ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

এক.

বাবার কোলের উপর আমার থেকে বেশি থাকতো ঐ রেডিওটা। আমি হিংসায় জ্বলতাম, আমার থেকেও একটা রেডিও কি করে এতো মূল্যবান হতে পারে ভেবেই পেতাম না। নিছক মজা করেই লিখলাম এটা, তবে সত্যি রেডিওটা বাবার খুব প্রিয় ছিল। সারাক্ষণ কানের কাছে ধরে রাখত সেটা। খবর, গান, নাটক কোন কিছু মিস করত না শুনতে। মাঝে মাঝেই নষ্ট হতো রেডিওটা, মন খারাপ করে বাবাকে দেখতাম ওটা রিপেয়ার করতে নিয়ে যেত। দু-এক দিন পর হাসিমুখে আবার নিয়ে আসতো, খুব খুশি মনে আরাম করে ইজি চেয়ারটায় হেলান দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝেই নষ্ট হতো আবার ঠিকঠাক করে এনে কাজ চলত। বছরের পর বছর এভাবেই রেডিওটা বাবার সঙ্গী হয়ে ছিল। নতুন একটা রেডিও কেনার কথা অনেকবার বললেও বাবা কানে তুলতেন না। শুধু বলতেন, মায়া পরে গেছে। আমি কিছুতেই বুঝতাম না, একটা জড় বস্তুর প্রতি এতো মায়া কিভাবে জন্মায়!

দুই.

টেলিভিশনটা রহমান সাহেবের অনেক প্রিয়। আমাদের পাশের বাসার রহমান সাহেব বেশ টাকা-পয়সার মালিক। সুন্দর বাসাটার ড্রয়িং ঘরে চার পা-ওয়ালা একটা কাঠের বাক্সের ভেতর টিভিটা সাজানো। বাক্সের পাল্লা দুটো দু-দিকে ছড়ানো, আবার সেটাতে তালা দেবার ব্যবস্থাও রাখা ছিল। আশেপাশের অনেক মানুষ জড়ো হতো সেখানে সন্ধ্যার পর। বাইরে অনেক লম্বা একটা বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টেনা, সেখান থেকে একটা তার টেনে টিভির পেছনে লাগানো। মাঝে মাঝে এন্টেনার বাঁশটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ভালো ছবি আনার চেষ্টা করতে হতো। সাদা-কালো টিভিটাতে রহমান সাহেব বুদ্ধি করে নীল রঙের একটা প্লাস্টিক কভার লাগিয়ে রঙ্গিন ছবির আবেশ এনে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। সে যাই হোক আমরা যেতাম তার বাসায় টিভি দেখতে। একদিন টিভিতে ছবি আসা বন্ধ, শুধু সাউন্ড শোনা যায়। আমাদের সবার মন খারাপ, আর তার থেকেও বেশি রহমান সাহেবের। অনেকক্ষণ এন্টেনার বাঁশ এদিক-ওদিক করেও কোন লাভ হল না। অগত্যা রিপেয়ার করতে নিয়ে যাওয়া হল। তিনদিন পর ফেরত এলো আগের মত, ছবি-শব্দ দুটোই সহ। এরপর অনেক বারই টিভিটা রিপেয়ার করা হয়েছে। আমার বাবার রেডিওর মতই ওটাকে নিজের পরিবারের সদস্যই ভাবতেন রহমান সাহেব। কি যেন অদৃশ্য একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল, বারবার রিপেয়ার হতো তবু থেকে যেত ঘরে।

তিন.

বড় ভাইয়ের একটা ফনিক্স সাইকেল ছিল, সে সময়ের বেশ দামি সাইকেল। স্কুলে যেত, বিকেলে ঘুরতে যেত, একটু দূরের বাজারে যেত, মাঝে মাঝে ৩০-৩৫ মাইল দূরের গ্রামেও যেত। অনেক কাজের ছিল সাইকেলটা। ভাইয়ার খুব প্রিয়, কত যত্ন করত ওটার। প্রতিদিন রুটিন করে পরিষ্কার করত। একদিন ছোট একটা দুর্ঘটনায় সাইকেলের সামনের চাকাটা বাঁকা হয়ে গেলো, চেইনটা ছিঁড়ে গেলো, আরও কিছু ছোটখাটো সমস্যার কারণে রিপেয়ার করতে হল সেটার। তারপর অনেকবার রিপেয়ার করা হল ওটা। বাবা অনেকবার নতুন একটা কিনে দিতে চাইলেও ভাইয়া রাজি না। তার নাকি মায়া পরে গেছে সাইকেলটার প্রতি! রিপেয়ার করবে কিন্তু ভাঙতে দেবে না এই সম্পর্ক।

চার.

