ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

আমরা সাধারণত দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় স্থান বা বিশেষ সৌন্দর্য্যময় স্থান গুলো ঘুরতে বেশি পচ্ছন্দ করি। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে – মনে রাখার চেষ্টা করি- আর পরে বিশেষ একটা গর্ব নিয়ে বলি- একদা সেথায় গিয়েছিলাম। কিন্তু খুব কম সংখ্যক লোক দেশের বিভিন্ন এলাকার আঞ্চলিক সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান দেখতে যান ।

যাহোক আপনি যদি চাঁপাই নবাবগঞ্জে এসে কয়েক দিন থাকেন, তবে এলাকার বিভিন্ন আড্ডায়, গল্প-গুজবের আসরে মাঝে মধ্যে দেখবেন-
কেউ ন্যাকামি করলে অথবা রঙ্গরস প্রদর্শন করলে এখনো বলা হয়
“আলকাপের গান গাহিস না তো।শুনতে ভাল লাগছে না।”
এটা একটা কথার কথা। কিন্তু বাস্তবে আলকাপের গান শুনতে চমৎকার লাগে। দারুণ উপভোগ্য।
আপনাদের অনেকের আলকাপের গান সম্পর্কে ধারণা আছে। তারপরও এটা নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করল- শুরু করে দিলাম………………..

আলকাপ নিয়ে কিছু কথা-

আলকাপ লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত। খোশ গল্প-গুজবের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, মশকরা, টিপ্পনি কাটা ইত্যাদি আলকাপের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দু’দশক আগে পুরো চাঁপাই নবাবগঞ্জ,রাজশাহীর জেলার কোন কোন অংশের লোকজনের মুখে মুখে প্রতিনিয়ত আলকাপের কলি ঘুরে ফিরে শোনা যেত। আলকাপের গানই ছিল তাদের প্রধান উপজীব্য। এ গান মাটির গান, মানুষের গান। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের হাসি, আনন্দ-দু:খ. বিরহ-ব্যথা, চাওয়া-পাওয়া. সামাজিক বাধা-বিপত্তি, অনাচার, জটিলতা, কুটিলতা সর্বোপরি জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে আলকাপ গান রচিত। আলকাপের গান স্থানীয় ভাষায় পরিবেশিত হবার ফলে এটি মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করত।

আলকাপ শব্দের অর্থ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারো মতে আলকাপ আরবি শব্দ, এর অর্থ হচ্ছে মশকরা, ঢং বা কৌতুক-জোক ।

আবার কেউ কেউ মনে করেন ‘আল’ মানে কাঁচা রস আর কাপ হচ্ছে গানের কৌশল। অর্থাৎ আলকাপ গানের অর্থটা দাড়াচ্ছে- কাঁচা রস সমৃদ্ধ সঙ্গীত।

আলকাপের জন্ম:

অনুর্ধ্ব দেড়শো বছর আগে বর্তমান চাঁপাই নবাবগঞ্জের জেলার শিবগঞ্জ থানার সীমান্তবর্তী মোনাকষা গ্রামের বনমালী শীল ওরফে বোনা কানাই (এ নামেই বেশি পরিচিত) প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আলকাপ গানের সূচনা করেন। তিনি পেশায় নরসুন্দর তথা নাপিত ছিলেন, তাঁর একটি চোখ ছিলনা। বোনা কানাইয়ের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে অনেক শিষ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা যেমন মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, রাজশাহী প্রভৃতি জেলায় আলকাপ ছড়িয়ে পড়ে আর ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

পশ্চিম বাংলার গবেষকরাও বোনা কানাইকে আলকাপ গানের জনক হিসেবে মনে করেন।

প্রায় দশ বছর পূর্বে ‘আকাশ বাণী’-র এক আলোচনায় বোনা কানাইকে আলকাপ গানের প্রবর্তক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

