ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

লেখাটি বাংলাদেশের প্রথম অফিসিয়াল এভারেষ্ট বিজয়ী মুসা ইবরাহীমের লেখা, একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন স্হানে। লেখাটিতে দেখবেন পাহাড়ে উঠার মিথ্যা সার্টিফিকেট মুসা মুহিত দুজনেরই আছে!

মুসা ইব্রাহীমের লেখা নিচের অংশটুকু :
১৬ মে, ২০০৭। তখন মধ্য রাতÑ ঘড়ির কাঁটা ১টা ছুঁই ছুঁই করছে। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) তিন সদস্যÑ দলনেতা সজল খালেদ (মোহাম্মদ খালেদ হোসেন), এম এ মুহিত ও নূর মোহাম্মদ ঘুম থেকে উঠে চুলু ওয়েস্ট পর্বত চূড়া আরোহণের জন্য তৈরি হলেন। আর আমি শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে তাঁবু থেকে বের হলাম না। অজুহাত বলছি এ কারণে যে ট্রেইলে গত ১০ দিনে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে দলনেতার ওপর আর আস্থা রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। ক্লাইম্বিং গাইড সোম বাহাদুর তামাং আগেই তার পর্বতারোহণের সামর্থ ও জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। লেডার থেকে বেস ক্যাম্পে যাওয়ার সময় এক ফাঁকে তিনি বলছিলেন, সজল খালেদ জার্মানিতে নাকি বহু পর্বতে আরোহণ করেছে। আমাকে সে বহু গল্প বলল। কিন্তু কয়েকটা জায়গায় আমার সন্দেহ আছে।

দেখা যাক, চুলু ওয়েস্ট পর্বতে চূড়ান্ত আরোহণের সময়ই হয়তো এই সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। এর মধ্যে ১৫ মে চুলু ওয়েস্ট ক্যাম্প ওয়ান থেকে হাই ক্যাম্প-এর মাঝে এক পর্বতের গায়ে রোপ ফিক্স করে ফিরে এসে তার সেই সন্দেহাতীত মন্তব্য করলেনÑ যে অভিযানের দলনেতা হাঁটু দিয়ে পর্বতারোহণ করে, তাকে তোমরা দলনেতা বানালে কেন? ঘটনা হলো পর্বতের যে অংশে সিঙ্গেল জুমার ক্লাইম্বিং করা যায় শরীরকে পর্বতের সঙ্গে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রিতে রেখে, সেখানে সজল খালেদ হাঁটু দিয়ে ক্লাইম্ব করেছে। সোম বাহাদুর বর্ণনা করছিলেনÑ তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে আইস বুটের ওপর না দাঁড়িয়ে তুমি হাঁটু ব্যবহার করছ কেন? জবাবে সে বলল, আমাকে তো কেউ বলে নি যে কিভাবে সিঙ্গেল জুমার ক্লাইম্ব করতে হবে। ১৫ মে দুপুরের খাবারের পর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সারিনের সঙ্গে সোম বাহাদুরের তাঁবুতেই কাটালাম বহু সময়। তখনই আলাপে ওই ঘটনা জানালেন সোম। তার সঙ্গে ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে চুলু ওয়েস্ট পর্বত জয়ের বিভিনড়ব বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হলো। অভিযানের সদস্যদের কার কি অবস্থা? কার পারফরমেন্স কেমন? চুলু ওয়েস্ট পর্বত জয়ের ক্ষেত্রে কতটুকু সময় লাগতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। পরের দিনটিই সেই বহু কাঙ্খিত দিনÑ চুলু ওয়েস্ট পর্বত জয়ের আকাঙ্খা পূরণের দিন। অথচ দলের বাকি তিন সদস্য তাঁবুতেই শুয়ে আছে। সন্ধ্যার পরপরই রাতের খাওয়া সেরে নেয়া হলো। তাঁবুতে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পুরো দিনের কর্মকা- পর্যালোচনা করছিলাম। সেই সঙ্গে মনে পড়ল ফ্রে পর্বতে অভিযানের কথা। তখন কেনো এবারের দলনেতাকে চিনতে পারিনিতার এবারের কাজকর্ম কেমন যেন অপরিচিত ঠেকছে। কোথায় যেন গরমিল।

