ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

রোহিঙ্গাদের পরিচয় দেয়ার আগে তাদের দেশের সার্বিক অবস্থার একটা চিত্র মনে ধারণ করা জরুরি । সময়টা ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি সময় । একরাতে আরাকানে সকল বাহিনী অভিযান চালায়। লুটপাট সহ ৫ শতাধিক মুসলিম গ্রেফতার করে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের সেনানিবাসের ছোট ঘরে আটকে রাখেন। তখন ইলেকট্রিক শক সহ বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে বেত্রাঘাত করা হয়। অনেককে পিন পুতে রাখা বোর্ডের উপর দিয়ে হাঁটতে হয়। কাউকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

cox-deadbody-(3)

একই বছর ২১ হাজার রোহিঙ্গা যুবক ও  ৫ হাজার রোহিঙ্গা যুবতী মহিলাকে অপহরণ করেন। বিভিন্ন খাদ্য গুদামে আটকে রাখেন। ক্ষুধা ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান এক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম। আর পৃথিবীতে নারী নির্যাতনের উৎপত্তিস্থল এই মিয়ানমারেই। ১৯৭৮ সালের ড্রাগন অপারেশন হলো বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থাগুলো ভালো বলতে পারবেন।

ধর্মীয় মূল্যবোধ সকল ধর্মেই লালন করা হয়। লালন করেন না ব্যক্তি বা কোন ব্যতিক্রমী গোষ্ঠী। ১৯৯২ সালের জুলাই মাসে মংডুর শিকদার পাড়ায় ইদের নামাজ আদায়ের সময় মগ সেনারা ব্রাশ ফায়ার করে ৪ শতাধিক মুসল্লিকে হত্যা ও চার হাজার আহত করেন। এছাড়া ইমাম সাহেবদের মাথা ন্যাড়াসহ বিভিন্ন অপকর্ম তো আছেই ।

আমরা অনেকেই বলি রোহিঙ্গারা নেতৃত্বে কেন মনোযোগ দিচ্ছে না? কেন মুল ধারায় রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে না? আসলে রোহিঙ্গারা চেষ্টা সবসময় করেছে। পেরে উঠছে না। চেয়ারম্যানরা যুবতী সরবরাহ না করতে পারলে জন সম্মুখে সেনারা বেদম মার দেয়। এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে (নবী হোসেন) আম গাছের সাথে বেধে কান ও নাক কেটে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়। আরেক চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন সেনা অফিসাররা। এসব তদন্তে জাতিসংঘ তৎকালীন দুত মিয়ানমারে সম্ভবত গিয়েছিলো। মগদের রোহিঙ্গা পোষাক পড়িয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। মুলত মিয়ানমার অবরুদ্ধ দেশ হওয়ার সুযোগে মিডিয়া এড়িয়ে যেতে পারেন। আসল চিত্র কখনোই পাওয়া যাবেনা।

আমরা একটি সভ্য দেশে বসবাস করি । যে দেশে একজনও না খেয়ে থাকেন না । যে দেশের প্রধানমন্ত্রী (বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা) কোন নাগরিকের অভিভাবক না থাকলে নিজেই সেই পরিবারের দায়িত্ব নেন। বাংলার মানুষকে একটু সুখে রাখতে বিশ্ব দৌড়িয়ে বেড়ান। সেই দেশে বসবাস করে  মিয়ানমারের ভয়াবহতা কল্পনা করা যাবেনা।

রোহিঙ্গাদের কপাল তখনই পুড়েছে যখন তাদের নাগরিকত্ব আইন আদালতের হাতে না দিয়ে  সরকারের নীতি নির্ধারনী সংস্থা Council of State এর হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছে। এরাই রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিকের তকমা লাগিয়েছেন। এরই পরিকল্পনায় ১৯৭৮ এ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে আরাকানে ১০ হাজার রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়। অথচ তখন তাদের হাতে National Registration Card ছিলো। আসলে মিয়ানমার চতুর চাল দেয়। সবসময় একটা দুষ্ট বুদ্ধি মাথায় রাখে। বিভিন্ন চুক্তিতে তারা Lawful Citizen of Burma না লিখে Lawful Residents of Burma লিখে থাকে। যাতে ভিন্ন সুবিধা পেয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা যায়।

