ হয়ে উঠে।

“সাদা চামড়ার ইশ্বরেরা মিথ্যা বলেন না, তারা কল্যানকামী ইশ্বর”, এই বর্ণবাদী ধারণাকে বিশ্বাস করে লজ্জিত হওয়ার মতো মানুষ কম বাংলাদেশে। আমাদের মানসিক দীনতা কিংবা আত্মসম্মানহীনতায় আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান খুজতে কিংবা সে বিভেদের পশ্চিমা সমাধান খুজতে আমাদের সাংবাদিকেরা ক্যামেরা আর মাইক্রোবাস নিয়ে হামলে পড়েন দুতাবাসের সামনের চত্ত্বরে, সেখান থেকে আশ্বাসবানী ভেসে আসলে আমাদের নাগরিক প্রাণ নিশ্চিত হয়।

ক্ষমতাবান এলিটদের তেমন আদর্শিক কিংবা রাজনৈতিক বিরোধ নেই, সে কারণেই টিমের তথ্যচিত্রে ক্ষুদ্র ঋণকে বিদ্রুপ করা খুশী কবির ফ্রেন্ডস অফ ইউনুস গঠিত হওয়ার পরে ইউনুসের সমর্থনে বিবৃতি দেওয়া গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবীর একজন হিসেবে মঞ্চে আবির্ভুত হন। খুশী কবিরের সাথে আমার গণমাধ্যমে পরিচয় ঘটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তার মতামত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর, সেখানে তিনি তার বোন এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তা সিগমা হুদার অমানবিক আটকাদেশ নিয়ে লিখেছিলেন।

সিগমা হুদাকে বিশেষ জজ আদালত ০২ ২০০৭ সালের ২৫শে আগস্ট দুর্নীতির অভিযোগে তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন। এই মামলার আইনগত ভিত্তি দুর্বল ছিলো কারণ যে আইনে তাদের বিচার কার্য সম্পাদিত হয় দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সময় বাংলাদেশে সেই আইন বলবত ছিলো না, কিন্তু এই আইনী বিতর্কেও দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে সিগমা হুদার অপরাধের দায়মোচন হয় না।

আমাদের এলিটদের এই দ্বিচারিতা, আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর পেন্ডুলামের মতো সত্য, বাস্তবতা এবং ক্ষমতার চড়াই উৎরাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চাওয়ার স্পৃহাকে বেশ মানবিক আচরণই মনে হয়, নিজের জীবন ও নিশ্চিত জীবিকাকে ঝুকিমুক্ত রাখতে তাদের এই প্রয়াস অন্য সব আটপৌরে মানুষদের তাদের পার্থক্য কমিয়ে দেয়, আমরা উপলব্ধি করি নিজের বিবেক ও শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে তিনি তার উপরে অর্পিত সামাজিক দায়িত্ব এড়াচ্ছেন কারণ তিনি আমজনতার মতোই ক্ষমতাবানদের চক্ষুশীল হতে চান না। তিনি আমাদের মতোই মানুষ যিনি যেদিকে বৃষ্টি সেদিকে ছাতা ধরে আসন্ন ঝড় থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। কিন্তু সরকারের স্পষ্ট অনীহা উপেক্ষা করে খুশী কবির এবং ইউনুসের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যখন প্রকাশ্য বিবৃতি দেন তখন নিশ্চিত হই তাদের আস্থার জায়গা সম্ভবত ফ্রেন্ডস ওফ ইউনুসের তালিকায় উল্লেখিত হাইপ্রোফাইল মানুষেরা, নিছক বাঙালী আবেগে তারা ঝুকি নিয়ে বৈপ্লবিক অবস্থান নিয়েছেন এমনটা আমার বিশ্বাস হয় না, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি জানি ‘ ছাগল লাফায় খুটির জোরে।”