ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
education_blue_key_on_keyboard

ইতিহাস বিকৃতি শুধু ইচ্ছে করে করা হয় ঠিক তা নয়। এমন অনেক বিষয় আছে তা অল্প জানা থেকেও হয়ে থাকে । সেই অল্প জানা ঘটনা গুলোই মনের অজান্তে শাখা প্রশাখা হয়ে নতুন রুপে আবির্ভূত হয় । তাইতো সঠিক ইতিহাস জানা যেমন জরুরি তেমনি যে ইতিহাস ফেরি করে বেড়ায় তাকেও সতর্ক থাকা আরো জরুরী । যাতে ভিন্ন ভাবনা সঠিক ইতিহাসকে প্রভাবিত করতে না পারে । বলছি ইতিহাস সুরক্ষার কথা । আমারা বার বার শুনতে পাই ইতিহাস বিকৃতি শব্দখানি । আচ্ছা আপনাদের কি ধারণা আছে কিভাবে একটি ইতিহাস ভিন্ন রুপে বার বার উপস্থিতি দেয় ? সেই প্রশ্নটি আমার মাঝেও উঁকি দেয়না তা ঠিক না ! আসলে বিষয়টি জটিল । যে ঘটনাটি ঘটেছে তা কিভাবে পরিবর্তন হয় ? আমরা যখন পোস্ট অফিসের মাধ্যমে চিঠিপত্র পাঠাই তখন কিন্তু যা লিখি ঠিক তাই প্রাপক পেয়ে থাকে । কোন প্রকার পরিবর্ধন বা পরিবর্তন হয় না । সেখানে তো ঘটনার কোন বিকৃতি হচ্ছেনা ! কারন পোস্ট অফিস বা পিয়ন ঐ চিঠিটা খুলছেনা বা পরিবর্তন করছেনা । আমাদের কেও সঠিক ইতিহাস ধরে রাখার জন্য ঠিক ঐ পিয়নের মত কাজ করতে হবে । একজন ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে আমি তাই মনে করি । আমি হলাম সেই চিঠি বাহক । যার কাজ শুধু ঘটানাটি পৌছে দেওয়া। অতি সতর্কভাবে ।

এখন ভাবনার বিষয় ঘটানাটির পৌঁছানোর দায়িত্ব কে নিচ্ছে? ইতিহাসবিদ না অন্য কেউ? যদি অন্য কেউ নিয়ে থাকে তাহলেও সমস্যা নাই যদি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে উপস্থাপন করে । তবে ব্যাঘাত ঘটবে তখনি যখন ইতিহাস পৌছানোর পদ্ধতিটি দুর্বল থাকে সেই ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদেরও করার কিছু থাকেনা । এবার আসি মূল প্রসঙ্গে । একটা ঘটনা শেয়ার করি, কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী পরীক্ষার পরিদর্শনে । সেখানে দেখা আমার এক ছাত্রের সাথে । তখন সে বলল একটি লেখা প্রিন্ট করতে যাচ্ছে । কৌতূহল বশত আমি কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম । সেখানে পুরো লেখা ঠিকই আছে তবে জন্ম সাল ও তারিখ লিখা নেই । আমি বললাম এটি খালি কেনো? সে বলল এতে সমস্যা নাই স্যার কম্পিউটার দোকানের অপারেটরের জানা আছে । চিঠিটা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে নিয়ে । তখন মন খারাপের চোখে তার দিকে তাকালাম । যাই হোক তখন ভাবলাম এভাবে যদি নিজের জানা প্রয়োজন এমন তথ্য অন্যের কাঁধে রেখে দেই তাহলে সঠিক ইতিহাসতো অন্য দিকে মোড় নিতেই পারে ! এবার আসি ইতিহাস সংরক্ষণে সরকারের কিছু সাহসী উদ্যোগে । এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা অনার্স পড়বে সেসব শিক্ষার্থী বাংলাদেশের ইতিহাস সঠিক ভাবে শেখানোর জন্য একটি নতুন কোর্স চালু করেছে । যা আবশ্যিক । বিষয়টির নাম ‘ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ । চমৎকার উদ্যোগ । যা প্রশংসনীয় । তবে বিপত্তিটা অন্যখানে । ঐ যে আগে বলেছি ইতিহাস পৌছে দেবার পদ্ধতির উপর নির্ভর করবে সঠিক ইতিহাসে পারদর্শী হতে । একটি সঠিক উদ্যোগকে আমি মনে করি একটি চারা গাছ। ছোট গাছকে যেমন অতি পরিচর্যার মাধ্যমে পরিণত বৃক্ষে রূপান্তর করা যায় তেমনি একটি উদ্যোগকে সেই চারা গাছের মত যত্ন করেই পরিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় ।

