ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

ঠোঁটে একটা বাঁশি, হাতে জ্বলছে নিভছে লাঠি সদৃশ ইলেক্ট্রিক্যাল একটা বস্তু ব্যাস নিধিরাম সর্দার মোটামুটি জীবন হাতে নিয়ে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রন করছে একটা ট্র্যাফিক পুলিশ । সিগন্যালের লাল হলুদ সবুজ বাতিগুলো ঠুঁটো জগন্নাথের মত জলছে নিভছে, কারও তাতে ভ্রূখখেপ নেই এততুকুও। উন্নতদেশগুলোতে হলুদ বাতি জ্বললেই চালকেরা তাদের গাড়ির গতি কমিয়ে ফেলে, আমাদের দেশে পুরো উল্টো, হলুদ বাতি মানেই যেন হর্ন বাজিয়ে গতি বাড়িয়ে মেরে কেটে হলেও পার হতে হবে সিগন্যাল। বেচারা ট্র্যাফিক পুলিশ দুই হাত সম্প্রসারিত করে, প্রানপনে বাঁশি বাজিয়ে, বুক দিয়ে পিঠ দিয়ে গাড়িগুলো কোনমতে থামাতে পারে, তাও পথচারী পারাপারের জেব্রাক্রশিং পেরিয়ে অনেকটুকু এগিয়ে এসে। গাড়ি থামতে না থামতেই পিলপিল করে রাস্তা পার হতে থাকে এতখখনে রাস্তার দুই পারে জমে থাকা অসংখ্য মানুষ। ছেলে, বুড়ো, নারী, শিশু, শ্রমিক, দিনমজুর, অফিসার, সেলসম্যান আরও কত পেশার মানুষ। যন্ত্রের মত সবাই পার হতে থাকে, কি নির্লিপ্ত সবাই, গায়ের সাথে গা লাগলেও কারও মাথাব্যথা নেই, সবাই খুব ব্যাস্ত, ছুটছে শুধু ছুটছে, একতলা দোতলা বাসে উপচেপড়া মানুষ, গাড়িতে মানুষ, বাইকে মানুষ, সাইকেলে মানুষ, রিকশায় মানুষ, পায়ে হাঁটা মানুষ সবাই ছুটছে ক্যাবলই চলছে আর চলছে। দূরে একজন ট্র্যাফিক সার্জেন্ট তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এদিক ওদিক খুঁজছে আইন অমান্য করে কেও চলছে কিনা। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড হবে সিগন্যাল টা থেমেছে এরই মধ্যে জমে গেছে সারি সারি কত রকমের আর রঙের গাড়ি, ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে সারি। অনেক পেছনে একটা এ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে। অধৈর্য হয়ে উঠছে চালকেরা, হর্ন বাজানো শুরু করেছে কোন কোন গাড়ি। ইশ যদি গাড়িতে পাখা লাগানো থাকতো, আচ্ছা তাহলে কি আকাশেও জ্যাম লেগে যেতো? বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎই একটা গুরুগম্ভীর সাইরেনের শব্দ, মন্ত্রী মিনিস্টার কিংবা ভিআইপি উল্টো পথে এগিয়ে আসছে, পেছনে পুলিশের গাড়ী জনাকয়েক পুলিশ তাতে, একজনের হাতে ট্র্যাফিক পুলিশের মতই টিপটিপ করে জ্বলতে থাকা লাঠি, ইশারায় সাইডে সরে যেতে বলে ছুটে আসতে থাকা যান গুলোকে। এতক্ষণ ব্যস্ত যে সার্জেন্ট অনিয়ম খুঁজতে তিনিই এবার মহাব্যাস্ত হয়ে পরেন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়ার। সত্যিতো ওনারা