প্রখ্যাত আলকাপ সরকার সুবল কানার একটি ছড়ায় মালদহ, নবাবগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, জঙ্গীপুর, নুরপুর, রাজমহল ইত্যাদি অঞ্চলের বিভিন্ন সরকারদের (আলকাপ দলের নেতা) নাম পাওয়া যায়।
ছড়াটি নিম্নরুপ:
প্রথম মোনাকষার বোনাকানাই
আলকাপ গান করেন রচনা।
তারপরেতে সুবেদার আলী ভাই
বাড়ি তাহার মালদহতে হয়।।
তার পরেতে ঝাঁকসু সরকার নামটি শুনি
তার জঙ্গীপুরে বাড়ি জানি।
আলকাপে সে বিখ্যাত রে ভাই।।
জাগিরুদ্দিন যাহার নাম
তার নূরপুরেতে হয়গো ধাম।
ঝাঁকসু-জাগু এক সঙ্গেতে গায়।।
তারপর মকবুল হোসেন নামটি শুনি
তার রাজমহলে বাড়ি জানি।
সেও কিন্ত মন্দ নয়রে ভাই।।
সুধীরচন্দ্র যাহার নাম
তার সাগরদীঘি হয়তো ধাম।
সিরাজ মাস্টার তাকে রেখেছিল ভাই।।
মোজাম্মেল-নইমুদ্দিন শুনি
তারা দুজনাতে বন্ধু জানি।
তাদের দলটিও মন্দ নয়রে ভাই।।
মনকির আলী নামটি শুনি
তার গোবিন্দপুর বাড়ি জানি
বরকত আল তার পাশেতে রয়।।
কার বা কতো করবো নাম
এবার শুনেন সুবল কানার গান
এই বলে ভাই
আমি দশের কাছে প্রণাম জানাই।।

আলকাপের দল গঠন:

আলকাপ দল তৈরি হয় ‘সরকার’-কে কেন্দ্র করে। সরকার হল আলকাপের দলপতি। এমন একটা সময় ছিল সরকার বলতে অধিকাংশ সময় আলকাপের দলপতিকে বোঝাত এবং পরবর্তী সময়ে নামের সঙ্গে উপাধিতে পরিণত হয়।

দল গঠন করতে উৎসাহী পনের জন লোক হলেই চলে। সবাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দলে যোগদান করে। সকলেই খেটে খাওয়া এবং দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষজন। এই দলে দৈনিক মুটে মজুর থেকে শুরু করে কামার-কুমার, মুচি-ছুতার. রাজমিস্ত্রী, বর্গাচাষী, কৃষক, চা-পান বিক্রেতা ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষ থাকে।

সরকার সাধারণত একটু অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ। মোটা ভাত- মোটা কাপড়ে তুষ্ট।

অনেক সরকার নিজে কৃষি কাজ অর্থাৎ নিজের জমি চাষ করতেন। অবশ্য অনেক সরকারের জমি-জমা বা বিষয়সম্পত্তি মোটেই ছিলনা। যেমন রাণীহাটি গ্রামের উপেন সরকার (প্রয়াত) পেশায় ছিলেন কর্মকার। অন্যদিকে বহলাবাড়ির মঙলু মোড়ল সরকার (প্রয়াত) অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন।

যাহোক অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার হারমোনিয়াম বাদক এবং গান রচয়িতাকারী। অন্যান্য সহযোগী শিল্পীদের মধ্যে একজন হচ্ছেন তবলা-বাদক, একজন হারমোনিয়াম বাদক, কাইপ্যা (জোকার) একজন বা কখনও দু’জন, জুড়ি (করতাল) বাদক পাঁচ/ছয় জন, দোহার দু’তিন জন এবং একজন ছোকরা।

ষাটের দশক বা তারও পূর্বে ১৪-১৬ বছরের নীচে ছেলেদেরকে ছোকরা সাজানো হত, মানে লাল শাড়ী, পেটিকোট, ব্লাউজ, হাতে চুড়ী এবং মাথায় বড় খোপা বেঁধে কিশোরী/বালিকা/নারী চরিত্র বানানো হত। এই দলের মধ্যে একমাত্র ছোকরাই বেতনভুক্ত। দলের সরকারকে তার ভরণপোষণ ও বেতন হিসেবে বছরে ১৫-১৮ মণ ধান দিতে হত।