সেই সঙ্গে সোম বাহাদুর তামাংয়ের এই অভিজ্ঞতা বর্ণনার পর শেষ মুহূর্তে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। তবে সেটা ঘোষণা দিয়ে নয়। এবং প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করেও নয়। মনে মনে ভাবলাম, যার সঙ্গে যতো বিরোধই থাক না কেন, দেশে ফিরে তা মিটমাট করে নেয়া যাবে। যে কাজে এসেছি, তা আগে ভালোয় ভালোয় শেষ করি। এমন চিন্তা থেকে সবাইকে জানালাম, আমার মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। নেপাল থেকে এ অভিযানে যোগ দেয়া বন্ধু সারিন দলনেতার সঙ্গে মতবিরোধের কারণে বহু আগেই দল ত্যাগ করতে চেয়েছিল। সেসব ছেলেমানুষি বিরোধ নয়। শুধু আমার অনুরোধেই দু’বার সে সিদ্ধান্ত পাল্টেছে। যাই হোক। রাত আড়াইটার দিকে নুডুল সুপ ও চা খেয়ে এবং পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরে নিয়ে সোম বাহাদুর সজল, মুহিত, নূর ও সারিনকে নিয়ে ওয়েস্ট পর্বত চূড়ার দিকে রওয়ানা দিল। তাঁবুতে শুয়ে শুয়ে আমি তাদের যাওয়া দেখছিলাম। তখন ভোররাত প্রায় সাড়ে চারটা। কিচেন-টেন্ট থেকে আসা চুলার হিসহিসানি থেমে গেছে। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধতা এমনই যে একটা পাথরকণা গড়িয়ে পড়লেও তার শব্দ কানে আসবে। হঠাৎ সোম বাহাদুর আর সজলের জোরে চিৎকার কানে এল। ঘটনা কি? কান খাড়া করলাম। যে উচ্চতা থেকে শব্দ আসছিল, বুঝতে পারলাম তখন পর্বতের যেখানে রোপ ফিক্স করা হয়েছিল, সেখানে সবাই পৌঁছেছে। সবাই নূর মোহাম্মদের নাম ধরে কি যেন বলছে। পরে ভোরের আলো ফুটতেই পোর্টারদের কেউ একজন আমার তাঁবুর কাছে এসে ‘নূর ফিরে আসছে’ বলে শোরগোল তুলতেই তাঁবু থেকে বের হতেই হলো। দেখলামÑ ঠিকই নূর ফিরে আসছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন ক্লান্তিতে তার পা চলছে না। তাঁবুর কাছে এলে তিনি ফিরলেন কেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর দল ফিক্সড রোপের প্রান্তে পৌঁছে। এখান থেকেই সরঞ্জাম ব্যবহার করে টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং শুরু করার কথা। সবাই একের পর এক জুমার ক্লাইম্বিং করে উঠছিলাম। কিন্তু সবার ওঠার গতি ছিল খুবই ধীর। তাই উঠতে সময় লাগছিল। আমি ছিলাম সবার শেষে। ওরা ওপরে উঠে গিয়ে আমাকে ডাকাডাকি করছিল যে আমি ঠিক আছি কি না? আমিও সময়মতোই কথা বলছিলাম। কিন্তু ওখানে পর্বতের গা একটু ওভারহ্যাং ধরনের। তাই আমার কথা ওরা শুনতে পারছিল না। এভাবে ধীরে ধীরে মূল দল থেকে খানিকটা বিচ্ছিনড়ব হয়ে পড়লাম। এরপর সজল ফিরে যেতে বলায় দলের স্বার্থে ক্যাম্প ওয়ানে ফিরে এসেছি। সেই পর্বতের