ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী পুত্র মাসুদ সাঈদীর হাত থেকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডের সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ ও সাঈদী পুত্রকে প্রধান অতিথি রেখে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান দেখে সারাদেশের মানুষ বিষ্ময়ে হতবাক হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা নামদারী ওইসব খোলসধারীদের এহেন কাজে আমি মোটেও হতবাক বা আশ্চর্যান্বিত হইনি।কারণ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্ষমতা দখলে রাখতে রাজাকার সমর্থিত কিছু সংখ্যক কলঙ্কিত মুক্তিযোদ্ধাদের এ ধরনের আপোষকামীতা অতীতে আমরা বারবার দেখে অব্যস্ত।আমরা যদি নিকট অতীতের দিকে একটু দৃষ্টি দেই তাহলে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠবে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। পাশাপাশি সকল স্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি ভোটে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ২০০১ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটউটে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কাউন্সিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওই কাউন্সিলে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান পৃষ্টপোষক করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটি গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। গঠনতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র সংযোজিত হয় এবং কয়েকটি অঙ্গ সংগঠনের সাথে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সংগঠনটিও অন্তর্ভূক্ত হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনা ওই কাউন্সিলে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মতামতের ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র অনুমোদন দেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসীন হয়। এরপর রেদোয়ান আহমদের নেতৃত্বে এক শ্রেণীর রাজাকার সমর্থিত কলঙ্কিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নির্বাচিত কমিটিকে সংসদ থেকে বিতাড়িত করে চর দখলের মতো সংসদ দখল করে নেয়। সংসদ দখল করে তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতৃবৃন্দ গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পরামর্শ ও নির্দেশক্রমে সংসদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের কাজে হাত দেয়। গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে গিয়ে তারা প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান পৃষ্টপোষক হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নাম বাদ দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নাম অন্তর্ভূক্ত করে। তারা গঠনতন্ত্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নামের স্থলে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম অন্তর্ভূক্ত করে। এভাবে কর্তন, সংশোধন ও বিয়োজনের মাধ্যমে ’আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সংগঠনের নামটিও বাদ দেয় এবং ওই স্থানে ’মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমাণ্ড’ নামটি অন্তর্ভূক্ত করে।কিন্তু ওই সময় অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের পুরো আমলেই তারা এই সংগঠনটিকে কার্যকর করতে পারেনি।
২০০৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার আবারো ক্ষমতায় আসে। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধা সংসদেও নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে গড়া সংগঠন “আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান” -কে পাশ কাটিয়ে এখনো রাজাকারদের পরামর্শে গঠিত সংসদের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে “মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড” গঠনতন্ত্রে রয়ে গেছে। আর আমাদের শ্রদ্ধাভাজন পিতৃতুল্য মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে বুঝে-না বুঝে, সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে ওই সংগঠনকেই নিজেদের বলে সমর্থন দিচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই হচ্ছে আপোষকামিতার একটি নমুনা। নৈতিক স্খলনের এমন হাজারো উদাহরণ রয়েছে। অতীতে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিজেদের ’জয়বাংলা’ স্লোগান ছেড়ে পাকিস্তানি ’জিন্দাবাদ’ স্লোগানে গলা ফাঁটাতে দেখেছি। তাই এখন আর এ ধরনের ঘটনায় অবাক বা হতবাক হই না। আমি শুধু প্রার্থনা করি সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের ’হেদায়েত’ করেন।