ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

বাবাকে আমরা তিন ভাইবোন “বাপি” ডাকি। বাবা বলি, আব্বা বলি আর বাপিই বলি,  সে যে ভাবেই ডাকি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমতার তাতে কোন কমতি হয় না। আমার বাবা   শাহজাহান আলী আধা-সরকারি একটা কোম্পানিতে চাকরি করতেন, কর্মস্থল ছিল কুমিল্লায়। আমরা তখন বেশ ছোট, মাত্র প্রাইমারীর গণ্ডি ছাড়িয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি; ঢাকায়। বাবা কুমিল্লায় একাই থাকতেন। আর মা আমাদের নিয়ে ঢাকায় একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে। বাবা ইচ্ছে করলে আমাদের তার সাথেই রাখতে পারতো কিন্ত আমাদের ভালো স্কুলে পড়াশোনা, তাতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এসব কথা বিবেচনা করে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট বাবা মেনে নিয়েছিল। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকা আসতো, দুদিন থেকে আবার কাকডাকা ভোরে রওনা করে চলে যেতো কর্মস্থলে।

 

পুরোটা সপ্তাহ বাবার সাথে সাথে আমরা ভাইবোনরাও অপেক্ষা করতাম ছুটির দিনটার জন্য। কখন আসবে বৃহস্পতিবার রাত যখন বাবা আসবে, আদর করবে, অপেক্ষার সেই মুহূর্তগুলো বড্ড দীর্ঘ ছিল। প্রতি সপ্তাহেই বাবা যখন আসতো তার আগে ফোন করে জেনে নিতো আমাদের আব্দারগুলো, খাতা কলম কার কি লাগবে না লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি সব কিছু শুনে নিতো, একটা খাতা ছিল বাবার যেখানে এ শব কিছু টুকে রাখতো বাবা। আর এইসব কিছু একেবারে ঠিকঠাক নিয়ে আসতো, কখনও ভুল হয়নি বাবার।

কুমিল্লার রসমালাই বলতে আমরা তিনজনই পাগল ছিলাম কাজেই এই সুস্বাদু রসমালাই আনতে কখনও ভুল করতো না বাবা। অনেক অপেক্ষার বৃহস্পতিবার রাত যখন আসতো আমরা তিন ভাইবোন রেডি হয়ে থাকতাম, কলিং বেল বাজলেই দে ছুট, কার আগে কে যাবে দরজা খুলতে, কার আগে কে ধরবে বাবাকে। যেন বিশাল এক প্রতিযোগিতা, জিতলে গোল্ড মেডেল, না জিতলে কিছুই না। বাবা খুব মজা পেত আমরা দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম আর তিনজনই বলতে থাকতাম আমি সবার আগে, আমি সবার আগে। তারপর সমস্ত কৌতূহল চলে যেত বাবার হাতের ব্যাগগুলোর দিকে। কারন বাবা অনেক দূর থেকে যা এনেছে সেগুলো আমাদের কাছে গোল্ড মেডেলের চাইতেও অনেক অনেক বেশি দামি! মাত্র দুদিনের জন্য আসতো বাবা তাই আমরা জোঁকের মতো তার সাথে লেগে থাকতাম সারাদিন। তার চারপাশেই ঘোরাঘুরি সারাদিন, গত সপ্তাহে কি কি করেছি তার ফিরিস্তি, স্কুলে কি কি ঘটেছে তার কথা, নানান রকমের আবদার, হরেক রকমের প্রশ্ন, হাজারটা বায়না, আর তার থেকেও বেশী বাবার প্রতি আমাদের অসম্ভব রকম ভালবাসা আর পরম নির্ভরতা।

বাবার মত এতো কাছের এতো আপন আর যে হয় না। বাবার মতো মিষ্টি করে ভালোবেসে আর কে পারে কথা বলতে। যখন একটু বড় হয়েছি তখন বুঝেছি বাবা যে একটা বিরাট বট গাছ, সবাইকে জাপটে ধরে আছে, আগলে রেখেছে সযতনে, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-বাদল সব ধরনের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করার প্রানান্ত প্রয়াসে ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে। এই মনে হওয়াটা শুধু আমাদের কাছে নয় সব সন্তানের কাছেই তার বাবা  বিশাল বড় এক বটগাছ মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে। বাবা সে পথের ফকির হোক আর বিশাল ধনকুবের হোক সন্তানের চোখে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তার মত মহানায়ক, তার মত প্রশস্থ কাধের মানুষ আর কে হতে পারে। বাবার সাথে সন্তানের বন্ধন চির অটুট, যার আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, মায়া, মমতা, সুখ, দুঃখ এমনি হাজারো অনুভূতি, অনুভব। এখন বুঝি কি চরম দায় একজন বাবার উপর, নিজের পরিবারের সবার সবকিছুর দেখভাল করা, বিপদে আপদে নিজের বুক দিয়ে তাদের রক্ষা করা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করার পরিকল্পনা করা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন করা আরও কত কিছু।

একজন বাবার কাছে সমস্ত কিছুর উপর যেন পরিবার, তার সন্তান। বেশ বড় হবার পর বাবার মুখেই শুনেছিলাম তার প্রথম বাবা হবার অনুভূতির কথা। স্মৃতিটা বাবার কাছে অমলিন,  উৎকণ্ঠায় অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারী, আত্মীয় স্বজনদের অভয়, কিন্তু কিসের কি, তার ভেতরটাতো একেবারে শেষ, কখন আসবে সেই সময়, সব কিছু ঠিকঠাক হবে তো, তার স্ত্রী মঞ্জুরির কোন সমস্যা হবে নাতো, বাচ্চাটা সুস্থ হবে তো, এমনি হাজারো টেনশন নিয়ে বাবা অস্থির। সেই সময়ের কথা বলতে বলতে বাবাকে দেখেছি তিনি যেন হারিয়ে যেতেন অন্য এক জগতে। বাবা বলে চলে তারপর যখন তোকে কোলে তুলে নিলাম, কি আনন্দ আকাশে বাতাসে, পৃথিবী এত সুন্দর কেন তার জবাবটা তখন আমার দুই হাতের মধ্যে ধবধবে সাদা তোয়ালে জড়ানো। সেই তখন থেকেই তার সমস্ত চিন্তা ভাবনা, প্রতিটি পদক্ষেপ, নিদ্রায় জাগরনে, চলতে ফিরতে, উঠতে বসতে কেবলই আমাদের জন্য। একজন বাবার বদলে যাওয়া পৃথিবীতে তার সবকিছুই তার এই সন্তানদের নিয়ে আবর্তিত। তিনি যে বাবা, তার যে অনেক দায়।

বাবা তোমার জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। শুধু বাবা দিবসের এই দিনটিতে নয়, আমার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তোমাকে শ্রদ্ধা করবো, ভালবাসবো একইভাবে।

বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবাদের জন্য শ্রদ্ধা আর শুভ প্রত্যাশা।