গা থেকে চুলু ওয়েস্ট চূড়ার পথ বেশ লম্বা। পুরোটাই গ্লেসিয়ার। ক্যাম্প ওয়ান থেকে পুরো পথই চোখে পড়ে। এমনকি চূড়াও। কাজেই তাঁবু থেকে বের হয়ে গ্লেসিয়ার, চুলু ওয়েস্ট চূড়া এবং ঘড়ির কাঁটার দিকে নজর রাখছিলাম যে কখন কোথায় কাকে দেখা যায়। নূর যে জায়গা থেকে ফিরে এসেছে, তার উচ্চতা প্রায় ১৯ হাজার ফুট। আর বাকি সদস্যরা পর্বতের যে গায়ে ট্র্যাভার্স করছিল, তার উচ্চতা প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার ফুট। ক্যাম্প ওয়ান করা হয়েছিল প্রায় ১৮ হাজার ফুট উচ্চতায়।

তখন সকাল সাতটা। নজরে এল সোম বাহাদুরকে। একটু পরে সারিন। এর পরপর সজল ও মুহিত। তারা সবাই সেই পর্বতের গায়েই ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘড়ি দেখছি আর ভাবছি, ওদের তো এখন গ্লেসিয়ার পাড়ি দিয়ে পর্বত চূড়ার পাদদেশে চলে যাওয়ার কথা। সোম বাহাদুরের হিসেব অনুযায়ী তাদের সেই অবস্থান থেকে গ্লেসিয়ার পাড়ি দিয়ে চুলু ওয়েস্টে আরোহণ করতে হলে কমপক্ষে চার ঘণ্টা সময় লাগার কথা। সে হিসাবে তাদের চুলু ওয়েস্ট আরোহণ করে ফিরতে ফিরতে তো বিকেল হয়ে যাবে। কিন্তু আবহাওয়া যেভাবে দুপুরের পর থেকে খারাপ হতে শুরু করে, তাতে ওরা বিপদে পড়বে না তো? এমন সব চিন্তার ফাঁকে ওপরের দিকে চোখ রাখছি যে ওরা কতদূর এগোল? এরপর সকালের প্রাতরাশ সারলাম। ক্যাম্প ওয়ানের আশপাশে কিছুটা ঘোরাঘুরি করলাম। সৌভাগ্যবশত হিমালয় পর্বতশ্রেণীর পাথরে সৃষ্ট একটা ফসিলও পেয়ে গেলাম। এরপরই হঠাৎ সেই পর্বতের গা থেকে উল্লাসধ্বনি, চিৎকার ভেসে এল। ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা। সবাই দেখলাম যে পর্বতের গায়ে রোপ ফিক্স করা হয়েছিল, তার খানিকটা ওপরেই সজল ও মুহিত চিৎকার করছে। আমরা ক্যাম্প ওয়ানে থেকে যাওয়া সদস্য এবং পোর্টাররা সবাই অবাক। হঠাৎ এমন কি হলো যে তারা এমন উল্লাস করছে? কারণ সেই জায়গা থেকে চুলু ওয়েস্ট পর্বত বেশ দূরে, অনেক উঁচুতে। তাহলে? এসব প্রশেড়বর জবাব পাওয়া গেল যখন সবাইকে আরো অবাক করে দিয়ে মুহিত, এর পর সজল ও সোম বাহাদুর এবং সবশেষে সারিন ফিরে এল। সজল ফিরেই জানাল, সামিট করেছি। বললাম, আপনারা তো এই পর্বতের ওই মাথায় ছিলেন, আমি তো তাঁবুতে বসেই তা দেখেছি। আর চুলু ওয়েস্ট তো সেই ওইখানে। তাহলে আপনাদের সামিট হয় কিভাবে? এরপর তার ব্যাখ্যাÑ ‘আমরা যে উচ্চতায় উঠে যে জায়গাটিতে পৌঁছেছি, এর পরপরই গ্লেসিয়ারের শুরু। কিন্তু শুরুর মুখেই গ্লেসিয়ার ধ্বসে যাওয়ায় চুলু ওয়েস্টের দিকে আর যাওয়া যায় না। কাজেই আমরা যে জায়গাটিতে পৌঁছেছি, সেটাই ছিল চুলু ওয়েস্ট পর্বতের বর্তমান ‘সামিট পজিশন’। কাজেই আমাদের সামিট হয়েছে।’ সে মুহূর্তে এ নিয়ে আর তর্ক বাড়ালাম না। বিশ্রাম ও খাওয়া-দাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পরেই পুরো তাঁবু প্যাক আপ করে আমরা নামতে শুরু করলাম। বেস ক্যাম্পে দক্ষিণ কোরিয়ার এক পর্বতারোহীর সঙ্গে সাক্ষাত হলো।