যদি জ্যামে বসে থাকেন তাহলে দেশের কাজও তো বসে থাকবে। এই ভালো তাদের জন্য বিশেষ আয়োজন পথে-ঘাটে, আকাশে-বাতাসে, ঈশানে অগ্নিতে, নৈরিতে। আমরা না হয় বসে বসে ঝিমুতে থাকি, কেও কেও গালাগাল দিতে থাকি ইত্যাদি, ইত্যাদি। এ্যাম্বুলেন্সটা থেকে ক্রমাগত সাইরেনের আওয়াজ ছুটে ছুটে আসছে, এ যেন ভেতরে অপেক্ষারত মুমুষও প্রানের বাঁচার আকুতি, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে ছটফট করতে থাকা এক আত্মার একমাত্র চাওয়া, আমাকে যেতে দিন আমার জরুরী সেবার খুব প্রয়োজন। এই ভয়ংকর সাইরেনের কোন আবেদন তেমন একটা নেই বরং ভিআইপিদের গাড়িতে যেটা লাগানো তার একটা বিরাট আবেদন আর শুনতেও কিছুটা ভালো। আচ্ছা সাইরেনটা উল্টে-পাল্টে দিলেই তো হয়। তাই আবার হয় নাকি, যে মরতে বসেছে তাকে মরতে দাও, তার জন্য আবার আইন কানুন মানার কি এমন আছে। উন্নয়ন করতে চাইলে বুঝি মানবিকতার ক্ষয় হতেই হয়। উন্নত প্রায় প্রতিটি জাতির অতীত ইতিহাস সেরকমই বলে।

কোটি টাকা ব্যয়ে যে ইলেকট্রিক সিগন্যাল বাতি রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাগানো হয়েছে এরইমধ্যে বার দুয়েক ঘুরে এসেছে, লাল-হলুদ-সবুজ-হলুদ-লাল-হলুদ-সবুজ, কিন্তু আমরা চলছি হাতের ইশারায়, একশত ভাগ এনালগ পদ্ধতিতে, হাতের ইশারায়, লাঠির দিকে তাকিয়ে। কতকিছুই যে চলছে এনালগ পদ্ধতিতে তার কোন হিসাব নেই। ট্র্যাফিক পুলিশের হাত নেমে গেছে, বেচারা ইশারায় গারিগুলোকে এগিয়ে যেতে বলে বাজি রাখা জীবনটা কোনমতে বাঁচিয়ে আইল্যান্ড এ গিয়ে দাঁড়ালো। এটুকু সময়ও গাড়িগুলো তাকে দিতে চায় না, হাত নামানোর সাথে সাথে হর্ন আর এক্সিলেটর একসাথে চেপে ধরে চালকেরা। বিকট শব্দ আর ধোঁয়া উড়িয়ে আবার শুরু সামনে চলা। অসম্ভব সুন্দর চোখে ঘোর লাগানো এই রাজধানী জীবন জীবিকার অন্যতম প্রধান জায়গা। প্রতিদিন যে যুদ্ধ এই নগরবাসিকে করতে হয় বেচে থাকার জন্য সেটা একেবারেই ব্যাখ্যার অতীত। চলতে থাকা মানুষের চোখ পেরিয়ে যায় উঁচু উঁচু বিল্ডিং, কত আধুনিক সব গাড়ী, স্যুটেট বুটেট কর্পোরেট মানুষের আনাগোনা আরও কতকিছু। উন্নয়নের জোয়ারে প্রাচীন ঢাকা এখন “পুরান ঢাকা”, বুড়ো থুড়থুড়ে, হাড় জিরজিরে অসহায় জানান দেয় একদিন আমিও ছিলাম সবার কাছে আধুনিক, সেই সময়ের। এভাবেই হয়ত আজকের এই আধুনিক শহরও একদিন পুরনো হয়ে যাবে। অন্য কোথাও অভ্যুদয় হবে আরও অনেক অনেক আধুনিক শহর। সত্যিই সময় সবকিছু বদলে নেয় নিজের মত করে। কাল যা স্বপ্নের ত্রিসীমানায় ছিলনা আজ যেন তাই জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে, বাস্তব। যেদিকে চোখ যায় কেবলই বদলে যাবার প্রয়াস। