ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

আমি তখন ১২ কিংবা ১৩ বছরের, বড় ভাইয়ের পড়াশুনার প্রয়োজনে বাড়িতে একটা কম্পিউটার এলো। সে এক এলাহি কারবার। ভাইয়ার ঘর ঝেড়ে মুছে একেবারে চকচকে করে ফেলা হল যেন বাড়িতে উৎসব একটা। একটা বাক্সে মনিটর, আর একটাতে সিপিউ, একটা উপিএস, সুন্দর একটা বাক্সে স্পিকার, একটা মাউস, কীবোর্ড আরও কিছু জিনিসের সমাহার। পুরোটা গোছাতে বেশ সময় লাগল। একটা উৎসব উৎসব ব্যাপারের ভেতর দিয়ে ভাইয়া যখন ওটা অন করলো আমি তো অবাক। কি সুন্দর ওটা, গান শোনা যায়, সিনেমা দেখা যায়, গেম খেলা যায়, কত কাজ করা যায়। সেই থেকে ঘরের জানালা খোলা একবারে বন্ধ হয়ে গেলো, যেন বাইরেরটা আর দেখার দরকার নেই। কম্পিউটার রুমে ঢুকতে হলে হাত পা ধুয়ে মুছে ঢুকতে হবে, এই বড় ভাইয়ের কড়া নির্দেশ আর ওটা ছোঁয়া ধরা তো অনেক পরের ব্যাপার। ধীরে ধীরে কড়াকড়িটা কমে গেলো, আমি মাঝে মাঝেই সুযোগ পেতাম কম্পিউটারে ভিডিও গেম খেলার। ভাইয়া বাবার জন্য পবিত্র কোরআন শরীফ তেলাওয়াত-এর একটা সিডি কিনে এনেছিল, কি সুন্দর সেই তেলাওয়াত আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মায়ের জন্য কিছু পুরনো দিনের গান সেগুলোও বাজত। ভাইয়াটা ধীরে ধীরে কম্পিউটার এর মাঝেই ডুবে যেতে থাকলো, বাসায় যতক্ষণ কম্পিউটার এর সাথে ততক্ষণ। আগে তো তাও গল্প করত, মজা করত এখন কিছুই না, মাঝে মাঝে শুধু কম্পিউটার-এ সিনেমা দেখাত। ও যেন একটু দূরে চলে গেলো, জানালা বন্ধ করে যেমন বাইরে থেকে আলাদা হয়েছিল তেমনি।

ভাইয়ার ছেলের বয়স তিন। অনেক কিছুই না বুঝলেও এই বয়সে ও কম্পিউটার-এ গেম খেলা শিখে গেলো। খুবই সাধারণ খেলা কিন্তু সে ভালই খেলে। যে শৈশবটা মানুষের সবচেয় সুন্দর, অনেক পারিবারিক রীতিনীতি শেখার আদর্শ সময়, ভবিষ্যৎ জীবনের অনেক কিছুর বীজ বপনের এই সময়টা, আমার ভাইয়ার ছেলেকে দেখলাম কম্পিউটার-এর সামনে, নানান গেমস খেলে, বাবার স্মার্ট ফোনে ডুবে থেকে পার করে দিলো। ওরা জানতেও পারলনা দাদা-দাদী, নান-নানীর কোলে বসে ঠাকুর মার ঝুলির গল্প শোনার কি আনন্দ, মায়ের গলায় ঘুম পাড়ানি গান কতো মধুর। আমাদের শৈশব ছিল পুরোটাই সপ্নময়, ছিল প্রজাপতির মত, রঙ বেরঙের ডানা মেলে ধরার। ওরা বুঝতেও পারলনা প্রযুক্তির এই উৎকর্ষে ওদের শৈশব কেটে গেলো যান্ত্রিকতার ভেতর দিয়ে। কেমন শৈশব কাটছে আজকের প্রজন্মের? কোন দ্বিধা ছাড়াই বলা যায় প্রযুক্তি নির্ভর শৈশব। যেখানে আনন্দ বিনোদন পুরোটাই কম্পিউটার আর স্মার্ট ফোন জুড়ে। ইন্টারনেটের কল্যাণে হাজারটা গেমস নিমিসেই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সেই গেমসের দুনিয়াতে হারিয়ে যায় ওরা । এভাবেই পার করে দিচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা । এভাবেই বেড়ে উঠছে। যেখানে নিজের অজান্তেই সে প্রবেশ করছে ভার্চুয়াল জগতে। তার মস্তিষ্কের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকছে সেই জগতের চরিত্রগুলো।

এইসব এনিমেটেড চরিত্রগুলো তাদেরকে প্রভাবিত করছে ভীষণ ভাবে আর তারা সেই চরিত্রগুলোকে অনুকরণ করছে অবলীলায় । আর তাই শৈশবের গণ্ডিটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। তাতে কি বাবা মায়ের তো তাতে গর্বই হয়, কতজনকেই তো বলতে শুনি আমার ছেলে/মেয়ে তো দারুন স্মার্ট হচ্ছে, সারাক্ষন কম্পিউটার নিয়ে খেলছে, ইন্টারনেট এ কত কিছু করতে পারে ও, স্মার্ট ফোনটার সব ফিচার ওর মুখস্ত, আমরাও এতো জানিনা, পারিনা, খুব স্মার্ট, খুব। আমরাও তাতে বাহবা দেই। আমাদের সময়টা  ইন্টারনেট কম্পিউটার থেকে অনেক দূরে ছিল । প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা ঐসময় এক ক্লিকে দুনিয়া দেখিনি এটা সত্যি কিন্তু সত্যিকারের পৃথিবীর আনন্দটা শতভাগ পেয়েছি। যেখান থেকে এই প্রজন্ম অনেক অনেক দূরে। আমাদের সময় খেলাধুলা ছিল প্রতিদিনের বিষয়, গাছে উঠে, পানিতে ডুবে ভেসে, সারা গায়ে ধূলির আস্তরন জড়িয়ে আহা কি যে অদ্ভুত সুখ, তাই ভাবি বুকে রাজ্যের কষ্ট নিয়ে চোখের সামনে এই প্রজন্মকে প্রযুক্তির দুনিয়ায় ডুবে থাকতে দেখে। আমাদের এসব গল্প শুনলে ওরা অবাক বিস্ময়ে বলে ফেলে তোমরা তো অ্যানসিয়েন্ট যুগের মানুষ। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের সাথে সাথে জীবন হয়েছে গতিশীল, আধুনিক। কিন্তু প্রযুক্তি কি আমাদের সাথে আমাদের প্রজন্মের সম্পর্কের বুননকে হালকা করে দিচ্ছে? আমরা প্রযুক্তি চাই, আধুনিকতাও চাই, কিন্তু সেগুলোর সাথে সাথে যে নৈতিকতা সেগুলো সঠিক ভাবে এই প্রজন্মের কাছে না তুলে ধরতে পারলে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে কে জানে।