ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার মা দিন গুনছে, আমার আসতে আর কতো দেরি। আমিও সময় গুনছি কবে মাকে দেখব এই ভেবে। যে আমাকে কষ্ট করে বহন করে চলেছে রাত-দিন, তার শরীরের ভেতর আরেকটা শরীর। আমাকে ঘিরে যার অনেক সপ্ন, অনেক উত্তেজনা, আমি তার পেটে চুপটি করে শুয়ে বুঝতে পারি। মায়ের পেটে একদিন-দুইদিন, একমাস-দুইমাস করে করে দশমাস দশদিন তার শরীর থেকেই প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু শুষে নিয়ে আমার শরীরটা ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে মায়ের গর্ভে, সেখানেই মায়ের সাথে প্রথম প্রেম আমার। আমি অপেক্ষায় ছিলাম তোমার মতই, তোমাকে দেখব বলে। যখনি ভেবে ভেবে অস্থির হয়েছি, আমি শুনেছি তোমার আদর ভরা স্নেহের কণ্ঠ বাবাকে নালিশের সুরে বলেছ আমি নাকি তোমার পেটে ফুটবল খেলা শুরু করেছি। শুনলেই আমি থেমে যেতাম, তুমি কষ্ট পাচ্ছ এই ভেবে? আমি মায়ের সব কথা শুনতে পেতাম, কি ভালো লাগত তার কথাগুলো শুনতে। আমি সবসময় কান পেতে থাকতাম কখন মা কি বলে শুনতে, বোঝার চেষ্টা করতাম কি করে মা সারাদিন আমাকে তার পেটের ভেতর নিয়ে। পেটের উপর হাত বুলিয়ে আমাকে আদর করতে করতে কত কবিতা, গান আমাকে শুনিয়েছে আমার মা তার কোন হিসেব নেই। আমি ছেলে না মেয়ে সেই নিয়ে মায়ের কত জল্পনা কল্পনা। শেষ মেষ মা বলত ছেলে হোক আর মেয়ে হোক সে যেন সুস্থ হয়।

হাজারটা নাম মা ঠিক করে রেখেছে আমি জানি, ছেলে হলে কি নাম মেয়ে হলে কি নাম তার একটা বিরাট লিস্ট করা হয়ে গেছে মায়ের। প্রথম প্রথম তো আমার জন্য মা খেতেই পারতনা, যাই খেত কেবল বমি করে দিত। আস্তে আস্তে সেটা ঠিক হয়ে গেছে। এখন আমার কারনে মায়ের দুই পা ফুলে গেছে, পেটটা এতো ফুলে গেছে যে হাঁটতে কষ্ট, ঘুমাতে কষ্ট, ঠিকমতো খেতে কষ্ট, খুব সাবধানে করতে হয় সবকিছু, শুধুই আমার কারনে তার এতো কষ্ট। আমার কষ্ট হয় মা, আমারও খুব কষ্ট হয় তোমার জন্য। এই আমার জন্য তোমার এতো ত্যাগ আমি কি দিয়ে শোধ করবো?  মাঝে মাঝে মা বলে ‘এটা একটা দুষ্টু হবে, ভীষণ দুষ্টু আমাকে এক মিনিটও শান্তি দেয় না, শুধু নড়াচড়া করে’। পেটের ভেতরই আমার অভিমান হয় শুনে, মা আমাকে দুষ্টু বলল? ঠিক আছে মা আমি তোমার সাথে আজকের মতো আড়ি নিচ্ছি, পরক্ষনেই ভাবি আহারে আমার জন্য মায়ের কি কষ্ট। এভাবেই একদিন ঠিক মাকে চূড়ান্ত ব্যাথা বেদনার সাগরে ভাসিয়ে আমার জন্ম হল, আমি পৃথিবী নামক এই গ্রহে সুতীব্র চিৎকারে আমার আগমনের ঘোষণা দিলাম। মায়ের কষ্টের কি শেষ হল, না শুরু হল তার কষ্টের আরেক পর্বের, নিরাপদ গর্ভ থেকে আমি যে এক অনিরাপদ পৃথিবীতে এসেছি এক শিশু মাত্র, তার দেখভাল করা, তাকে সময় মতো খাবার দেয়া, সেবা দেয়া, নাড়ি ছেড়া এই ধনকে কোলে পিঠে করে তিলে তিলে বড় করে তোলা, শত ঝড় ঝাপটা থেকে আগলে রাখা, আরও কতো কাজ তো এখনও বাকি। নির্ঘুম রাত কাটে আমাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে, সারাটা দিন কেটে যায় যত্ন আত্তিতে। মায়ের যুদ্ধ তাই চলতেই থাকে চলতেই থাকে। সেদিনটা ছিল সবথেকে সুন্দর যেদিন আমি প্রথম ডেকেছিলাম “মা”, এই একটি মাত্র ডাকেই আমার মা তার সব ব্যাথা বেদনা ভুলে যায়, ভুলে যায় তার ক্লান্তি, মুছে যায় তার ক্লেশ। মায়ের মতো এমন আপন দ্বিতীয়টা এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। মাকে ঘিরে লক্ষ কোটি স্মৃতি, জীবনের প্রতি পরতে পরতে তার অবদান। কোনটা রেখে কোনটা বলি, মনটা চায় সব বলি যতো আছে গল্প, তাকে  ঘিরে কথা।

শৈশবে মায়ের রূপ, কৈশরে মায়ের রূপ, আমার যৌবনে মায়ের রূপ বার বার বদলে গেছে আমারই প্রয়োজনে, কিন্তু জীবনের প্রতিটি সময়ে মায়ের কাছে আমিতো চিরকালের শিশু, মাত্রই জন্ম নেয়া শিশু। এমন করে আর কে ভালবাসতে পারে এই পৃথিবীতে। মা তোমাকে খুব ভালবাসি, খুব। সকল মাকে বিনম্র শ্রদ্ধা।