ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

জহির রায়হানকে নিয়ে অনেক কিছু লিখার ইচ্ছা, বার বার মনে হয় উনাকে নিয়ে বিশেষ কিছু লিখব, কিন্তু পারিনা। উনার মত বড় মাপের মানুষকে নিয়ে লেখার যোগ্যতা হয় তো আমার এখনও হয় নি। তারপরও মন মানলো না, যা মনে আসে লিখি। জহির রায়হান নাম লিখে গুগলে সার্চ দিলাম। উনাকে নিয়ে অনেক লেখা পেলাম। কপি-পেষ্ট করব, মনে সাই দিল না।
উনার সাথে আমার প্রথম পরিচয় “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসের মাধ্যমে। আমার কাছে এই উপন্যাস জীবন্ত প্রতিচ্ছবি মনে হয়।এতবার পড়ি, তারপরও যেন পুরাতন হয় না। আমি অন্য কোন লেখকের বই ২বার সহজে পড়ি না, ব্যতিক্রম শুধু রবীন্দ্রনাথ আর জহির রায়হান। জহির রায়হানের প্রতিটা লেখা আমার কাছে অসাধারণ লাগে। উনার এক একটা উপন্যাস কিংবা গল্পের শেষটুকু এত অসাধারণ যে, একটা মায়া পড়ে যায়। মনে হয় পেছনে আমার আত্মাটিকে ফেলে এসেছি, তাই সে পেছন থেকে ডাকছে।

জহির রায়হানের গল্প নিয়ে সামান্য কিছু বলতে ইচ্ছে করছে-
১) অপরাধ- গল্পটিতে সালেহা চরিত্রটি ছিল বাংলার অসহায় নারীদের প্রতিচ্ছবি।
২) স্বীকৃতি -গল্পে চমৎকার একটা সূচনা- “জীবনকে অস্বীকার করিস না মনো। অস্বীকার করিসনে তোর আপন সত্তাকে, অনেক কিছু তোর করবার আছে এই জীবনে।”
৩) ইচ্ছা অনিচ্ছা- গল্পে চমৎকার একটি সংলাপ- “সোয়ামী নাই যার দুনিয়াই আন্দার তার।”
এই গল্পটা আমার মনটা অনেক খারাপ করে দিয়েছিল , ধর্মের দোহাই দিয়ে মোল্লারা শুধু মানুষের ক্ষতি করে গেছে – মানুষকে করেছে অসহায়।
৪) জন্মান্তর- গল্পে মন্তুর ভাবনাটা অসম্ভব ভাল লেগেছে- “জেল তার গুরু। এক কথায় স্বীকার করতেই হবে। একবার জেলে গেছে তো পাঁচ –দশটা নতুন রকমের প্যাঁচ, নতুন রকমের কলা – কৌশল আয়ত্ত করে বেরিয়েছে সে। গুরু মানবে না কেন? গুরুই তো।”
৫) পোস্টার- গল্পে-আমজাদ সাহেব চরিত্রটি মধ্যবিত্ত জীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। এই গল্প থেকে বুঝতে পেরেছিলাম- বাবার মাথা কেন এত গরম থাকে।
৬) ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি- এই লেখায় মনে হয় নিজেই জ্বলছি। নিচের লেখাটি শব্দ করে পড়তে অনেক ভাল।

“আহা, আমি যদি সেই তরুণকে নিয়ে একটা ছবি বানাতে পারতাম!
যার জীবন সহস্র দেয়ালের চাপে রুদ্ধশ্বাস।
আইনের দেয়াল।
সমাজের দেয়াল।
ধর্মের দেয়াল।
রাজনীতির দেয়াল।
দারিদ্রের দেয়াল।

সারাদিন সে ওই দেয়ালগুলোতে মাথা ঠুকছে আর বলছে আমাকে মুক্তি দাও।
আমাকে মুক্তি দাও।

আমার ইচ্ছেগুলোকে পায়রার পাখনায় উড়ে যেতে দাও আকাশে।
কিম্বা সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দাও। যেখানে তারা প্রাণভরে সাঁতার কাটুক।
সারাদিন সে শুধু ছুটছে, ভাবছে- আবার ছুটছে।
এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়াল।
ঈর্ষার দেয়াল।
ঘৃণার দেয়াল।
মিথ্যার দেয়াল।
সংকীর্ণতার দেয়াল।
কত দেয়াল ভাঙবে সে?
তবু সে আশাহত হয়।
ইচ্ছার আগুন বুকে জ্বেলে রেখে তবু সে ছুটছে আর ভাঙছে।
সহস্র দেয়ালের নিচে মাথা কুটে কুটে বলছে, মুক্তি দাও।
আমাকে মুক্তি দাও।”

চলচিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি উনাকে শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে রাখবো। জহির রায়হান আমাদের চলচ্চিত্রকে প্রাণ এনে দিয়েছিলেন।
জীবন থেকে নেওয়া চলচিত্রের নাম আজও সবার মুখে মুখে শুনতে পাই। মাঝে মাঝে ভাবি আমি কেন জহির রায়হান হলাম না!!!!!!

আমাদের সমাজের চারপাশের মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার হাসি কান্নার চিত্র উনার লেখাকে করেছে সমৃদ্ধ, সমাজের নানা বৈষম্য ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধেও উনার কণ্ঠ ছিল বলিষ্ঠ।
আর সেই মানুষটিকে আমরা হারিয়েছি। হারিয়েছি একজন অভিভাবককে, হারিয়েছি একজন বন্ধুকে,যিনি বেঁচে থাকলে আমাদের চলচিত্র জগৎকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করতেন। তাঁর শূণ্যস্থান আজও আমরা পূরণ করতে পারেনি। তাঁর অভাব আজও আমরা অনুভব করি।

আজ এই প্রিয় মানুষটির জন্মদিন। অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে উনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রইল আর মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা- আমার, আমাদের- আমাদের সবার প্রিয় জহির রায়হানের আত্মাকে যেন আল্লাহ শান্তিতে রাখেন।

(বি:দ্র: কোন ভুল থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।)