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন প্রত্যেকটা জায়গায় বদলে যাবার একটা চেষ্টা, যেন পরিবর্তন মানেই জীবন। কিন্তু এই বদলে যাওয়া মানে কি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর হয়ে যাওয়া, তথাকথিত পশ্চিমা জীবন যেখানে পাশের বাড়ির খবর কেও রাখেনা, পাশের বাড়িতো দূর বাবা মায়ের সাথেও একধরনের দুরত্তের সম্পর্ক। আমরা যতই উন্নত হব ততই কি আমরা আরও বেশি কি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর হয়ে যাব? তার জন্যই কি আমরা এতটা নির্লিপ্ত হয়ে দেখতে পারি লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে শিশু হত্যা, অথবা কিশোর একটা ছেলের লাশ বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে পুকুরে ফেলে দেবার দৃশ্য। এ কেমন পরিবর্তন যেখানে মৃত্যু হয় বোধের, যেখানে সম্পর্ক কেবলই স্বার্থের হিসেব নিকেশ, ‘আমার কি লাভ’ এই ভেবে বসবাস, বুঝিনা সত্যি বুঝিনা।

সামনেই চলছে ফ্লাইওভার এর কাজ, নীচে এক্সপ্রেস রেলওয়ের কাজ। ধুলো উড়িয়ে, পানি ছড়িয়ে ভারি ভারি মেশিনে চলছে কাজ। শ্রমিকদের পরনে “সেফটি ফার্স্ট” লেখা কাপড় আর মাথায় হলুদ রঙের শক্ত টুপি, শরীরের যাই হোক মাথাটা যেন বাচে আর কি। উপরে ব্রিজ হচ্ছে সে এক মহাযজ্ঞের কাজ, প্রতিদিন এই যজ্ঞ দেখি, নাকে মুখে ধুলো খেতে খেতে মস্তিষ্ক আর হৃদপিণ্ডের ভেতর নিশ্চিত ভাবেই একটা পুরু আস্তর পরে গেছে এতদিনে। সেইযে শুরু হয়েছে তার পর কত আমাবস্যা পূর্ণিমা চলে গেলো, হস্তান্তরের দিনটা কেবল পিছিয়ে যায়। তা পিছিয়ে যেতেই পারে কিন্তু যে রাস্তাটা দিয়ে শহরের ব্যস্ত মানুষের চলাচল, এমনকি এই মহাযজ্ঞের রসদও আসে সেই পথটার ব্যাপারে সকলেই উদাস, চূড়ান্ত উদাস। অথচ এটাই হওয়া উচিৎ ছিল সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। শহরের বেশিরভাগ রাস্তা কেটে কুটে একাকার, হলুদ স্ট্যান্ড-এ বড় বড় করে লেখা উন্নয়ন কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত!  অবশ্য উন্নয়ন বলে কথা এইটুকু যদি না সহ্য করতে পারি তাহলে উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করার কি অধিকার, এই বুঝি সংশ্লিষ্টদের ভাবনা। আমরা মেনে নিয়েছি, উন্নয়নের স্বার্থে। আমাদের হিসেব কষা থাকে কোথা থেকে কোথায় যেতে কোথায় কতক্ষন জ্যামে থাকতে হবে, কোন রাস্তায় গেলে কি কি ঝক্কি সব আমাদের মুখস্ত। তবুও মাঝে মাঝে দেরি হয়ে যায় অফিস পৌছাতে, ইনটারভিউ বোর্ড মানেনা কোন অজুহাত, আর প্রেমিকা সেতো ভেঙ্গে দিয়ে যায় কতকিছু।

সব মেনে নিয়েছি কেবলই উন্নয়নের অজুহাতে।