গ্রাম থেকে এসেছেন আলাল চাচা। মাথা নিচু করে বসে আছেন বাবার সামনে। প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম রহস্য। রাগের মাথায় চাচিকে তিন তালাক বলে ফেলেছেন। গ্রামের সবাই বলছেন, তালাক হয়ে গেছে। এখন আর সংসার করতে পারবে না। ঘরে তার দুই ছেলে, সুখের সংসার এভাবে শেষ হয়ে যাবে? হঠাৎ চাচা কাঁদতে কাঁদতে বাবার পা জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “আমার সংসারটা বাঁচান ভাই, ওরে ছাড়া আমি থাকতে পারুম না। আপনে চলেন আমার সাথে, সবাইরে বলেন রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হয় না। আপনে কইলে সবাই মানব।” কি আকুতি একটা সংসার রিপেয়ার করার, কি মায়া পরিবারের প্রতি! বাবা রাজী হলেন, গেলেন গ্রামে। সবাইকে সত্যটা বুঝিয়ে রক্ষা করলেন সংসারটা। আমার মনে রয়ে গেলো চাচার সংসার রিপেয়ার করার প্রবল সেই আকুতি, সেই আকাঙ্ক্ষা, সেই ভালবাসা।

পাঁচ.

বছর দশেক আগের কথা। আমার বর ভাই হঠাৎই কেমন যেন হয়ে গেলো। ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও, আমি তো এখন আর নই কারও’ টাইপের আচার-আচরণ। কি ব্যাপার! সবাই চিন্তিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে একি কাণ্ড! পরিবারের সবাই আমরা মহা চিন্তায় পরে গেলাম। ডাকা হল ভাইয়ের সব থেকে কাছের বন্ধুকে। যা জানা গেলো তা আসলেই ভয়ঙ্কর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে একটি মেয়ের সাথে ভাইয়ার রিলেশন শুরু হয়, আমরা জানতাম ব্যাপারটা। কি কারণে যেন তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ভাইয়ার বন্ধুর মারফত জানা গেলো মেয়েটিও খুব হতাশ আর বিমর্ষ। তারা দুজনেই আগ্রহী রিলেশনটা রিপেয়ার করতে। কিন্তু কিভাবে সেইটা বুঝতে পারছেনা। ভাইয়ার বন্ধু এ-ও বলে গেলো, সবাই ভাবছে কিভাবে এটা ঠিক করা যায় এবং কিভাবে যত দ্রুত সম্ভব সমাধান হয়ে যাবে? সাত-আট দিন পর ভাইয়া আবার আগের মত! মানে তাদের রিলেশন রিপেয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু এই ৭-৮ দিন ভাইয়ার জীবন কি কষ্টেরই না ছিল! ঠিক মত ঘুম নেই, খাওয়া নেই, সেভ করা নেই, উষ্কখুষ্ক একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। এখন ওদের সুন্দর একটা সংসার হয়েছে। কিন্তু আমার মনে ঠিক দাগ কেটে গিয়েছিল ভালবাসার মানুষের প্রতি ওর গভীর প্রেম, সেই প্রেম বাঁচানোর ব্যাকুল চেষ্টা।

আমাদের বর্তমান সময়ের জীবন ও সম্পর্ক এখন কি আর কোন কিছু রিপেয়ারে বিশ্বাস করে? আমার ঘোর সন্দেহ আছে। চীন দেশ থেকে আগত সস্তা পণ্য আমাদের ব্যবহার্য নানান জিনিসের রিপেয়ার করা ভুলিয়ে দিয়েছে। টিভিতে সমস্যা- ফেলে দাও, নতুন আনো। মোবাইলটা ডিস্টার্ব দিচ্ছে- ফেলে দাও, নতুন কেনো। রিপেয়ার ব্যাপারটা আমরা দিনে দিনে ভুলে যাচ্ছি। শুধু ব্যবহারের জিনিস না, আমরা আমাদের সম্পর্কগুলোও রিপেয়ার করতে খুব বেশি আগ্রহী নই। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া- তো ডিভোর্স দিয়ে দাও; প্রেমিক-প্রেমিকার ভুল বোঝাবুঝি- তো ব্রেক আপ; বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া- তো যে যার পথে! এমনি ভাবে সমাজের কোথাও এখন আর রিপেয়ার এর কদর নেই। চাইলেই যেখানে সব নতুন করে পাওয়া যায়, সেখানে রিপেয়ার করার কি দরকার! একটা সময়ে পরিবারে জড় বস্তুর জন্যও যে মায়া-মমতা ছিল এখন যেন জীবন্তদের প্রতিও ততটা নেই। পরকীয়ায় নিজের সন্তানকে হত্যা করা হচ্ছে, প্রেমের কারণে খুন হচ্ছে প্রতিবেশি, জমির বিরোধে ভাই মারছে ভাইকে, তুচ্ছ কারণে বন্ধুর হত্যাকারী বন্ধু। সম্পর্কের মূল্য, তার যত্ন, তাকে মমতায় বড় করা, লালন করা, ধারণ করা- এগুলো ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। সমাজটাকে রিপেয়ার করা খুব জরুরি।