উল্লেখিত বিষয়টিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । যা আমাদের বাঙ্গালির আত্মমর্যাদার ইতিহাস হিসেবেই আমি মনে করি । এটি শুধু শিক্ষার্থীর প্রয়োজন তা নয় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জানা আবশ্যক। এখন আমার প্রশ্ন হলো এই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীর নিকট আমরা কিভাবে যাচ্ছি । সবাইকে এই বিষয়ের আওতায় আনতে পেরেছি কি না ? বা সঠিক ভাবে পড়াতে পারছি কি না ! আসি একটু পরিসংখ্যানে । বড় কলেজগুলোতে ২৫০০০ বেশি শিক্ষার্থি থাকে । এছাড়া প্রতিটি বিভাগে প্রতিটি সেশনে ২৫০/২০০ শিক্ষার্থী থাকে । এখন হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক দ্বারা কি সম্ভব এই বাঙালির ইতিহাস সঠিকভাবে সবার কাছে পৌঁছানো। তা মোটেও সম্ভব নয় । কারন এই বিষয়টি কে পড়াবে তা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এক আদেশের মাধ্যমে নির্ধারিত করে দিয়েছেন । নির্দেশটি এমন- ‘কোর্সটি ইতিহাসের শিক্ষকগণ পাঠদান করাবেন। যেখানে ইতিহাসের শিক্ষক নেই সেখানে রাষ্ট্র বিজ্ঞান, যদি এই দুই বিষয়ে কেউ না থাকে তাহলে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষকগণ পাঠদান করাবেন’। আমার ভাবনা হলো যেখানে বাংলাদেশে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট যা নিজ বিষয়ের অনার্স পড়াতেই হিমশিম খাচ্ছে সেখানে কিভাবে অন্যান্য অনার্স বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এই ইতিহাস সঠিকভাবে রপ্ত করাবে? আমাদের মনে রাখতে হবে এখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী । যা বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস। সেখানে যদি ১০ জন শিক্ষক দিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নিকট বাংলাদেশের ইতিহাস শেখানোর দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে ইতিহাস সঠিক ভাবে না শেখার ঝুঁকি থেকে যায় । যা থেকেই উৎপত্তি হতে পারে ‘ইতিহাস বিকৃতি’ শব্দটি। সরকারের এই প্রশংসিত উদ্যোগটিই যত্ন না নেয়া চারা গাছের মত পরিণত বৃক্ষে রুপান্তর না হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় । তাই এই বিষয়টির পড়ানোর দায়িত্ব আরো বেশী শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ বলে আমি মনে করি । এখানে উল্লেখিত তিনটি বিষয়সহ আরো অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে এই কোর্সটি সম্পর্কে শিক্ষকদের অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে সঠিক ইতিহাসটি অতি সত্ত্বর শিক্ষার্থীর নিকট পৌছাতে হবে । তা না হলে সেই দেখা হওয়া ছাত্রটির অবস্থা প্রায়শই আমাদের চোখে পড়বে । সর্বশেষে সরকার ধন্যবাদ জানাই এরকম একটি উদ্যোগ নেয়ার জন্য, যদিও আরো অনেক আগেই এটি চালু হওয়া উচিৎ ছিলো। সঠিক ইতিহাস জানাও রাষ্ট্রের নাগরিকদের একটি অধিকার।