ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সাইদুল সাহেব বিরাট টেনশনে পরে গেছেন, দুশ্চিন্তায় তার দু-চোখের পাতা এক হয় না সারারাত। চোখের নিচে কালির ছাপটা দিনে দিনে আরও গাঢ় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। শুধু তারই নয়, তার মনে হচ্ছে পরিবারের বাকিরাও একই চিন্তায় চিন্তিত। খাবারের টেবিলে সবাই কেমন যেন বিমর্ষভাবে বসে থাকে, অমনোযোগী ভাবে খাবার উঠায় মুখে, টেলিভিশন এর সিরিয়াল দেখায় উৎসাহ কমে গেছে, যার যার কাজ করছে শুধু করতে হয় বলে, তাতে কোনো আবেগ নেই। অথচ এইতো মাত্র কদিন আগে কি খুশির বন্যায় না ভাসছিল এই পরিবার, সবাই কত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল আনন্দে। সেই আনন্দই এখন সবার চিন্তার কারণ।

সাইদুল সাহেব বাবা হতে চলেছেন, তার স্ত্রী হতে চলেছেন মা, পরিবারের বড় ছেলের ঘরে প্রথম সন্তান, সবার খুশিই হবার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতন, হত্যার ঘটনায় সাইদুল সাহেব আতঙ্কিত, শঙ্কিত তার আনাগত সন্তানের ভাগ্যেও তো ঘটে যেতে পারে এমনি নির্দয় ঘটনা, সেতো শিকার হতে পারে কারো ক্রোধের, প্রতিশোধ পরায়নতার, হিংস্রতার- এমনি নানা আশংকা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় অস্থির মা হত্যা করেছে তার দুই সন্তানকে। বিশ্বাস করা যায়না, মন সায় দেয় না মেনে নিতে। টেলিভিশনে মহিলাকে অবাক হয়ে দেখছিলাম, তার চোখে-মুখে কোন দুঃখের চিহ্ন নেই, নেই কোন অনুসূচনার ছায়া মাত্র, নির্লিপ্ত মুখটায় সন্তানদের জন্য কোন হাহাকার নেই, কি আশ্চর্য, চরম অমার্জনীয়।

মায়ের স্নেহের হাত কি করে হয়ে ওঠে সন্তানের হন্তারক, কি করে মায়ের মন সহ্য করে বাঁচার ব্যাকুলতায় হাঁসফাঁশ করতে থাকা সন্তানের সেই মুখ? কতবার তিনি যে মুখে ভাত তুলে দিয়েছেন, চুমু খেয়েছেন গভীর মমতায়, অথচ কি নির্দয়, কি পাষাণ, অমানবিক ভাবেই হত্যা করেছেন সেই সন্তানদেরই। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুলের সবথেকে নিরাপদ স্থান যার যার মায়ের কোল, এমনকি জঙ্গলে সবার কাছে ভয়ংকর যে বাঘিনী সেও তার সন্তানদের আগলে রাখে তাদেরই জন্মদাতার থাবা থেকে। ক্রমশ বাড়তে থাকা, ধরন বদলাতে থাকা শিশু নির্যাতন আর হত্যার ঘটনায় বারবার ঘুরে ফিরে অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। দুধে ভাতে বেড়ে ওঠার কথা যে সন্তানদের তারা কেন বারে বারে শিকার হচ্ছে নির্যাতনের, হত্যার? মানুষ হিসেবে আমরা কি তাহলে হারাতে বসেছি আমাদের অস্তিত্বকে?

মনোবিজ্ঞানীরা, সমাজবিজ্ঞানীরা, অপরাধ বিজ্ঞানীরাও যেন খেই খুঁজে পাচ্ছেন না, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না, পথনির্দেশ দিতে পারছেন না কোন দিকে এর সমাধান। কি নির্দয় ভাবেই না চার চারটা শিশুকে মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে আরও কিছু দিন আগে, নিজেকে মানুষ ভাবতে গা ঘিনঘিন করছে সাইদুল সাহেবের, এমনকি জঙ্গলের পশুও ভাবতে পারছেন না নিজেকে, নর্দমার কীটও মনে হয় এর চেয়ে ভালো। পত্রিকায় মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ছোট্ট হাতের ছবিটা তার চোখে খোঁচা দিয়ে দিয়ে অনবরত বলে যাচ্ছে, এই দেশ এই মাটিকে আমাদের জন্য নিরাপদ করতে তোমরা ব্যর্থ, তাই আমাদের এভাবে চলে যেতে হয়।