আরাকান এককালে স্বাধীন রাজ্যের স্বাদ নিতো। ১৭৮৫ সালে বর্মীরাজ বোধপায়ার আরাকান দখলের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা শুরু। এরপর ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ আরাকানে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর দ্বিতীয় দুর্যোগ তাদের নেমে আসে। যদিও দৃশ্যমান সুযোগ-সুবিধা অনেক পেয়েছিলো । ব্রিটিশরা বুঝেছিলো মুসলিমরা কখনোই আমাদের শাসনকে ইতিবাচক ভাবে দেখবে না। তাই তারা মগদের শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রাধান্য দিতে থাকলেন। অথচ রোহিঙ্গারাই মিয়ানমার স্বাধীনতায় অং সানকে সমর্থন দিয়ে ব্রিটিশমুক্ত করেন। কী লাভ হলো?

শেষ করার আগে এদের শুরুর ইতিহাস বলে যাই। রোহিঙ্গাদের এই যে রহমত করো রহমত করো আত্মচিৎকার শুনতেছেন তার শুরু অষ্টম শতকে। এই রহমত করো রহমত করো শব্দ দিয়েই আজকের রোহিঙ্গাদের জীবন যাত্রা শুরু হয়েছিলো।

ঘটনাটি ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। তখন চন্দ্রবংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করেন। আরব মুসলিম বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের কাছে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম রহম বলে চিৎকার করতে থাকেন। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করেন। রাজা তাদের অমায়িক ব্যবহার দেখে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেন। সেই রহম ক্রমশ বিকৃতি হয়ে আজকের রোহিঙ্গা । রহম-রোঁয়াই-রোয়াই-রোয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা ।

ইতিহাস তত্ত্বে দ্বিমত থাকতে পারে। অনেকেই এদের কৃতদাস বংশ থেকেই উৎপত্তি বলে মত দিয়েছেন। পর্তুগীজরা কিন্তু বাংলায় সুবিধে করতে পারেনি তবে আরাকানে পেরেছিলো। দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে বেশ তথ্য পাওয়া যায়। সে সময়ে কিছু আরাকানি নিজেদের সুবিধার্থে বিভিন্ন মানুষকে অপহরণ করে ভারি কাজ করাতো । এই সব পুরুষ মগদের বিবাহ করতো । এভাবে বংশ বৃদ্ধির জনগোষ্ঠীই সম্ভবত রোহিঙ্গা ।

এই ভিত্তিও যে শক্ত তাও বলছিনা। ইতিহাস বিশারদ আব্দুল হক চৌধুরী চমৎকার তথ্য দিয়েছেন । আরাকানে বসবাসকারি চট্টগ্রামের পিতা আর আরাকানি মগ মাতার গর্ভে জন্মগ্রহনকারিই রোহিঙ্গা।

প্রাচীনকাল থেকেই আরাকানে বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠী বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই সেখানে বসত গড়েছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজা বা পরের বিভিন্ন শাসন সংস্কারকরা মত দিয়েছেন রোহিঙ্গারা আদি জনগোষ্ঠী। এরপরেও সামরিক সরকার আসার পর থেকেই এই আরাকানেই হত্যাকাণ্ড চালিয়েই যাচ্ছে। কেন করছে উত্তর আমার কাছে নাই।

খুবই অবাক লাগে রোহিঙ্গারা তো পরিচয়হীন জাতি নয়! মিয়ানমার তো একটি সভ্য দেশেরই প্রতিবেশি! বাংলাদেশ যদি মুসলিম প্রধান দেশ হয়ে সকল ধর্মের নাগরিককে জয় বাংলার স্লোগানের নিচে নিয়ে আসতে পারে তাহলে মিয়ানমার পারে না কেন? আমাদের আওয়াজ বিশ্ব শুনতে পায় । ওরা শোনেনা কেন?

[তথ্য – ড মাহফুজুর রহমান আখন্দ, ড.আবু নোমান, আরেফিনা বেগম/নেট ছবি ও পত্রিকা]