দলের সদস্যরা উপস্থিত বুদ্ধিতে সেরা, বিশেষ করে কাইপ্যা (জোকার)। কাইপ্যাকে কথার মারপ্যাঁচে ঘায়েল করা সহজ নয়।

আলকাপ গান পরিবশেনার ক্ষেত্র্রে ছয় ধরনের বিষয়ের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
যেমন: জয়ধ্বনি, আসর-বন্দনা, দ্যাশ বন্দনা বা ছড়া, খ্যামটা, ফার্স বা দ্বৈত সংগীত , আলকাপ পালা।

আলকাপের রঙ্গরসের নমুনা:

ক্যাঁইপ্যা ছোকরাকে (বোন হিসেবে) সঙ্গে নিয়ে গ্রামের হাট অতিক্রম করার সময় মিষ্টির দোকান চোখে পড়ে এবং মিষ্টি খাওয়ার খুব ইচ্ছা হয়। কিন্তু তার কাছে কোন টাকা পয়সা নেই। তাসত্ত্বেও তারা দু’জন ময়রার সামনে দাঁড়িয়ে মিষ্টির দিকে চেয়ে থাকে। ময়রাও চতুর, সে তাদের প্রলুব্ধ করে মিষ্টি খেতে। ক্যাঁইপ্যা সে সুযোগ গ্রহণ করে বলে,- “তোমার কড়াই এর সব মিষ্টি হামি খাইয়া ফেলতি পারি।”
তার কথা শুনে ময়রা মুচকি হেসে বলে, -“ব্যাটা ঠাট্টা করো?”
-“না হামি ঠাট্টা করছি না।”
-“যদি খেতে না পারিস তবে কি দিবি?”
-“হামি খাইতে না পারলে হাঁর বোহিনকে দিয়ে দিব।”
তার কথায় ময়রা গলে যায়। সুন্দরী বোনের দিকে চেয়ে লোভ জেগে উঠে।
সে ভাবে এটাই মোক্ষম সুযোগ। কেননা কড়াইতে তখনও ৩/৪ সেরা রসগোল্লা বিদ্যমান। এতগুলো রসগোল্লা একা তার খাওয়া সম্ভব নয়। ফলে চতুর ময়রা সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। ইতোমধ্যে ময়রার দোকানে অন্যান্য লোকজনও ভীড় করেছে। ময়রা একটা বক্রহাসি দিয়ে বলে, -“আচ্ছা খা দেখি।”
ক্যাইপ্যা রসগোল্লা খাওয়া শুরু করে, হয়ত আধা সেরের মত খেয়েছে, সে আর খেতে পারছেনা। ময়রা তার খাওয়ার দিকে চেয়ে মুচকি হাসে । এইবার সে সত্যি সত্যি আর খেতে পারছেনা। এ অবস্থায় সে তার বোনকে বলে, -“গামছাটা দেতো হাতে।”
বোন তার দিকে গামছা এগিয়ে দেয়। ক্যাইপ্যা রসগোল্লা তুলে গামছায় রাখতে থাকে। ময়রা বলে উঠে, কর কি? কর কি?
-“হামি কিছু করছি না। গামছায় মিষ্টি তুইল্যা বাঁধনু।”
-“গামছায় তোলার কথা ছিল না। কথা ছিল তুমি সব খাবে।”
-“কেন হামিতো কইহাছি , হামি খাইতে না পারলে হাঁর বোহিনকে দিয়া দিব।”
এই বলে সে মিষ্টি বাঁধা গামছাটা বোনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাঁটা দেয়।

আজকে সকালে জনাব জাহাঙ্গীর সেলিম রচিত “হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি” নামক বইটি পড়ছিলাম। সেখান থেকেই তথ্যগুলো সংগ্রহ করে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করলাম।

যাহোক আমাদের এলাকায় আর আলকাপের গান হয় না।কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কেউ আর খোঁজ নেয় না। আর এভাবে এই আলকাপ গানের মত আমাদের দেশের অনেক সংস্কৃতি আছে যেগুলো দিন দিন এতিম হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্বতাকে।

(বি:দ্র: কোন ভুল থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।)