এ কোন সমাজে তার সন্তানের জন্ম হতে চলেছে, যেখানে পাঁচ বছরে সহিংসতায় এক হাজার একশত বাইশ জন শিশু শিকার হয়েছে হত্যার, এই বছর মাত্র দুই মাসে এই সংখ্যা সাইত্রিশ জনে, কোথায় গিয়ে থামবে এই সংখ্যা কে জানে, নির্যাতনের শিকারের প্রকৃত সংখ্যা না জানি কত। যুদ্ধ বিধ্বস্ত অনেক দেশের শিশুদের ছবি নানান মিডিয়াতে দেখা যায়, কি করুন সেইসব মুখ, কি অসহায় নিবেদন সেইসব চোখে, মানা যায়না ভাবা যায়না। কিন্তু তারা তবুও যুদ্ধের শিকার। আমাদের শিশুরা, তারা তো দখলের যুদ্ধের মধ্যে নেই, তবে কি তারা আরও বড় কোন স্বার্থের, প্রভাব প্রতিপত্তির যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজশাহীর পবায় শিশু নির্যাতনের ভিডিও সবার মনেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে রক্ষক যদি অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমরা। সাইদুল সাহেবের মাথার মগজ লাভার মতো উত্তপ্ত হয়ে ফুটতে শুরু করে। এ কি কেবলই আইনের শাসনের অভাবে, না না তা কি করে হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের রাজন, খুলনায় রাকিব, মুক্তাগাছায় ফরহাদ হত্যায় সর্বমোট বারো জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছে এবং খুবই দ্রুততার সাথে রায় ঘোষণা এই ভাবনার অন্তরায় হয়ে দাড়ায় যে শিশু নির্যাতন, হত্যা কেবলই বিচার হীনতার সংস্কৃতির প্রভাব। কেও কেও এটাকে সামাজিক অবক্ষয় বলতে চায়, কিন্তু সাইদুল সাহেব মানতে পারেন না। মানবেনই বা কিভাবে? এই সমাজেই তো তিনি, তার ভাইবোনেরা বড় হয়েছেন আদরে, স্নেহে, অহিংসতার ভেতর দিয়ে। তাহলে কি হলো এই সমাজের, কোথা থেকে জন্ম নিলো এত অমানবিকতার, এত হিংসার, ক্রোধের? পাশের বাড়ির মানুষেরা কেন ভালোবাসতে পারছেনা পাশের বাড়ির মানুষদের। পারিবারিক, সামাজিক সমস্ত বন্ধন, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধের এমন দশা হল কি করে? উত্তর খুব দ্রুত খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে নইলে চরম বিপদ বিষ দাঁত মেলে অপেক্ষা করছে সামনে।

জিকা ভাইরাসের তাণ্ডবে আফ্রিকা ইউরোপের অনেক দেশেই ত্রুটি নিয়ে জন্মাচ্ছে শিশুরা। যাদের মাথা স্বাভাবিকের থেকে ছোট আকারের হচ্ছে এবং সাথে আরও কিছু সমস্যা নিয়ে জন্মাচ্ছে শিশুরা। জিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মা বাবা হাসপাতাল গুলোতে ছুটছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে তাদের অনাগত শিশুরা জিকায় আক্রান্ত কিনা জানতে। গর্ভপাতের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত তারা নিচ্ছেন ত্রুটি যুক্ত সন্তান জন্ম দেবেন না বলে। জিকার থেকেও বড়, শক্তিশালী, ভয়ংকর, অমানবিক, পাশবিক ভাইরাস তো ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের সমাজে, পরিবারে, গ্রামে-গঞ্জে, মফস্বলে, শহরে, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে। সাইদুল সাহেব ভাবতে থাকেন আমরাও কি তবে শুরু করব গর্ভপাত, আসতে দেবনা শিশুদের এই ভাইরাসে ঠাসা সমাজে? সন্তানের এমন পরিণতি দেখার থেকে নিঃসন্তান থাকাই কি শ্রেয় নয়? উত্তরগুলো খুব দ্রুত দরকার।