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আমাদেরকে ‘কোল্ড টি’ পানের অনুরোধ করল। এ সময়ে তার আর গাইডের সঙ্গে বিভিনড়ব তথ্য বিনিময় করছিলাম। আমাদের যেতে কতো সময় লাগল, কিভাবে কিভাবে গেলাম ইত্যাদি। তার গাইডের কাছে জানতে চাইলাম, চুলু ওয়েস্ট পর্বতের সামিট পজিশন বদলে গেছেÑ এমন কোনো তথ্য তার জানা আছে কি না? গাইড মাথা নেড়ে নেতিবাচক উত্তর জানাল। আগে থেকে মনে গেঁথে থাকা প্রশড়বটা তখন ডালপালা মেলতে শুরু করেছিলÑ আসলেই কি চুলু ওয়েস্ট জয় করেছি আমরা? না কি এটা প্রোপাগা-া হিসেবে চালানো হবে? এসব প্রশেড়বর উত্তর আর কারো কাছে পাওয়া সম্ভব কি? এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে একই ট্রেইলে ফিরতি পথ ধরলাম। এ নিয়ে আর কোনো কথা হলো না। নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশণ থেকে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হলো। নূর মোহাম্মদও সার্টিফিকেট পেল। এমনকি যে আমি তাঁবুতে বসেছিলাম, সেই আমিও চুলু ওয়েস্ট জয়ের সার্টিফিকেট পেলাম। হায় চুলু ওয়েস্ট! দেশে ফিরলাম সবাই। এখানে তখন চুলু ওয়েস্ট জয়ের ডামাডোল বাজছে। বিএমটিসি’র ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আল হককে ব্যাপারটা জানানোর পরও সেই ডামাডোল বন্ধ হয় নি। বরং শুক্রবার, ৮ জুন ২০০৭ তারিখে প্রেস কনফারেন্স করা হলো জাতীয় প্রেস ক্লাবে। এখানে অবশ্য বলা হলো সজল ও মুহিত চুলু ওয়েস্ট জয় করেছে, বাকি দু’জন করতে পারে নি। এরপর ২০ জুন মাসের তৃতীয় বুধবার ইনাম আল হকের বাসায় মাসিক মিটিংয়ে চুলু ওয়েস্ট অভিযানের স্লাইড দেখানো সময় সজল খালেদ বর্ণনা করছিল এভাবেÑ ‘এটা হলো আমাদের সামিটের ছবি। আমরা ১৬ মে অফিসিয়ালি চুলু ওয়েস্ট জয় করি। তখন থেকেই দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে শুরু হয় কানাঘুষা। এরপর নেপালের সারিন ই-মেইলে চুলু ওয়েস্ট অভিযানের বৃত্তান্ত সবিস্তারে জানানোর পরই ব্যাপারটা খোলাসা হয়। ই-মেইলে সারিন জানায়, বিএমটিসি চুলু ওয়েস্ট জয় করে নি। এবং ২০০৭ সালের ১২ ডিসেম্বর কাঠমা-ু থেকে ঢাকায় আসার পর দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে সারিন সরাসরি ব্যাখ্যা করার পর বিএমটিসি’র টিম যে চুলু ওয়েস্ট জয় করেনি, এ নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। তখন সারিনের কাছেই জানতে পারিÑ ক্যাম্প ওয়ানের পর চুলু ওয়েস্ট পর্বতচূড়ায় যাওয়ার পথে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট পর্বতের গায়ে পৌঁছে সজল ও মুহিত যে আনন্দোল্লাস করেছে চুলু ওয়েস্ট জয় করেছে বলে, তা ছিল সজলের পরিকল্পিত। এবং যেহেতু সজলের সঙ্গে তার সম্পর্ক তখন ভালো নয়, তাই সে এর কোনো প্রতিবাদ করে নি। আর এভাবেই প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে বিএমটিসি চুলু ওয়েস্ট জয় করেছে, আদতে যা ছিল মিথ্যা দাবি।

প্রকাশিত হয়েছে লেখকের এই লেখায় : www.somewhereinblog.net/blog/ratulbd/29665904